স্টাফ রিপোর্টার
করোনা ভাইরাসের কারণে টানা লকডাউনে সংকটে পড়েছে সুনামগঞ্জের পুস্তক ব্যবসায়ীরা। লকডাউনের ৫১ দিন পার হয়ে গিয়েছে, এই ৫১ দিন ধরেই বন্ধ জেলার প্রায় ২০০শত’ লাইব্রেরী। এতে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বই ব্যবসায়ীরা। স্কুলে ও কলেজে শিক্ষা সেসন শুরুর সময়ই বইয়ের ব্যবসার মৌসুম, এই মৌসুমেই বন্ধ লাইব্রেরিগুলো। ব্যবসায়ীরা বলেন, কিছু পরীক্ষা বাতিল অথবা না হওয়ায় অনেক বইয়ের চাহিদাও আর থাকবে না। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে পুস্তক ব্যবসায়ীদের।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, লাগাতার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক লাইব্রেরি মালিকেরা বুঝতেই পারছেন না কি করবেন বা তাদের পদক্ষেপ কি হবে। পুস্তক ব্যবসায়ীদের দুঃশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে কপালে।
এদিকে লকডাউনের কারণে লাইব্রেরি বন্ধ থাকলেও দোকান ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সঞ্চয়ে টান পড়েছে। ধার-কর্জ করে চলতে হচ্ছে।
করোনা সংকট থেকে উত্তোরণে এজন্য ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ সহজ করার দাবি জানিয়েছেন। এছাড়াও প্রত্যেকদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লাইব্রেরীগুলো খোলে রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, অভিভাবকরা তাদের ফোন দিয়ে বলছেন, স্কুল বন্ধ, প্রাইভেট টিউটরের কাছেও শিক্ষার্থীরা পড়তে পারছে না, এরমধ্যে বইও কেনা হয় নি, আপনারা লাইব্রেরি না খুললে আমরা বই নেব কীভাবে? বিশেষ করে নবম শ্রেণির বই নিয়ে বেকায়দায় শিক্ষার্থীরা।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার সিটি লাইব্রেরি’র মালিক কবীর হোসেন বলেন, লকডাউনের শুরু থেকেই দোকান বন্ধ। লাইব্রেরি বন্ধ তাই আয়ও নেই। সঞ্চয় শূন্য। কোম্পানীর অনেক মাল পড়ে রয়েছে। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় এগুলো ফেরতও দেয়া যাচ্ছে না। না দিতে পারলে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে আমাদেরকে। বেশীরভাগ ব্যবসায়ীরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ব্যাংকও বারবার তাগদা দিচ্ছে টাকার জন্য। উপজেলা সদরের দুইটি সহ উপজেলার ৮-১০টি লাইব্রেরি’র একই অবস্থা।
তিনি বলেন, লকডাউন থাকলেও আমাদেরকে দোকান ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে, স্টাফদের বেতন দিতে হচ্ছে। আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে আমরা। তিনি বলেন, আমাদের ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ ও কিস্তি কয়েক মাসের জন্য স্থগিত করলে উপকার হতো।
সুনামগঞ্জ আইডিয়াল লাইব্রেরি ও স্টেশনারী’র ব্যবস্থাপক স্বপন কুমার দাস বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ও লকডাউনের কারণে লাইব্রেরি বন্ধ থাকায় আমরা এখন চরম অসহায় বোধ করছি। আগামীতে কি হবে জানি না। গত দুই মাস ধরে লাইব্রেরি বন্ধ আছে। আগে যেখানে দৈনিক ৫০-৬০ হাজার টাকা বিক্রি হতো, সেখানে এখন কোন বিক্রিই নেই। অথচ লাইব্রেরি ভাড়া, গোডাউন ভাড়া, ১০ জন স্টাফের বেতন আছে। শুধু আমাদেরই না প্রত্যেকটা লাইব্রেরিই কমবেশী একই অবস্থা। তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশনায় লাইব্রেরি নিয়ে কোন নির্দেশিকাই নেই। আমরা জানি না আগামীদিনগুলোতে কী হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা পুস্তক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মিন্টু রায় মিঠু বলেন, গত মার্চ মাসের ২৪ তারিখ থেকে কেন্দ্রীয় পুস্তক ব্যবসায়ী সমিতির নির্দেশে লাইব্রেরিগুলো বন্ধ রয়েছে। কয়েক দফা লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। স্কুল কলেজ বন্ধ, লাইব্রেরি খুললেও কতদূর চলবে তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে অনেকের মনে।
তিনি বলেন, লাইব্রেরির সিজন টাইম চলে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনায় মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিদিনই অসংখ্য ছাত্রছাত্রী আমাদেরকে ফোন দিচ্ছে বইয়ের জন্য। কিন্তু আমরা নিরূপায়, বই দিতে পারছি না। জেলার প্রায় ২০০ শত লাইব্রেরি চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। লকডাউনে লাইব্রেরি বন্ধ থাকলেও ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে। সঞ্চয়ে টান পড়েছে। অনেককে ঋণ নিয়ে চলতে হচ্ছে। লাইব্রেরি বন্ধ অথচ গত দুই মাসে আমারই প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী বুঝতেই পারছেন না কি করবেন।
তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে কিস্তির টাকার জন্য তাগদা দেয়া না হলেও ঘুরে দাঁড়াতে হলে অনেকের আবারও লোনের প্রয়োজন হবে। ব্যাংকগুলো যদি লোনের নিয়মনীতি সহজ করে তাহলে আমাদের জন্য সহায়ক হবে। অনেক ব্যবসায়ী সরকারি ব্যাংক ঋণের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ঋণের জন্য এনজিও’র দিকে ঝুঁকেন। এনজিগুলোতে ঋণ সহজে পাওয়া যায় কিন্তু সুদ দিতে হয় বেশী। একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লাইব্রেরিগুলো খুলে দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানান।


