সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য্য
বিজয়ের মাসে এক বিজয়িনীকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছি যিনি মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছেন তাঁর কলিজার টুকরা টুকটুকে ফুটফুটে ছোট্ট কন্যাটিকে সেইসাথে দয়িতের সাথে যাপিত দাম্পত্য জীবন যে জীবনে স্বামীকে সাথে নিয়ে সন্তানদের শৈশবকে আদরে সোহাগে ভরিয়ে পরিপূর্ণ বিকশিত করার জন্য ছিল সবচে’ উপযুক্ত সময় । ‘৭১ এর সেই ভয়াবহ রাত্রিতে বর্রর হানাদারদের বর্বরোচিত পৈচাশিক নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পালায় নির্মমভাবে ছিনিয়ে নেয়া জীবনদানে বাধ্য হয়েছিলেন বাবাসহ আদরের মেয়েটি। দেশমাতাকে মুক্ত করতে পিচাশের দলের কাছে মাথা নত নয় জীবন দিয়ে মাথা উঁচু করে যারা আজ প্রিয় জন্মভূমিতে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে আছেন তাঁদেরই একজন শহীদ বুদ্ধিজীবী সোনাওর আলী। সিতারা নামের নয় বৎসরের কন্যাটিও একই সোনার খাতার পতাায় অগ্রগণ্য হয়ে এদেশের মাটি ও মানুষের হৃদয়ে চিরজীবীর আসনে চিরদিনের মত বিরাজিত। বিজয়ের উল্লাসে সেদিন বিজয়ী জাতি হিসেবে গোটা দেশটিই যখন আনন্দের বন্যায় ভেসেছিল সেদিন স্বামী সন্তান বিয়োগিনী শহীদ সোনাওর আলীর স্ত্রী ও শহীদ সেতারা বেগমের মা রাশিদা মাজেদা খানম (১৯৫২-১৯৫৬ পর্যন্ত সতীশের ছাত্রী) ও বিজয়কে বরণ করেছিলন বুকভরা আর্তনাদ আর হাহাকারের জ্বালাকে সঙ্গে নিয়ে। তারপর শোক হলো শক্তি। শুরু হলো পাঁচজন সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই। সেই লড়াইয়ে জয়ী হয়ে বিজয়িনী এই নারী হয়ে উঠেন ‘রতœগর্ভা মা’। তাঁর সুকীর্তি গাঁথা আজ সুনামগঞ্জ শহরে এক পাঁচালীর বিষয়বস্তু হিসেবে সকলের কাছে সমাদৃত। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ অর্জিত স্বাধীনতায় এই জনপদের যে পরিবারটির তাজা লাল খুন মিশে আছে এবং বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে যিনি প্রতিটি সন্তানকে ‘মানুষের মত মানুষ’ করে রেখে গেছেন-যাঁদের সহযোগিতায় সরকারী সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের হীরক জয়ন্তী পালনের পথটি মসৃন হয়েছে, তাঁদের নিয়েই ‘আমাদের সহোদরা’র আজকের আয়োজন। এই সহোদরাদের সবাই সতীশ ছাড়াও সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজ থেকেই স্নাতক পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছেন সাদামাটা স্বাভাবিক অনাড়ম্বর আরো দু’চার জনের মতই। এবার জানাব এই সহোদরাদের প্রত্যেককে তাঁদেরনিজ নিজ অবস্থানের আলোকে।
(১) শামসুন্নাহার বেগম শাহানা :- স্নাতক পাশের পর সিলেট ল’ কলেজ থেকে এল এল বি ডিগ্রী লাভ করে সুনামগঞ্জ বারের আইনজীবী হিসেবে জজকোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করেন। তিনি সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের সংরক্ষিত মহিলা আসনের মাননীয় সাংসদ হিসেবে জনগণের সেবায় নিয়োজিত থেকে পথ বেয়ে চলেছেন।
ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয়তার কারণে কলেজ ছাত্র সংসদের ভি পি নির্বাচিত হয়ে জীবনে প্রথম একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সক্রিয়তার সাথে কাজ করার সুযোগ ঘটে।
