সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭৫ বছর পূর্তি আমাদের সহোদরা (৫)

সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য্য
আপাদমস্তক সৃজনশীল চার সহোদরাকে নিয়ে আজ হাজির হয়েছি। বহুমুখী প্রতিভার মধ্যে সাধারণ মিল হলো চারজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, সুলেখিকা এবং প্রত্যেকেই সতীশের হীরক জয়ন্তীকে স্বার্থকতাদানে সচেষ্ট। প্রবাসী দু’জন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মিলনমেলাকে স্বার্থক করতে অগ্রগণ্য ভূমিকায় ছিলেন।
বাবার খ্যাতিতে গর্বিত এই সহোদরাদের বড়জন কানাডা প্রবাসী, সেদিনের  মিলনমেলার পর ফেইসবুকে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন যার শেষ অংশটি, “তবে অনুষ্ঠানে সবাই ঘুরে ফিরে এসে আমাকে আমার বাবার কথা বলছিলেন। অনেকটা সময় জুড়ে আমার বাবার কথা আলোচনা হলো। প্রতিটি মানুষের মনে কি দারুণভাবে তিনি জীবন্ত। বাবার সাথে আত্মিক বন্ধনে জড়িয়ে আছেন সবাই আলাদা আলাদাভাবে। প্রত্যেকের কাছে তিনি অনেক আদর ভালবাসার ও নির্ভরতার ছিলেন জেনে আমার কি যে ভালো লাগল। একসময় আমার মনে হচ্ছিল অনুষ্ঠানটি মনে হয় আমার বাবাকে ঘিরে। আমার বাবা  একজন দারুণ মানবিক মানুষ ছিলেন আবারও উপলব্ধি করলাম।” সেই বাবা প্রয়াত ডাঃ আবুল লেইস ও মা রাবেয়া লেইসের পাঁচ সন্তানের চার কন্যাসন্তানই সরকারী সতীশচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি উত্তীর্ণ।
(১) রোকসানা লেইস :- এস.এস.সি ১৯৭৪ ও এইচ.এস.সি ১৯৭৬, সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজ থেকে। ঢাকার বদরুন্নেসা সরকারী কলেজ থেকে স্নাতক ১৯৮১ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ১৯৮৪।
নারী নয়, ‘মানুষ’ হিসেবে আত্মপ্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলা রোকসানা লেইসের জীবন-জীবিকার শুরু প্রিন্টিং প্রেস ব্যবসায় এক্সিকিউটিভ হিসেবে ঢাকায় ১৯৯৮ পর্যন্ত। রিয়েল এস্টেট এজেন্ট, টরেন্টো,কানাডা ২০০৯পর্যন্ত। বর্তমানে কানাডাতে মিডিয়া ওয়ার্কার হিসেবে কর্মরত।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের মত নিজের চেষ্টায় সফলতা লাভে আগ্রহী বলে অন্তরের গভীরতম স্থান থেকে লেখালেখির চর্চায় রত। এই কাজে নিজ পরিবারের উদারতাই সম্মুখবর্তিতার  সহায়ক, তিনি বলেন,”লিখছি সেই ছেলেবেলা থেকে গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস,প্রবন্ধ ইত্যাদি। এ পর্যন্ত প্রকাাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়টি।” তাঁর রচিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই “আলোর যাত্রা”র একটি কপি সতীশচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে নিজে গিয়ে দিয়ে এসেছেন।
রোকসানার এক পুত্র ও এক কন্যা, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে পেশার পাশাপাশি উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য অধ্যয়নরত।
প্রথম প্রকাাশিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সময় আবেগকে নাড়া দেয়ার সাথে সাথে নিজের সৃষ্টিকে ছড়িয়ে দেয়ার বিমূর্ত অসাধারণ, অন্যরকম অনুভূতির স্মৃতি নতুন সৃষ্টির ক্ষেত্রে সহায়ক ,এটিই তাঁর অন্যতম সুখের স্মৃতি।
পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বিকশিত হতে হলে সামগ্রিক জগৎ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ সচেতনভাবে গড়তে হবে-প্রজন্মের কাছে তাঁর প্রত্যাশা।
