সকলকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন ইউসুফ আল আজাদ

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
হতশ্রী সকালটা যেন ঢুকরে কাঁদছিল। কান্নার ভাষা ছিল নির্বাক নিঃশব্দ নিভৃত করুণ। আবছাটে সূর্যের আলোয় হতচ্ছাড়া প্রকৃতিতে বিরাজ করছিল গুমোটবাঁধা পরিবেশ। পল্লীর পরতে পরতে বয়ে বেড়াচ্ছিল প্রিয়জনহারা নিশ্চুপ যন্ত্রণাকাতর নোনাফোটা। সর্বত্র শোকের ছায়া। সাদাসিধে নির্ভেজাল জীবনের অধিকারী জামালগঞ্জের গণমানুষের নেতা, বারবার নির্বাচিত, জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি, সাচনা বাজার বণিক সমিতির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ আল আজাদ (৭৩) আর নেই। তাঁর নামাজের জানাজা আজ সোমবার বেলা ৩ টায় উপজেলার সাচনা বাজার ইউনিয়নের কুকড়াপশী খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হবে।
রবিবার বেলা সাড়ে ১১ টায় সিলেটের উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শনিবার রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পরে সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জামালগঞ্জের জনপ্রিয় এই জনপ্রতিনিধি। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ২ ছেলে ও ২ মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো জামালগঞ্জ। উপজেলাজুড়ে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ইউসুফ আল আজাদের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় হযরত শাহজালাল (রহঃ) এর মাজার শরীফে। সেখানে গোসলের পর দোয়া পড়িয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় তাঁকে বহনকারী গাড়িটি। রোববার সন্ধ্যায় তাঁকে বহনকারী এম্বুলেন্সটি যখন সাচ্না বাজার উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে তখন শোকাহত মানুষের ভিড় ঠেলে বাক্সবন্দী নিথর দেহটি নামানো হয় মাঠে।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি হাওর রক্ষা বাঁধ নিয়ে সদ্যপ্রয়াত ইউসুফ আল আজাদের সাথে সর্বশেষ কথা হয় এই প্রতিবেদকের সাথে। হাওরে বাঁধের কাজ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘হাওরের দিকে তাকান, কৃষক-কৃষাণী কাঁদছেন, কর্তৃপক্ষ একটু সাবধান। একটা ফসল, একবার মারা গেলে এই বছর আর অন্যকোন ফসল ফলানো সম্ভব নয়। দয়া করে হাওরটাকে রক্ষা করেন।’
জানা যায়, ১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাঁর পিতা স্বপরিবারে ভারতের বালাটে শরণার্থী হয়ে চলে গেলে সেখান থেকে পিতার অনুমতি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান ইউসুফ আল আজাদ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাক-বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অকুতোভয় এই বীর সেনানী ১৯৪৭ সালের ৬ জুন জামালগঞ্জ উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের কালীপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি সাচনা বাজারের মরহুম আব্দুর রহমান তালুকদার ও মরহুম চন্দ্রবান বেগমের ৫ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র। ইউসুফ আল আজাদ জামালগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের পর জামালগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণি এবং কুমিল্লা রেলওয়ে স্কুলে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ৭৩ বছরের জীবনে মৃত্যুঅবধি প্রায় চার দশককাল তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে সাধারণ মানুষের পাশে থেকেছেন।
তিনি তিন তিনবার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও পাঁচবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৭৭ সালে প্রথমবারের মতো জামালগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯০ সাল থেকে উপজেলা পরিষদ বিলুপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। ১৯৯৬ সালে পুনরায় জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৮ সালে দ্বিতীয় এবং গত বছরের (২০১৯) মে মাসে অনুষ্ঠিত জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন জামালগঞ্জের মাটি-মানুষের এই প্রিয় নেতা।
জনপ্রতিনিধি ছাড়াও বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী অসাম্প্রদায়িক চেতনাশ্রিত ইউসুফ সামাজিক কর্মকা-েও বেশ সক্রিয় ছিলেন। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের উপজেলা সভাপতি, সাচনা বাজার বণিক সমিতির সভাপতি, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমা-ার, আব্দুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফোরাম’এর সিলেট বিভাগের সাবেক সভাপতি, সুনামগঞ্জ জেলার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফোরামের সাবেক সভাপতি ছিলেন তিনি।
এদিকে ইউসুফ আল আজাদ’এর মৃত্যুতে পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান, মুহিবুর রহমান মানিক এমপি, ড. জয়া সেন গুপ্তা এমপি, মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এমপি, সুনামগঞ্জ- সিলেট সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি অ্যাডভোকেট শামীমা শাহ্রিয়ার, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুল হুদা চপল পৃথক পৃথকভাবে শোক প্রকাশ করেছেন।