সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য্য
আজ যাঁকে নিয়ে হাজির হয়েছি তিনি নিরহংকারী, নিরাভরণ,নিবেদিতপ্রাণ আদর্শ শিক্ষিকা হিসেবে বরণীয় সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। বাবা প্রয়াত গুরুদয়াল দাশ ও মা প্রয়াত উজ্জ্বলা দাশের নয় সন্তানের মধ্যে তিনি অন্যতম কারণ বাবার অকাল মৃত্যু তাঁকে পারিবারিক কর্তৃত্বের দায়বদ্ধতায় আবদ্ধ করে। জীবনের সুখ-শান্তি, চাওয়া-পাওয়াকে তুচ্ছ করে নিজ দায়িত্বে প্রত্যেক ভাইবোনকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে পেশার সাথে সম্পৃক্ত করেই হাল ছাড়েননি, বিয়ে দিয়ে প্রত্যেককে সংসারী হিসেবে যার যার নিজস্ব ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে, বর্তমানে নিজের মত করে স্বাধীন জীবন যাপন করছেন। তিনি আমাদের সবার প্রিয় দিদি অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শ্রীমতি প্রশান্তি দাশ। ১৯৪২ খ্রীস্টাব্দের ২৯শে জানুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
১ম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন ১৯৫৭, ১ম বিভাগে আই.এ ১৯৫৯ এবং ২য় শ্রেণীতে বি.এ ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে। পেশায় যোগদানের পর ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.এড. প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সতীশচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে পেশাগত জীবনের শুরু ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে। যোগদানের প্রায় আট বৎসর পর বিদ্যালয়টি সরকারী বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে। সহকারী শিক্ষিকার পদে বহাল থেকে প্রায় বত্রিশ বৎসর শিক্ষকতা জীবনে ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ হিসেবে সুখ্যাতির সাথে ছিল ত্াঁর পদচারণা। ইংরেজিতে পারদর্শী শ্রীমতি প্রশান্তি দাসের পাঠদানে ছিল সাবলীলতার যাদু। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে সহকারী প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে পদোন্নতি ও বদলী হয়ে সুনামগঞ্জের সরকারী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে পদোন্নতি লাভের পর মৌলভীবাজার জেলাধীন সরকারী আলী আমজদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলী এবং চার বৎসর পর বদলী হয়ে পুনরায় সরকারী সতীশচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এসে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে মোট আটত্রিশ বৎসরের পেশাগত জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
সতীশচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিতে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। স্কুল-কলেজের বার্ষিক ম্যাগাজিনে ইংরেজিতে কবিতা লিখতেন। পাকিস্তান আমলে একবার স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে ইংরেজিতে বিতর্ক করে বিজয়ী হয়েছিলেন। ১৯৮৮ সনে মাধ্যমিক স্তরে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক এবং ২০০৩ সনে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্রেস্ট লাভের সম্মাননা অর্জন করেন। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা নিয়েও রান্নাবান্না ও সংসারের খুঁটিনাটি কাজ নিজেই করে থাকেন। সুস্বাদু আহার রান্না ও সেলাই বিশেষ করে উলের পোষাক তৈরিতে পারদর্শী শান্ত প্রকৃতির শ্রীমতি প্রশান্তি দাশ নিয়মিত পত্রিকা ও গল্পের বই পড়েন এবং টেলিভিশন দেখে অবসর সময় কাটান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সুনামগঞ্জ মহাবিদ্যালয় থেকে ১৩ তম স্থান লাভ করে আইএ পাশের স্মৃতিই জীবনের উজ্জ্বলতম সুখের স্মৃতি। প্রজন্মের প্রতি তাঁর প্রত্যাশা, “পড়াশোনা কর, বড় হও, জ্ঞানার্জন দ্বারা অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধি কর, চারদিকে ছড়িয়ে দাও তোমার জ্ঞানের আলো।” যদিও বার্ধক্য তাঁকে ছুঁয়েছে তবুও দৃঢ় মনোবল ও শান্ত-স্থির- সাবলীল জীবন যাপনে অভ্যস্ত এই মহিয়সী শ্রদ্ধেয় শিক্ষিকা চিরকুমারী শ্রীমতি প্রশান্তি দাশের সুস্বাস্থ্যসহ শান্তিময় নিরোগ জীবন কামনা করি। পরিশেষে প্রিয় দিদিকে জানাই সশ্রদ্ধ অভিবাদন।