(২) রোমানা লেইস :- প্রাণপ্রিয় বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানকে স্বার্থক রূপ দিতে প্রতিদিনই কখনও স্বপ্নের রাজ্যে, কখনও নক্ষত্রদের সন্ধানে, কখনওবা দিকনির্দশনামূলক চিন্তার বিশ্লেষণে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা রোমানা লেইস এস.এস.সি ১৯৭৯, ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে এইচ.এস.সি ১৯৮১, বি.এস.এস. অনার্স (লোক প্রশাসন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রংপুরের টিচার্স ট্রেণিং কলেজ থেকে ১ম শ্রেণীতে বি.এড. প্রশিক্ষণ লাভ করেন।
পেশাগত জীবন শুরু কৈশোরের স্মৃতির মিনার সরকারী সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা ১৯৯২- ১৯৯৪। একই পদবীতে বদলী গাইবান্ধা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ১৯৯৪-১৯৯৬, রংপুর জিলা স্কুল ১৯৯৬- ২০০৬। সবশেষে ঢাকার শেরেবাংলা নগর স্কুল এন্ড কলেজ ২০০৬-২০০৯ পর্যন্ত। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগে কর্মরত। তিন সন্তানের জননী রোমানার দুইপুত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ও কন্যা দশম শ্রেণীতে পড়ছে। স্বামী-সন্তানসহ সুখ-শান্তিময় পারিবারিক জীবনে বর্তমানে নিউইয়র্কে বসবাস করছেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে নিবিড় সখ্যতায় জড়ানো জীবনে বই পড়া ও কলম নিয়ে কথামালা গাঁথায় ব্যস্ত রোমানার জীবন দর্শন হলো প্রখ্যাত মনিষী ডেল কার্নেগীর “জীবন যেখানে যেমন”। তাঁর লেখনীর যাদুর কারিশমায় সতীশের পঁচাত্তর বৎসর উদযাপন উৎসব-পূর্ব পরিবেশ পেয়েছে প্রাণবন্ত রূপ। উৎসুখ শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসার জবাবের তৃপ্তিদানে সদা-ব্যস্ততায় দিন কাটছে নতুন নতুন আঙ্গিক আর বৈচিত্র্যময়তা সমন্বয় করে ।
ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় ব্যাঙ লাফ খেলায় প্রথম হয়ে পুরষ্কার নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় আকাশে-বাতাসে আনন্দ ধ্বনি শুনতে পাওয়ার স্মৃতিটি মনে হলে এখনও আকাশ-বাতাস কাঁপে, যা রোমানার সুখের স্মৃতির অন্যতম। রোমানা লেইস বলেছেন,”পরবর্তী প্রজন্মকে বলবো, আত্মকেন্দ্রিকতা মুক্ত হও। নিজের জন্য কিছু করার পাশাপাশি দুস্থ মানবতার জন্য কিছু কর।”
(৩) রুবিনা লেইস :-১৯৮২ তে এস.এস.সি , সুনামগঞ্জ সরকারী মহাবিদ্যালয় থেকে এইচ.এস.সি ও বি.এস.সি পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্বে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণের পর শিক্ষানবীশ হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি. এড প্রশিক্ষণে ১ম শ্রেণী অর্জনে সফলতা লাভ করেন।
১৯৯৬ সনে উত্তরা গার্লস হাইস্কুল এন্ড কলেজে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে পেশার শুরু। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরি-লের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রয়েছে তাঁর পদচারণা। নাচ , গান, আবৃত্তি খেলাধূলা বহুকিছুতে পারদর্শী এই শিক্ষিকা তার শিক্ষার্থীদের এসব বিষয়ে ২০ বৎসর যাবৎ অনুশীলন ও উৎসাহ দিয়ে চলেছেন। বিদ্যালয়ের বার্ষিক সাহিত্য, সাংস্কৃতিক, ক্রিড়া ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য আয়োজনকে তাঁর সাবলীল উপস্থাপনায় প্রাণবন্ত রূপদান করে থাকেন। বিদ্যালয়টির ২৫ বৎসর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত