সবজি বাজারে দফায় দফায় টোলের নামে চাঁদাবাজি/বাজারে চাষীদের উপস্থিতি কমেছে

স্টাফ রিপোর্টার
সদর উপজেলার সবজি চাষিরা ক্ষেতে উৎপাদিত সবজি বাজারে বিক্রি করে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। ইজারার নামে দফায় দফায় টাকা প্রদান এবং বাজারে বসতে দখলদার নামে আরও ১৮ জনকে চাঁদা দেওয়ায় ‘গুড়ের লাভ, পিপড়ায় খাওয়ার অবস্থা হয়েছে তাদের। ক্রেতারা যখন লাউ, ফুলকপি বাজার থেকে বিশ থেকে চল্লিশ টাকা ধরে কিনছেন। কৃষকরা তখন বাড়িতে রেখে পাঁচ থেকে ছয় টাকা ধরে বিক্রি করছেন এসব সবজি।
সবজি চাষিরা বলছেন, তারা সবজি বাজারে নিয়ে আসলে বিভিন্ন জায়গায় টাকা দিতে হয়। নদীরপাড়ের জায়গায় ১৮ জনেরও বেশি দখলদার রয়েছেন। সেখানে সবজি নিয়ে বসলে নির্দিষ্ট পরিমাণে ভাড়ার নামে চাঁদা না দিলে বসতে দেয় না দখলদারেরা। প্রথমে জায়গার জন্য দিতে হয় প্রতি পিস সবজির জন্য এক টাকা করে। এরপর এক কাচা সবজির জন্য পৌরসভার ইজারাদারকে দিতে হয় ২০ টাকা। এখানে আবার ক্রেতাকেও জমা দিতে হয়। এই কয়েক দফা টাকা দিতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার কৃষকেরা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের বালুচর হাটির বাসিন্দা সবজি চাষি ওসমান আলী ভূইয়া বললেন, এবার ৩ কেয়ার (৩০ শতাংশে ১ কেয়ার) জমিতে পুঁইশাক, লাউ, ফুলকপি, সিম, মরিচ চাষ করেছি। এগুলো বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারি না। এই সবজিগুলো চাষ করতে যে টাকা খরচ হয়েছে, বাজারে নিতে গেলে এর চেয়ে বেশি টাকা পরিবহন, বাজারের ট্যাক্স ও জায়গার ভাড়া লাগবে। একারণে কম দামে বাড়িতে রেখেই বিক্রি করছি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জ পৌর কর্তৃপক্ষ সবজি বাজার এক বছরের জন্য ভ্যাটসহ ২৮ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা দিয়েছে। ইজারাদারকে পৌরসভার নির্ধারিত করে দেয়া ফুলকপি, বাধাকপি ৪০ কেজির জন্য ১০ টাকা, সিম প্রতি বস্তা ১৫ টাকা, টমেটো মণপ্রতি ১২ টাকা, আলু ৪০ কেজির জন্য ৫ টাকা, মুলা ৪০ কেজির জন্য ৫ টাকা। এছাড়াও অন্যান্য সবজির জন্য ৪০ কেজির জন্য ১২ টাকা টোল আদায় করতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, একবারই আদায় করতে হবে।
সবজির বাজারের ইজারাদার এসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না। ইজারাদারের লোকজন ইচ্ছামত টোল আদায় করছেন কৃষকদের কাছ থেকে। এতে বাজারে আসতে উৎসাহ হারিয়েছেন কৃষকরা।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের জিনারপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. উজ্জ্বল আহমেদ শাওন বললেন, নদীর কিনারে ৪ হাত জায়গার এক মৌসুমের জন্য আমাকে সতেরো হাজার টাকা দিতে হয়েছে। বাজারের ইজারাদারকে প্রতিটি ফুল কপি বাঁধা কপির জন্য এক টাকা করে দিতে হয়। একবস্তা সিম আনলে বিশ টাকা দিতে হয়। অতিরিক্ত টাকা দেয়ায় আমাদের লোকসান হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়নের জর্জরিয়া গ্রামের বাসিন্দা জলিল মিয়া বললেন, ইজারাদারকে সবজির কাচা প্রতি ২০ টাকা দেয়া লাগে। জায়গার মালিকও এসে বলে প্রতি খাচার জন্য ২০ টাকা দিতে। এই দুই জায়গায় কাচা প্রতি ৪০ টাকা দিয়ে এখন পুষায় না আমাদের। এজন্য বাজারে যাই না।
সবজি চাষিরা বললেন, একদিকে সবজির দাম কমেছে। অন্যদিকে, সবজি নিয়ে যেখানে দাঁড়াই সেখানেই টাকা দিতে হবে। টাকা কম দিলে মা-বাপ তুলে বকাবকি করে।
জামালগঞ্জ উপজেলার জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের লম্বাবাক গ্রামের বাসিন্দা আসাদ আলী জানালেন, তিনি বাজারের দখলদার মাসুক নামের একজনের কাছ থেকে ৪ মাসের জন্য ৪ হাত জায়গা ১৫ হাজার টাকা দিয়ে নিয়ে বসছেন।
সবজি বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি নুর মিয়া বললেন, জাহান, সোহেল, আশরাফুল, মাসুক, সোহাগ, গিয়াস মিয়া, ওয়াসিম মিয়া সহ আরও কয়েকজন নদীরপাড়ের সবজি বাজারের দখলে আছেন। তারা তাদের দখল করা জায়গায় অন্য কেউ বসলে ভাড়া নেন। জোর করে টাকা আদায়ের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বললেন, দখলদারেরা নদীর কিনারে মাটি ফেলে জায়গা করায়, সেখানে বসে সবজি বিক্রি করে যাই দেয়, তারা সেটি নেন।
তিনি অবশ্য বাজারের ইজারাদারদের দোষারুপ করে বললেন, এক বস্তা সবজির জন্য ২ বার টোল দিতে হয়। প্রথমে কৃষকের কাছ থেকে, পরে আরৎদারের বা ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া হয়। এতে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। বিষয়টি পৌরসভার নজরে এনেও কোনো ফল হচ্ছে না।
পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত বাজারে অতিরিক্ত টোল আদায়ের বিষয়টি নজরে এসেছে জানিয়ে, তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেবার কথা জানালেন তিনি। বাজার যাদের লিজ দেয়া হয়েছে, তাদেরকে নির্ধারিত টোলের বেশি আদায় করতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি। তিনি জানালেন, নদীর পাড়ের জায়গার কেউ দখলদার হতে পারে না। কাউকে এখানে টাকা তুলতেও দেওয়া হবে না।