ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সংকটে পাঠদান ব্যাহত

আকরাম উদ্দিন
বিদ্যালয়ে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা চলছে। একটি কক্ষে ৭৭জন পরীক্ষার্থী। কিন্তু ওই কক্ষে কোনো শিক্ষক নেই। এই অবস্থায় আরও চারটি কক্ষে পরীক্ষা দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। কিছুক্ষণ পর এক শিক্ষক ছুটে এসে জানালেন, এক সঙ্গে তিনটি কক্ষে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গতকাল বুধবার বেলা দেড়টায় গিয়ে এই চিত্র দেখা যায়। শুধু ওই শিক্ষক একা নন, এভাবে বিদ্যালয়ের আটটি কক্ষে ছুটাছুটি করে গতকাল শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিয়েছেন চারজন শিক্ষক।
জানা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী এই বিদ্যালয়ে ৯৮৮জন। এখানে খাতাপত্রে ১১জন শিক্ষক থাকলেও গতকাল গিয়ে পাওয়া যায় চারজনকে। বাকি সাতজনের মধ্যে দুজন সহকারী শিক্ষক প্রেষণে দীর্ঘদিন ধরে পৌর শহরেরই অন্য দুটি বিদ্যালয়ে আছেন। এই দুজনের মধ্যে কৃষ্ণা রানী তালুকদার প্রায় নয় বছর ধরে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে এবং অসিমা রায় চৌধুরী দুই বছর ধরে কালীবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। আরেক সহকারী শিক্ষক মোছা. আজিজুন্নেসা চারমাস ধরে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। সহকারী শিক্ষক জোছনা আক্তার ও রুণা লস্কর এক মাস ধরে আছেন চিকিৎসাজনিত ছুটিতে। প্রধান শিক্ষক কোহিনূর বেগম ও সহকারী শিক্ষক জেবুন্নেসা পলি এক মাস ধরে প্রশিক্ষণে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে এখানে মারাত্বকভাবে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। একজন শিক্ষককে দুইটি-তিনটি ক্লাসের শিক্ষার্থীদের পড়াতে হয়। অনেক ক্লাসে শিক্ষকেরা যেতে পারেন না। শিক্ষার্থীরা এসে ঘন্টাদুয়েক খেলাধুলা আর হৈহুল্লুর করে বাড়িতে চলে যায়। তারপরও এবারের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় পৌর শহরের ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফল হয়েছে তাঁদের। আটজন শিক্ষার্থী এ বছর বৃত্তি পেয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের কক্ষে বসে কথা বলার সময় বিদ্যালয় ভবনের তৃতীয়তলা থেকে নেমে এসে নিজের চেয়ারে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিক্ষক আয়েশা খাতুন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে চলতি বছরের শুরুতে একমাস ছুটিতে ছিলেন। চিকিৎসক বলছেন, পুরোপুরি বিশ্রামে থাকতে। কিন্তু বিদ্যালয়ে শিক্ষক কম থাকায় ছুটিতে যেতে পারছেন না। এমন সময় খবর পেয়ে আয়েশা বেগমের আত্মীয় শাহানা বেগম তাঁকে নিতে আসেন। শাহানা বেগম বলেন,‘আয়েশা বেগম খুবই অসুস্থ। ঠিকমত কথা বলতে ও চলাফেরা করতে পারেন না। কিন্তু স্কুলে না এসেও তো উপায় নেই।’
শিক্ষকেরা জানান, বিদ্যালয়ের এই অবস্থা নিয়ে তাঁরা যেমন, তেমনি পরিচালনা কমিটি ও অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন। স্থানীয় সাংসদ, জেলা প্রশাসক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা-সবাই অবগত আছেন। সহকারী শিক্ষক তামান্না আক্তার জানান, শিক্ষার্থীদের চাপে প্রায়ই শিক্ষকেরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। আজও চারজনের মধ্যে একজন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীকে চারজন শিক্ষকের পক্ষে সামলানো কঠিন।  
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি ও অভিভাবক সাজ্জাদ রহমান বলেন,‘দুজন শিক্ষক বছরের পর বছর শহরের অন্য স্কুলে আছেন। তাঁদের কেন এখানে আনা হচ্ছে না সেটিই বুঝতে পারছি না। এমপি সাহেব, ডিসি সাহেবকে বলার পরও কোনো কাজ হয়নি।’
পরিচালনা কমিটির সভাপতি মুনমুন চৌধুরী বলেন,‘এভাবে একটি স্কুল চলতে পারে না। আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু কোনো ফল হচ্ছে না।’
প্রধান শিক্ষক কোহিনূর বেগম বলেন,‘শিক্ষক সংকটে বিদ্যালয়ের অবস্থা খুবই করুণ। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে আমরাও এত শিক্ষার্থীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি।’
এ ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হযরত আলী বলেন, এই বিদ্যালয়ের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। দুই শিক্ষকের ডেপুটেশন (প্রেষণ) বাতিল করে তাঁদের পুনরায় ওই স্কুলে পাঠানো হবে। যাঁরা চিকিৎসা ছুটিতে আছেন, তাঁদের স্থলেও শিক্ষক দেওয়া হবে।