দুইদিনব্যাপী কর্মসূচী প্রণয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। সুনামগঞ্জে প্রথম বৃন্দ আবৃত্তি সংগঠন “সুবর্ণ” তাঁর হাতে গড়া। বর্তমানে স্বামী এবং ‘ও’ লেবেল ফাইনাল পরীক্ষার্থী ছেলেটিকে নিয়ে তিনি ঢাকা থাকেন। একমাত্র পুত্র সন্তানের দাদা ও নানার উপস্থিতিতে নবজাতকের জন্মদানের শুভক্ষণটি রূবিনার মানসপটে উজ্জ্বলতম সুখের স্মৃতি। অর্জিত জ্ঞানকে পুনঃ পুনঃ অনুশীলনে সৃজনশীলতার প্রকৃত প্রকাশ , যন্ত্রের কাছে নত না হয়ে স্রষ্টার সৃষ্ট মস্তিষ্ক।
(৪) রুনা লেইস
এস.এস.সি ১৯৮৭, এইচ.এস.সি ১৯৮৯, বি.এ(পাস) ১৯৯১, সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজ, চারুকলা বিএফএ গ্রাফিক ডিজাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯৬। মাস্টার্সে ভর্তির পর জটিল রোগে মর্মান্তিকভাবে একটি চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে থাকা ও পরবর্তীতে যমজ সন্তানের মা হওয়ায় একাডেমিক এডুকেশনের অভীষ্ট অর্জন থেকে বঞ্চিত হতে হলো রুনাকে। সুপ্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক বাবাকে মেধাবী কনিষ্ঠ সন্তানটি অনুসরণ করবে, এমন প্রত্যাশা সর্বমহলে থাকলেও তাঁর বাবার চঞ্চলমতি, ভাবুক, অনুভূতিপ্রবণ মেয়েটি সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা থাকায় নিজ পেশাকে সন্তানের উপর চাপিয়ে না দিয়ে বরং মেয়েটির আগ্রহ ও ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের মত করে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন। কারণ তিনি লক্ষ্য করেছিলেন স্কুলে পা ফেলার আগেই গান, কবিতা, গল্পের বইয়ের প্রতি তাঁর মেয়েটির অনুরাগের গভীরতা। মাইক্রোফোন হাতে মঞ্চে উঠলো দশ বছর বয়সে। লেখালেখির শুরুটাও সেই থেকে। গানের প্রতি বেশি আগ্রহ থাকলেও সুললিত উপস্থাপনা ও আবৃত্তিতে সমধিক জনপ্রিয়তা মিললো মাধ্যমিকের গ-ি পেরুতে না পেরোতেই। স্কুলে থাকতেই খেলাধুলা, গার্লস গাইড,বিজ্ঞানমেলা, রেডক্রস, ইত্যাদি সহ সকল ধরণের সাংস্কৃতিক, সামাজিক কার্যক্রম এবং চারুকলায় পড়ার সময়।
শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অধিকাংশ শাখায় বিচরণের সাথে সাথে সেইসব সংগঠনের সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন এমনকি বি.এন.সি.সি রমনা রেজিমেন্ট সেনা শাখার সদস্য হিসেবে যুক্ত থেকেও ছায়ানটে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও ভাষা ইনস্টিটিউটে ফারসী ভাষা শিক্ষার তালিম নিয়েছেন। বাংলাদেশ বেতার,ঢাকা ও বিটিভি এবং মঞ্চেও গান, আবৃত্তি ইত্যাদির প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বর্তমানে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের  সাধারণ সদস্য, আজীবন সদস্য, সম্পাদক,উপদেষ্টা হিসেবে সম্পৃক্ত। নিজ উদ্যোগে শিশুদের আবৃত্তি ও চিত্রাংকন শিক্ষা দিয়ে থাকেন। ফটোগ্রাফি রুনার জীবনের সেরা শখ।
ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে নিজেকে ‘মানুষ’ হিসেবে মূল্যায়ন করতে শিখলে সমাজ থেকে নানান বৈষম্য ও সংকট স্বাভাবিকভাবেই বিলুপ্ত হবে। তাই নিজেকে ‘মানুষ’ হিসেবে তৈরি করতে হবে- প্রজন্মের কাছে এটাই তাঁর প্রত্যাশা। বহুমুখী প্রতিভার এই চার সহোদরার প্রতিভার ছটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে নব নব প্রতিভা বিকশিত হোক- লাভ করুক পরিপূর্ণতা। তাঁদের আগামীর পথে থাকলো আগাম শুভকামনা।