স্বামী প্রয়াত গোলাম রব্বানী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে শহরে সুপরিচিত। তাঁর অকাল প্রয়াণে মায়ের মতই সন্তানদের ‘মানুষের মত মানুষ ‘ করার পাশাপাশি সমাজের জন্যও অবিরাম কাজ করে চলেছেন। জন্ম মাটির একজন সচেতন নাগরিক ও নারীর অগ্রযাত্রার অগ্রপথিক শামসুন্নাহার বেগম শাহানা রব্বানী এম পি এলাকার বিভিন্ন সংগঠনের সাথে বিভিন্ন পদবীতে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত এবং বাংলাদেশের জেলা আইনজীবী সমিতির প্রথম সেক্রেটারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। সতীশের ৭৫ বৎসর উদযাপনে আহ্বায়িকা ও সভাপতিও তিনিই। কর্মমুখরতা নিয়ে এগিয়ে চলা এই নারী বহির্বিশ্বের একাধিক দেশও ভ্রমন করেছেন।
তিন সন্তানকে নিয়ে তাঁর পারিবারিক জীবন। দুই কন্যার বড়জন ঢাকা হাইকোর্টের আইনজীবী এবং সুনামগঞ্জ সমিতি, ঢাকার সমাজকল্যান সম্পাদক। বিবাহিত জীবনে ঢাকাবাসী। ছোটজন চিককিৎসক। একমাত্র ছেলে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।
সুখস্মৃতিতে বিশেষভাবে স্মরণীয় বিয়ের আট বৎসর পর মাতৃত্বের গৌরব অর্জন আর অ্যাডভোকেট হিসেবে প্রথম রোজগারের টাকা মায়ের হাতে তুলে দিতে পারার স্বস্তি।
প্রজন্মের প্রতি প্রত্যাশা হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিজেকে তৈরি করা এবং মানবতার সেবায় এগিয়ে আসা। আর মনে রাখতে হবে নিজের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থ বড়।
(২) জেসমিন আরা বেগম :- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্সের পাশাপাশি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধীনে ঢাকা ল’ কলেজ থেকে এল এল বি ডিগ্রী অর্জনের পর সুনামগঞ্জ বারে প্রথম মহিলা আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবনে প্রবেশের দুই বৎসরের মাথায় বি সি এস পরীক্ষায় সফলতালাভে শিক্ষানবিশ সহকারী জজ হিসেবে ঢাকা জেলা দায়রা ও জজ কোর্টে যোগদান ১৯৮৮।
প্রশাসনিক এপিলেট ট্রাইব্যুনাল ছাড়াও সিলেট, শেরপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ইত্যাদি স্থানে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদমর্যাদায় বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন শেষে বর্তমানে ঢাকা জজ কোর্টে নারী ও শিশু বিষয়ক প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-১ এ কর্মরত। পেশাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সুবিধা ও অধিকার আদায়ে সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবে নিয়মিত কাজ করে চলেছেন।
সুলেখক, সাহিত্যিক, কবি হিসেবে খ্যাত তাঁর স্বামী ডক্টর মুহম্মদ সাদিক বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবও ছিলেন। পারিবারিক জীবনে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি ঢাকায় বাস করেন। অতি সম্প্রতি পুত্রবধূও ঘরে এনেছেন। কন্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। বড়বোনের মত তিনিও বহির্বশ্বের কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছেন।
