সরেজমিন ছাতকের ভোটচিত্র আলোচনায় ‘এমপি বাড়ি’ ও ‘মেয়র বাড়ি’

বিশেষ প্রতিনিধি
ছাতকের ১৩ ইউনিয়নের নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে উপজেলার আমেরতলের এমপি বাড়ি এবং ছাতক পৌরসভার মেয়র বাড়ি থেকেই। এই দুই বাড়িতে প্রতিদিনই প্রকাশ্য সভা, অথবা ঘরোয়া সভা হচ্ছে। বিদ্রোহীদের নিয়ে হচ্ছে ঘরোয়া সভা এবং আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীদের নিয়ে হচ্ছে প্রকাশ্য সভা। ছাতকের ভোটাররা বলছেন,‘ছাতকের ১৩ ইউনিয়নের নির্বাচনী ম্যাসেজ আসে আমেরতল ও বাগবাড়ি থেকে’।
ছাতক – দোয়ারাবাজারের ৩ বারের সংসদ সদস্য ও একবারের উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভাপতি মুহিবুর রহমান মানিক এমপি। নির্বাচনী এলাকায় তাঁর জনপ্রিয়তার কথা  
আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের মুখে মুখে। একইভাবে ছাতক পৌরসভার দুই বারের মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালামও পৌর এলকায় জনপ্রিয় বলেই দাবি তাঁর সমর্থকদের। আবুল কালাম পৌর মেয়র হলেও তাঁর রাজনৈতিক শক্তির যোগান দেন ছোট ভাই ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শামীম চৌধুরী।
গত প্রায় ১৫ বছর ধরে স্থানীয় কিংবা জাতীয় নির্বাচনে সরগরম হয়ে উঠে আলোচিত এই দুই বাড়ি।
উপজেলার উত্তর খুরমা ইউনিয়নের আমেরতলের এমপি বাড়ি। একই বাড়ির বাসিন্দা সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের চাচাতো ভাই উত্তর খুরমার ইউপি চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা বিল্লাল হোসেনও।
ছাতকের ১৩ ইউনিয়নের নির্বাচনী প্রচারণা সরেজমিনে দেখতে এবং চেয়ারম্যান প্রার্থীদের গণসংযোগের ছবি সংগ্রহের জন্য কথা বলার সময় প্রার্থীদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে অনেকেই নিজের ইউনিয়নে নেই জানিয়ে কেউ বলেন- ‘আমেরতলে এমপি সাবের বাড়িতে আছি’, কেউ বলেন, ‘আমি ছাতকে মেয়র সাবের কাছে এসেছি’।
ছাতকের নোয়ারাই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী দেওয়ান আব্দুল খালিকের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে ছাতক শহরে গিয়েই। দেওয়ান আব্দুল খালিক মুঠোফোনে বললেন,‘মেয়র সাব (কালাম সাব) আমাকে ডেকেছেন, জরুরি ভিত্তিতে ওখানে যেতে হবে। কথা বলতে হলে মেয়র সাবের বাসায় চলে আসেন’।
কেবল আব্দুল খালিক নয়, ছাতকের বিভিন্ন ইউনিয়নে আবুল কালাম ও শামীম চৌধুরী’র সমর্থক প্রার্থীদের সকলেরই পরামর্শের ঠিকানা বাগবাড়ি’র মেয়র বাড়ি অথবা কালাম চৌধুরী’র ছাতক শহরের মন্ডলী ভোগের শাহজালাল আবাসিক এলাকার বাড়ি।
একইভাবে ছাতকের চরমহল্লা ইউনিয়নের প্রার্থীদের খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেলো- চরমহল্লার আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী কদর মিয়ার নির্বাচনী সভা চলছে আমেরতলে সংসদ সদস্যের বাড়িতে।
পরে আমেরতলের এমপি বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সহ¯্রাধিক মানুষের গণ-জমায়েতে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের আলোচনা সভার ব্যানার লাগানো। সভায় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, ছাতক উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক লুৎফুর রহমান সুরকুম, ছাতক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল, চরমহল্লা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান কদর মিয়া প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করার পাশপাশি প্রায় সকল বক্তাই কদর মিয়াকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার আহ্বান জানালেন। চেয়ারম্যান প্রার্থী কদর মিয়া ৪০ মিনিট বক্তব্য দিলেন এবং তাঁর কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে ক্ষমা সুন্দরভাবে দেখার আহ্বান জানিয়ে আগামী ৩১ মার্চ নৌকায় ভোট দেবার আহ্বান জানালেন।
