সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ কর্মসূচী- এবার অন্তত কিছু কৃষক সুফল পাক

সরকারি খাদ্য গোদামে ধান-চাল ক্রয় অভিযানে এবার প্রকৃত কৃষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। এরমধ্যে কৃষি বিভাগ ও চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সহায়তায় প্রকৃত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন ও বিক্রিত ধান-চালের দাম সরাসরি কৃষকের ব্যাংক হিসাবে পরিশোধের ব্যবস্থা অন্যতম। আজ কৃষকদের তালিকা দাখিলের শেষ দিন। কাগজেপত্রে ৭ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও একমাত্র তাহিরপুর খাদ্য গোদাম ছাড়া আর কোথাও ধান-চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে বলে জানা যায়নি। বহু জায়গায় এখন পর্যন্ত কৃষকদের তালিকাই শেষ করা হয়নি বলে জানা গেছে। এরচাইতেও বড় কথা এর সুফলভোগী যারা সেই কৃষকরাই জানেন না সরকার তাঁদের নিকট থেকেই ধান চাল ক্রয়ে আগ্রহী। প্রতিটি উপজেলায় খাদ্যশস্য সংগ্রহ কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে একটি করে কমিটি রয়েছে। ওই কমিটিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাগণ ছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা রয়েছেন। প্রকৃত কৃষকদের যে তালিকা তৈরি হচ্ছে সেটির নেতৃত্ব দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। কৃষি বিভাগের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট এলাকার মেম্বার ও চেয়ারম্যানগণের সাথে যোগাযোগ করে মাঠ পর্যায়ে এই তালিকা করবেন। অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে কৃষক তালিকা প্রণয়নে মাঠ পর্যায়ে এই নীতিমালা লঙ্ঘিত হচ্ছে। অনেক জায়গায় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের পছন্দের ব্যক্তির্ইা তালিকাভুক্ত হচ্ছেন এমন অভিযোগও রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে যদি এই অবস্থা হয় তাহলে প্রকৃত কৃষকরা কি তাদের কষ্টার্জিত ধান চালের ন্যায্যমূল্য পাবেন?
কোন এক জাঁদরেল সরকারি আধিকারিক নিজ কর্তব্যবিচ্যুতির কারণে স্বপদ হারিয়ে সাগরের ঢেউ  গোনার কাজে নিয়োজিত হয়ে সেখান থেকেও অবলীলায় ঘুষ গ্রহণের বিষয়ে একটি চমৎকার গল্প প্রচলিত রয়েছে। এই গল্পের নিহিতার্থ হচ্ছে ব্যক্তির মন মানসিকতা ঠিক না হলে কেবল ব্যবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয়। আমাদের দেশে প্রায় সকল নীতিই ভাল। কিন্তু এই ভাল নীতিগুলাই মাঠ পর্যায়ে অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রযুক্ত হয়ে দুর্নীতির বিস্তার ঘটাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, সরকারি জলমহাল ইজারা নেওয়ার ক্ষেত্রে মৎস্যজীবী সমিতিসমূহ অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। প্রত্যেকটি জলমহাল ইজারার খোঁজ নিলে দেখা যাবে এগুলো কোন না কোন সমিতির নামেই ইজারা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোথাও জেলেরা এইসব বিল-জলাশয়ের সুবিধা পাচ্ছেন এমন চিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ এখানে তথাকথিত মৎস্যজীবী সমিতির নাম ব্যবহার করে সেই পুরাতন ওয়াটারলর্ডরাই রাজত্ব করছেন। তাদের এই অপকর্মে সহায়তা দিচ্ছে সরকারের কিছু অসৎ কর্মচারী এবং চরিত্রহীন কিছু মৎস্যজীবি নামধারী ব্যক্তি। সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহের জন্য এখন যে কৃষক তালিকা তৈরি হচ্ছে সেখানেও এই অবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কৃষক ঠকানোর এই কাজটির জন্য প্রথমত আমরা ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা না থাকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিব। কারণ তাঁরা সচেতন থাকলে কৃষকদের ঠকানো কিছুতেই সম্ভব হবে না।
বাজার ও সরকারি খাদ্যগোদামে প্রতি মণ ধানের দামের পার্থক্য তিন থেকে সাড়ে তিন শ’ টাকা। কৃষকরা গোদামে ধান সরবরাহে ব্যর্থ হলে ওই পরিমাণ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন । এই লাভের অংক চলে যায় কিছু ফরিয়ার পকেটে। আর অংশবিশেষ নৈবেদ্য হিসাবে চলে যায় সরকারি কর্মকর্তাসহ নানা স্থানে। এবার কৃষক তালিকা তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্তরাও যদি এর ভাগ বণ্টক নেওয়া শুরু করেন তাহলে সাগরের ঢেউ গোনার গল্পটিকেই স্বার্থক করে তোলা হবে। সরকারের সদিচ্ছা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তায় মাঠ প্রশাসনের উপর। মাঠ প্রশাসনের ব্যক্তিরা সততার সাথে দায়িত্ব পালন করলেই কেবল এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব।