জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারটি ৬১ বছরের পুরাতন একটি প্রতিষ্ঠান। এখন নিজস্ব ভবনে মনোরম পরিবেশে শহরের হাছননগর এলাকায় এই গ্রন্থাগারটি বহু মানুষের পাঠইচ্ছা পূরণে ভূমিকা রাখছে। ওই গ্রন্থাগারের একজন নিয়মিত পাঠক ডা. মুরশেদ আলম গ্রন্থাগারের বিভিন্ন বিবরণ ও এর সমস্যাদি নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি প্রতিবেদন লিখেছেন। তাঁর এই প্রতিবেদনটি গ্রন্থাগারটিকে পরিপূর্ণভাবে জানার জন্য অত্যন্ত সহায়ক। মোটাদাগে তিনি গ্রন্থাগারের সমস্যা হিসাবে জনবল সংকট ও পরিবেশগত কিছু বিষয় তুলে এনেছেন। আমরা জানি যেকোন প্রতিষ্ঠানকে সক্ষমভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে এর লজিস্টিক সাপোর্ট অব্যাহতভাবে জুগিয়ে যেতে হবে। নতুবা একটা সময়ে প্রতিষ্ঠানটি সক্ষমতা হারাতে বাধ্য। যে গ্রন্থাগারে প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদাসম্পন্ন একজন গ্রন্থাগারিকসহ ৪টি পদের মঞ্জুরিপ্রাপ্ত সেখানে মাত্র একজন জুনিয়র লাইব্রেরিয়ান পুরো গ্রন্থাগারটিকে সচল রাখতে পারবেন কী করে, সংগতভাবেই প্রশ্নটি চলে আসে। ডা. মুরশেদ আলমও তাই জনবল সমস্যা সমাধানের জন্য নিজের আকুতি ফুটিয়ে তুলেছেন প্রতিবেদনে।
একটি গ্রন্থাগার নিছক আর দশটি প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। এটি জ্ঞান বিকাশে ভূমিকা রাখে। মানুষ যখন বইয়ে আসক্ত হয় তখন অপরাপর কুঅভ্যাস থেকে দূরে থাকে। পাঠাভ্যাস মানুষের ভিতরকার শক্তির জাগৃতি ঘটায়। তাই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সাথে গ্রন্থাগারচর্চাকে সর্বদাই গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। আজকাল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে গ্রন্থাগারবিমুখতার প্রচ- কুঅভ্যাস লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষার্থীরা চোখ বুজে গাইড মুখস্থ করে শুধু পরীক্ষা পাস করতে চায়। এর মধ্য দিয়ে তারা একাধিক ডিগ্রি অর্জন করছে সত্য কিন্তু খুব কম সংখ্যকই প্রকৃতপ্রস্তাবে শিক্ষিত হয়ে উঠছেন। এই খ-িত শিক্ষিত তথা ডিগ্রিধারীরা যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন বাস্তবতার সাথে তাল মিলাতে পারে না। অধীত বিদ্যার সাথে এই যে সামঞ্জস্যহীনতা তা দূর করে পাঠাগার তথা পাঠ্যবহির্ভূত পুস্তকাদি। এরকম প্রেক্ষাপটে বই পাঠের অভ্যাসকে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সরকার নানা ধরনের উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। সরকারি গণগ্রন্থাগারকে আধুনিকায়ন ও পর্যাপ্ত জনবল মঞ্জুরি দান তার প্রমাণ। আগে এই গণগ্রন্থাগারটির অস্তিত্ব মানুষের চোখের অন্তরালে ছিল। কিন্তু হাছননগরের দৃষ্টিনন্দন ভবনে স্থানান্তরের পর এখানে পাঠক সমাগম বেড়েছে অনেক বেশি। দিনের অধিকাংশ সময়ই পাঠক দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে এটি। অনেকে নিজস্ব প্রয়োজন অনুসারে বই খোঁজে বাড়িতে নিয়ে যান অথবা গ্রন্থাগারে বসেই পাঠ করেন। জেলা সদরের জ্ঞ্যনাণ্বেষী মানুষের মিলনস্থল এই গ্রন্থাগারটিকে তাই যাবতীয় সমস্যামুক্ত অবস্থায় দেখা আমাদের সকলের অভিপ্রায়। ডা. মুরশেদ আলম জনবল সংকট, নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপ্রতুলতাসহ যেসব বিষয়াদির উল্লেখ করেছেন আমরা আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়ে সেগুলোর দ্রুত সমাধান করবেন।
একই সাথে আরও কিছু বিষয়ের প্রতি আমরা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সেটি হলো এখানে বইয়ের সংগ্রহকে আরও বৈচিত্রপূর্ণ করতে হবে। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার দেশি-বিদেশি বইয়ের সমাবেশ ঘটাতে হবে এখানে। বই কেনার জন্য বিশাল বাজেটের প্রয়োজন হয় না। প্রতিবছর কিছু কিছু করে কয়েক বছরে একে সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায় পরিণত করা সম্ভব। এজন্য দরকার শুধু উদ্যোগ। আর এই উদ্য্গো নেয়া তখনই সম্ভব হবে যখন এখানে মঞ্জুরিপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ানসহ সকল পদে জনবল পদায়নের ব্যবস্থা করা হবে। আমরা জানতে পেরেছি শুধুমাত্র আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে বর্তমান জুনিয়র লাইব্রেরিয়ান প্রচ- পরিশ্রম করে গ্রন্থাগারটিকে সচল রাখছেন। একা তাকে সবকিছু এমনকি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দায়িত্বও মাঝেমধ্যে পালন করতে হয়। এমন একজন বইপ্রেমিক মানুষকে আমাদের শ্রদ্ধা।

