আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
‘২৫ দিন ধইরা বাঁন্দে (বাঁধে) রাইতে-দিনে কাজ করছি, ধনি- গরিব হকলেই আছলাম। একবায়দি কানছে (কাঁদছে) মাইনসে, আরেক বায়দি বস্তা মাথাত (মাথায়) লইয়া বান্দে নিয়া পালাইছে। আমার ৪ কিয়ার (কেয়ার) জমিন (জমি) করছিলাম, দেখতে দেখতে ডুবি গেছে, ২০ মুঠা ধান কাটতাম পারছি।’
‘২ হাল জমি করছিলাম। সবই গেছে। আমার নায় খালি, ছোট-বড় সবারই এক অবস্থা।’
‘৪ হাল জমি করছি, আধা পাকা ধান ছিল। পানি ঢুকা শুরু অইছে পরে ৬০০ টেকা (টাকা) রুজ (দিনে) হিসাবে ২০ জন শ্রমিক লাগাইছি। এরা ৬ কেয়ার কাঁটছে। বাকি ধান পানিত ডুবছে।’
কথাগুলো শনির হাওর পাড়ের শ্রীপুর গ্রামের আমিরুল হক, একই গ্রামের আব্দুল গণি এবং ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক ইউনুস আলী’র। শনিবার শনির হাওরের লালুর গোয়ালা এবং সাহেবনগর বাঁধের অংশ ভেঙে গেলে হাওরপাড়ের গ্রামগুলোয় বিপর্যয় নেমে আসে।
কেবল এরা নয়, শনির হাওর পাড়ের ৫০ টি গ্রামের কৃষকদের একই ধরনের কষ্ট। শনির হাওরের বোরো ধানই তাঁদের একমাত্র বাঁচার অবলম্বন। ছেলের পড়াশুনা, মেয়ের বিয়ে সকল স্বপ্ন বাস্তবায়নই এই হাওরের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করেই। হাওর ডুবে প্রায় ২০ হাজার কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে গেল। জেলাবাসীর শেষ ভরসাও মিশে গেল পাহাড়ী ঢলে।
হাওরপাড়ের কৃষকরা দাবি করেছেন শনির হাওর ডুবে যাওয়ায় বড় এই হাওরটি এবং আশপাশের ছোট ছোট হাওর ডুবে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর ফসল ডুবেছে। টাকার অংকে ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
জেলার তাহিরপুর উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন. জামালগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে শনির হাওরের অবস্থান। এ হাওরের তাহিরপুর অংশে জমি রয়েছে কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী ৮ হাজার হেক্টর। অন্য দুই উপজেলায় পড়েছে বাকী জমি। ২৫ দিন ধরে ৩ উপজেলারই হাজার হাজার কৃষক স্বেচ্ছাশ্রমে শনির হাওরের ৩২ কিলোমিটার বাঁধ রক্ষায় প্রাণপণ লড়াই করছিলেন। বস্তা দিয়ে বাঁধ উচুকরণ এবং
ক্লোজার বাঁধ রক্ষা করার জন্য পালাক্রমে ২৪ ঘন্টাই বাঁধে ছিলেন প্রত্যেক কৃষক পরিবারের সদস্যরা।
শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই সাহেবনগরের পূর্বপাশের বাঁধ ও লালুর গোয়ালা বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ শুরু হলে হাওর পাড়ের গ্রামগুলোয় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
শনির হাওর পাড়ের নোয়ানগর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদির রবিবার কাঁদতে কাঁদতে ডুবে যাওয়া জমির কাঁচা ধান মুখে দিয়ে চিবুনি দিচ্ছিলেন,তার মুখের এক পাশ দিয়ে সাদা পানি বের হচ্ছিল,বিলাপ করে এ সময় তিসি বলছিলেন,‘আল্লায় আমারে কেনে পাইন্নে ভাসাইয়া নেয় না, বাড়িত গিয়া বাচ্ছা কাচ্ছারে (ছেলে মেয়েদের) কিতা খানি দিতাম।’
এমন কান্না শুধু আব্দুল কাদিরেরই নয়, শনির হাওরপাড়ের বারুঙ্কা, লোহাচুরা, আনোয়ারপুর, চিকসা, বীরনগর, জয়নগর, ধুতমা, উজান তাহিরপুর, মধ্যতাহিরপুর, ভাটি তাহিরপুর, ঠাকুর হাটি, গোবিন্দশ্রী, শাহগঞ্জ, শ্রীপুর, নিশ্চিন্তপুর, ইকরামপুর, নোয়ানগর, মারালা, সাহেবনগর, গোপালপুর, রামজীবনপুর, পৈন্ডুপ, জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী,রাধানগর,ইসলামপুর, মসলঘাট,বিশ্বম্বরপুর উপজেলার শাহপুর,বসন্তপুর,ধাওয়া,পাঁচগাওসহ ৫০টি গ্রামের মানুষের। এ ছাড়াও কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগগঞ্জ উপজেলার জঙ্গলবাড়িও গুজাদিয়া গ্রামের অনেক কৃষক বহুকাল ধরেই জিরাতি হয়ে এ হাওরে বোর ধান চাষ করে।
রোববার কৃষক পরিবারের আহাজারিতে শনির হাওরপাড়ের গ্রামগুলোর পরিবেশ ছিল বিষাদময়। অনেক কৃষককেই কিছু জিজ্ঞেস করলে কেবল কেঁদেছেন।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘সাহেবনগরের পূর্বপাশের বাঁধ ও লালুর গোয়ালা বাঁধ পাউবো সময়মত শেষ করেনি, মূল বাঁধ হতে ৩ ফুট উঁচু করে দিলে এ সমস্যা হতো না। হাওরপাড়ের কৃষকদের নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে আমি ২৫দিন ধরে কাজ করেছি। এ হাওরটি তলিয়ে যাওয়ার দায়ও পাউবো এড়াতে পারবে না। শুনেছি সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ বাঁধ জেলেরা কেটে দিয়েছে বলেছেন। এটি বলা পাগলের প্রলাপ হবে।’
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বললেন,‘বাঁধ ভেঙ্গে শনির হাওর তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা করতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগই গ্রহণ করবে উপজেলা প্রশাসন।’
জেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহেদুল হক বলেন,‘বাঁধ ভেঙে শনির হাওরের অর্ধেক আজ ডুবেছে, বাকিটা পর্যায়ক্রমে হয়তো ডুববে।’ তিনি দাবি করলেন ডুবে যাওয়া জমির পরিমাণ ৫ হাজার হেক্টর হবে এবং টাকার অংকে ক্ষতি ৫০ কোটি টাকা হতে পারে।’
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন,‘আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করেছি, আমিও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত থেকেছি, তবে শেষ রক্ষা হলো না। একদিকে চেষ্টা করেছি সকলে মিলে, অন্যদিকে ভেঙে হাওর তলিয়ে যাচ্ছে।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, ‘বর্তমান সরকার কৃষক বান্ধব সরকার। কৃষকদের সহায়তায় কৃষি ঋণ মওকুফসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।’


