শোকে পাথর শারমিন

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
শান্তিগঞ্জের মুরাদপুর গ্রামের দুলাল মিয়ার বাড়িতে এখন কেবল শোকের মাতম। বাড়িতে আসা দর্শণার্থীদের চোখেও অশ্রু ঝরছে। বর্ণনাতীত শোকের ছায়া দুলাল মিয়ার বাড়িতে। পরিবারের তিন ভাইয়ের মধ্যে বেঁচে আছেন শুধুমাত্র আব্বাস মিয়া (২২)। ঘরের সামনে বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন তিনি। ঘরের ভিতর থেকেও ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। ছোট্ট শিশু বিল্লালও কাঁদছে। এককথায় এই পরিবারের এখন কান্নাই একমাত্র অবলম্বন। তিন বোনের দুই বোনকে বিবাহ দিলেও অপর বোন এখনও ঘরে আছেন। দুঃখের সীমা নেই তারও। বিধবা মার মুখে এখন আর কথা ফুটে না। দুই কলিজার ধন হারিয়ে তিনি এখন বাকরুদ্ধ।
২২ শে আশ্বিন ১৪২৯ বাংলা। শারমিনের কাছে খবর এলো জামালগঞ্জ উপজেলার সুরমা নদীর গুলুবপুর এলাকায় বালু বোঝাই দুই নৌকার মুখোমুখি ধাক্কায় নৌকাডুবিতে প্রথম স্বামী হেলাল মিয়া, বাবা তুলা মিয়া ও খালাতো ভাই বালু শ্রমিক মো. এলামুন ওরফে এনামুল মিয়া নিহত হয়েছেন। সেদিনই তার জীবনের প্রথম বাঁকে ভাঙন ধরেছিলো। দুঃখ সেদিন থেকেই আঁকড়ে ধরেছিলো ২৫ বছর বয়সী দুই সন্তানের জননী শারমিন বেগমকে। যখন স্বামী, বাবা-ভাই নিহত হন ছোট মেয়ে লামিয়া তখন ৭ মাসের গর্ভে। স্বামী হেলাল মিয়া নিহতের দুই মাস পর পৃথিবীতে আসে তার ছোট্ট নিষ্পাপ লামিয়া। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানসম্ভবা শারমিন যখন দিশেহারা তখন আত্মীয়-স্বজন সাহস দিয়েছিলেন, স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন নতুন জীবনের। লামিয়ার জন্মের পর, প্রায় আড়াই মাস আগে নিজের দেবর দুলাল মিয়ার সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় শারমিন বেগমের। নতুন করে জীবনের স্বপ্ন বুনেন শারমিন। সন্তানদের নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশার সঞ্চার করেন তিনি। কিন্তু বিধিবাম। দেবর থেকে স্বামী বনে যাওয়া ব্যক্তির সাথেও বেশি দিন সংসার করতে পারেন নি তিনি। বুধবার ভোরে সিলেটের ঢাকা দক্ষিণের নাজির বাজারের কুতুবপুর এলাকায় পিকআপ আর আলু বোঝাই ট্রাকের সরাসরি সংঘর্ষে নিহত হন দুলাল মিয়াও। জীবনের দ্বিতীয় বাঁকে এসে এবার চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলেন তিনি। সন্তানদের বাবার দুঃখ ভুলতে গিয়ে নতুন করে আবার সাগরে পড়লেন তিনি। এসব ভেবে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি আর বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন। দুই সন্তান হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে আছেন হতভাগ্য মা আয়েশা বেগম।
হতভাগ্য স্ত্রী শারমিন বেগম জানান, একটি ব্যাংকে ৯শ’ টাকা করে দুইটা কিস্তি আসে সপ্তাহে। সেই কিস্তির টাকা যোগাড় করতেই কাজে গিয়েছিলেন তিনি। তিনি জানান, দুলাল মিয়ার বয়স যখন ১২/১৪ বছর তখন থেকেই তিনি যোগালো হিসেবে কাজ করে আসছেন। বুধবারে একটা ঢালাইর কাজে পিকআপে করে তারা বেশ কয়েকজন যাচ্ছিলেন। কাজ করে এ সপ্তাহের কিস্তি পরিশোধ করার কথা ছিলো তার।
তিনি বললেন, এই দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেলো। আমাদের আর চলার কোনো উপায় রইলো না। এখন আমরা কী করবো, কোথায় যাবো,া ভেবে পাচ্ছি না।
প্রতিবেশী আবুল কালাম, আবদুল মালেক, সৈয়দুজ্জামান, আবদুল খালিক বললেন, এরা গরিব হলেও তাদের পছন্দ করতো গ্রামের মানুষ। এর আগে হেলাল মিয়া নৌকা ডুবিতে মারা গেছেন। এবার মারা গেলেন দুলাল মিয়া। মেয়েটা দুই শিশু সন্তান নিয়ে একেবারে অসহায় হয়ে গেলো। আমরা সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের আহ্বান জানাবো তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। গ্রামের পক্ষ থেকে আমরাও যতটুকু পারি সহযোগিতা করবো। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান শাহীনুর রহমান শাহীন।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার উজ্ জামান বললেন, শারমিন দুই স্বামী, বাবা-ভাই হারিয়েছেন- তিনি যদি আমার সাথে যোগাযোগ করেন, আমি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ বললেন, পরিষদের আগামী বৈঠকে তাদেরকে অনুদান দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করবো। আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।