জীবনের সুখের স্মৃতি হলো, ‘১৯৮৬’র ১৮ নভেম্বর সকালে শহীদ বুদ্ধিজীবী পিতা সোনাওর আলীর স্বপ্ন পূরণ করে সুনামগঞ্জ বারে প্রথম মহিলা আইনজীবী হিসেবে যোগদান করে পিতার ইচ্ছাপূরণ করতে পারা আর আমার যোদ্ধা মায়ের মুখে হাসি ফোঁটানোর সেই দিনটি-।’
তাঁর প্রজন্ম প্রত্যশার কথায় বলেছেন, ‘শিক্ষিত হওয়ার মূল অর্থ মানুষ হওয়া। মানবতার সেবা করা- যা মানুষকে বিনয়ী করে। অহংকার মানুষের পতন ঘটায় – এই মূল মন্ত্র নিয়ে জীবন যাপন করলে মানুষ হওয়া যায় এবং জীবনে মানুষ হওয়াটাই আসল ব্রত হওয়া উচিত।’
(৩) ফৌজি আরা বেগম শাম্মী :- স্নাতক ডিগ্রী লাভের পর পেশাগত জীবনে শিক্ষকতাকে বেছে নিয়ে আদর্শ শিশু শিক্ষা নিকেতন, সুনামগঞ্জ এ যোগদান ১৯৮৫ থেকে বর্তমানেও বহাল রয়েছেন। তাছাড়াও তিনি জাতীয় মহিলা সংস্থা, সুনামগঞ্জ-এর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, সুনামগঞ্জ-এর সভাপতি এবং তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা সমিতি, সুনামগঞ্জ এর সভাপতি হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করছেন।
জেলা পরিষদ গঠনের জন্য আগামী ২৮ডিসেম্বর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেখানে মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
আইনজীবী স্বামী প্রয়াত ২০০৮-এর ১৬ই ডিসেম্বর পরলোকগমন করেন। দুুই সন্তানের বড় মেয়ে সতীশের ছাত্রী, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ছেলেটি ৭ম শ্রেণীতে পড়ছে। সন্তানদের নিয়ে সুনামগঞ্জে বাস করেন।
‘সন্তানদের জন্ম’ -এভাবেই শাম্মী সুখের স্মৃতি ব্যক্ত করেছেন।
‘প্রজন্ম নিয়ে ভাবলে প্রথমেই মনে আসে আমার দুই সন্তানের মুখ। আমার সন্তান মানুষ হোক, আমার সন্তান সত্যবাদী হোক, আমার সন্তান হোক অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্র কঠিন। কখনো স্বার্থান্বেষী হয়ে যেন অন্যের ক্ষতি না করে, যেন দেশকে ভালবাসে মায়ের মতো। আমার সন্তান তথা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু চাই না।
(৪) রাশিদা সাঈদা লাকী :- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ধানমন্ডী ল’কলেজ থেকে এল এল বি ডিগ্রী লাভের পর সিলেট বারে আইনজীবী হিসেবে পেশার শুরু ২০০৫। পাঁচ বৎসর পর এ পি পি হিসেবে এই বারেই কর্মরত। সিলেট বারের নির্বাচনে মহিলা সম্পাদিকা পদে জয়লাভ করেন।
ব্যবসায়ী স্বামী ও দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি সিলেটে বাস করেন।
তাঁর সুখের স্মৃতিতে বলেছেন,‘যখন আমি এল এল বি পাশ করে বারে যোগদান করি তখন আমার খুব আনন্দ হয়েছিল। আমি অ্যাডভোকেট হয়েছি, নিজ পায়ে দাঁড়িয়েছি। আম্মার খুব ইচ্ছা ছিল কিন্তু দেখে যেতে পারেননি তাই কষ্টও হয়েছে। “
বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশায় বলেছেন, “তাদের মানবিক মূল্যবোধ যেন জেগে উঠে। তারা যেন পড়াশোনার সাথে সাথে নিজেকে একজন সুন্দর মনের মানুষ হিসেবে তৈরি করে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্জিত বিজয়ের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা সুনামগঞ্জের অহংকার এক যোদ্ধা মায়ের গর্ভজাত সতীশের বালিকা সহদোরারা আগামী আরোও সুখ্যাতির সাথে এগিয়ে চলুন – সফলতা ছিনিয়ে এনে জীবন করুন কানায় কানায় পূর্ণ, এই কামনাই রইলো।


