বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের বিসিক শিল্পনগরীতে উদ্যোক্ত আছেন ২৬ জন। সক্রিয় এই উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগেই করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্ত। অথচ সরকারি প্রণোদনার ৩৫ লাখ টাকা পেয়েছেন চার উদ্যোক্তা। এরমধ্যে একজন সরকারি চাকুরিজীবীকেও ১০ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। প্রণোদনার টাকা প্রদানে অনিয়মের ঘটনায় ক্ষুব্ধ সুনামগঞ্জ বিসিকের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ।
সুনামগঞ্জ বিসিকের প্লট বরাদ্দের কাজ শুরু হয় ২০০৬ সাল থেকে। এখন এই শিল্পনগরীতে মোট ২৬ জন শিল্প উদ্যোক্তার কারখানা রয়েছে। কোনো কোনো উদ্যোক্তার একাধিক কারখানাও আছে। সকলেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। কটন মিল, কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি, মুড়ি মিল, বেকারি, অ্যালমুনিয়াম ফ্যাক্টরিও রয়েছে অনেকের। প্রথম দিকে সরকারি অনেক সহযোগিতা পাবার আশ্বাস শুনলেও কারখানা শুরুর পরে কোনো সহযোগিতাই পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা।
করোনাকালের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠতে সরকারি ৪০ লাখ টাকার বরাদ্দ আসে সুনামগঞ্জ বিসিকে। এই টাকা বরাদ্দের বিষয়ে ২৬ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মধ্যে ২২ জনের সঙ্গেই কথা বলেন নি বিসিক কর্তৃপক্ষ। উদ্যোক্তাদের মধ্যে ৪ জনকে নিয়ম বহির্ভুতভাবে ৩৫ লাখ টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে। এরমধ্যে একজন সরকারি চাকুরীজীবীও রয়েছেন। প্রণোদনার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সরকারি বা আধাসরকারি চাকুরীতে যুক্ত কোনো ব্যক্তিকে ঋণ না দেবার কথা বলা হলেও, এক্ষেত্রে তা মানা হয় নি। বিসিকের দায়িত্বশীলদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।
বিসিক শিল্প নগরীর এনএন ফুড প্রোডাক্টের মালিক নিখিল দেব নাথ বললেন, আমার কারখানায় ১০ জন শ্রমিক রয়েছে। কাজ না থাকলেও করোনাকালে তাদের বেতন দিয়েছি। কয়েকমাস আগে প্রণোদনার প্যাকেজ এসেছিলো। সেখান থেকে ঋণ পাইনি আমি।
সুমন এন্টারপ্রাইজের মালিক নিদু রঞ্জন দাস বললেন, ২০১৭ সালে প্রায় ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে চানাচুর ফ্যাক্টরী দিয়েছি। শুরুর পরেই করোনা মহামারি। পরে আমার কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা আশা করেছিলাম সরকারি অনুদান পাবো। কিন্তু কোনো রকমের সাহায্য সহযোগিতা পাই নি। শুরুর দিকে ১০ জন কর্মচারি থাকলেও এখন ২ জনের বেতনই দিতে পারছি না। এজন্য ফ্যাক্টরী বন্ধ রেখেছি।
সরকারি প্রণোদনা ৪ জনকে দেওয়া হয়েছে। যাদের ঋণ আছে, তারাও পেয়েছে। সরকারি চাকুরিজীবীকে দেওয়া হয়েছে।
বি-বাড়িয়া বেকারির মালিক আব্দুল করিম বললেন, ২০১০ সালে সুনামগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীতে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ফ্যাক্টরি চালু করি। গেল ৩ বছর ধরে আমার বেকারি অচল হয়ে আছে। কারিগরকে বেতন দিতে পারি না। সরকারি কোনো ঋণ পাই না। এখন খোলা রাখাই কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রণোদনার ৪০ লাখ টাকার বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয় নি।
বিসিক শিল্প নগরীর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল হোসেন কালাম বললেন, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রণোদনা সহায়তার ৩৫ লাখ টাকা বিসিকের কর্মকর্তারা দেবার সময় আমাদের জানান নি। ঋণ খেলাপি ও সরকারি কর্মচারীকেও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের মেকানিক মো. খালেদ মিয়াকে শিল্প উদ্যোক্তা দেখিয়ে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আরেকজন কমল মিয়া। তিনিও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। তাকেও ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। অন্য দুইজনের মধ্যে কাবুল ইসলামকে ১০ লাখ ও আল আমিনকে ৫ লাখসহ মোট ৩৫ লাখ টাকার প্রণোদনা দেওয়া হয়। অথচ. সক্রিয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে কম কম করে প্রণোদনা দিলেও এরা ক্ষতি কাটিয়ে ওঠতে ভরসা পেতো।
বিসিক শিল্প নগরীর মালিক সমিতির সভাপতি মো. খালেদ মিয়া বললেন, আমি সরকারি একটি ছোট চাকুরি করি, বেতন যা পাই, চলা দায়। এজন্য ছোট খাটো ব্যবসা করছি। সকল ক্রাইটেরিয়া পূরণ করায় আমাকে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকে আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই বিষয়ে সুনামগঞ্জ বিসিকের উপব্যবস্থাপক এম. এস. এম আসিফ বললেন, প্রণোদনা প্যাকেজের প্রথম পর্যায়ের আওতায় বিসিক জেলা কার্যালয় থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত ৪০ লক্ষ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। শিল্প নগরীর ভেতরের বিসিকের উদ্যোক্তাদের ৩৫ লাখ এবং শিল্প নগরীর বাইরের আরও চার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে পাঁচ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। যারা লিজ দলিল সম্পন্ন করেছেন তাদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। পূর্বের পাওনা যারা নিয়মিত পরিশোধ করেছেন, যাদের আর্থিক লেনদেন ভালো তাদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সরকারি চাকুরীজীবীকে ঋণ বিতরণ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের জানা মতে বিসিকে যারা আসেন, তারা ব্যবসায়ী হিসেবে ব্যবসা করে আসছেন। এখানে কেউ চাকুরীজীবী আছেন কি না আমার জানা নেই। যদি কেউ সরকারি চাকুরীজীবী থাকেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেবেন। আমরাও তখন ব্যবস্থা নেব।