আমেরতলের বাড়িতে উপস্থিত একজন আওয়ামী লীগ কর্মী বলেন, ‘গত ১৮ মার্চ থেকে প্রতিদিন বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের আলোচনা সভা হচ্ছে এবং একই সঙ্গে ভোটের প্রচারণাও চলছে’।
ছাতক পৌর এলাকা এবং আমেরতলের আশপাশের একাধিক আওয়ামী লীগ কর্মী ও সাধারণ ভোটাররা বলেন,‘দুই বাড়িতেই আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীরা আসেন, আবার বিদ্রোহীদের বিচরণও এই দুই বাড়িতেই’।
জেলার শিল্প সমৃদ্ধ এবং সবচেয়ে বড় উপজেলা ছাতকের ১৩ ইউনিয়নের ১০ টিতেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি দলীয় বিদ্রোহীরা।
ছাতক সদর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে কালাম-শামীম সমর্থক সাইফুল ইসলামকে। এই ইউনিয়নে মূল প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠেছেন বিদ্রোহী প্রার্থী মো. সেলিম মিয়া। কালারুকা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে কালাম-শামীম সমর্থক অদুদ আলমকে। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন দলীয় নেতা আফতাব উদ্দিন, গোবিন্দগঞ্জ-সৈদেরগাঁও ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে মুহিবুর রহমান মানিক সমর্থক সুন্দর আলীকে। এখানে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আখলাকুর রহমান। সিংচাপইড় ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে কালাম-শামীম সমর্থক সাহাব উদ্দিন সাহেলকে। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন যুব লীগ নেতা মোজাহিদ আলী। জাউয়াবাজার ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে মানিক সমর্থক নুরুল ইসলামকে, বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন দলীয় নেতা বশির আহমদ, রেজা মিয়া তালুকদার ও মুরাদ আহমদ। নোয়ারাই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে মানিক সমর্থক আফজাল আবেদীন আবুলকে, এই ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন দেওয়ান আব্দুল খালিক। উত্তর খুরমা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে মানিক সমর্থক বিল্লাল হোসেনকে, এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন শামছুল ইসলাম খান। চরমহল্লা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে মানিক সমর্থক মুক্তিযোদ্ধা কদর আলীকে, এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন দলীয় নেতা আজাদ মিয়া ও সিরাজুল হক। ছৈলাআফজলাবাদ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে মানিক সমর্থক গয়াছ আহমদকে, এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন দলীয় নেতা আব্দুল খালিক।
ছাতক আওয়ামী লীগের একাংশের নেতা শামীম চৌধুরী বললেন,‘আমাদেরকে ১৩ টি ইউনিয়নের মধ্যে দলীয় সভানেত্রী ৩ টি ইউনিয়নে প্রার্থী দিয়েছেন। আমরা কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থী দেইনি’। ছাতক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান মানিকের সমর্থক অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল বলেন,‘বিদ্রোহী কিসের, আমরা আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষেই আছি, বিদ্রোহী বলতে কোন শব্দ নেই, নির্বাচনে যারা দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, এরা প্রতিপক্ষ’। তিনি বললেন,‘নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হবে এজন্য সংসদ সদস্য মানিক কোথাও এই সময়ে কোন কর্মসূচীই দেননি। তাঁর নিজের বাড়িতেই বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের আলোচনা সভা করেছেন এবং কর্মসূচীতে নেতা কর্মীদের ঢল নামছে’।