জঙ্গিবিরোধী এক সপ্তাহের সাঁরাশি অভিযানে পুলিশ মোট ১৩৩৭৮ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। এর মধ্যে পরোয়ানাভুক্ত আসামির সংখ্যা ৬০২৬ জন, সন্দেহভাজন উগ্রপন্থী সংখ্যা ১৭৬ জন যার মধ্যে জেএমবি ও আনসারুল্লা বাংলা টিমের সদস্য বলা হচ্ছে ১৪৮ জনকে। এই সাঁরাশি অভিযানে গত ১৮ মাসে উগ্রপন্থীদের ৪৭টি হামলায় যে ৪৯ জন নিহত হয়েছেন, তাতে জড়িত কাউকে গ্রেফতারের কথাও পুলিশ জানাতে পারেনি। রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের এই ফলাফল শুক্রবারের দৈনিক সমকাল থেকে নেয়া। এদিকে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে গতকাল প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলায় এই অভিযানে মোট ২০২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, এর মধ্যে ১১ জন জামায়াতের কর্মী-সমর্থক বলে দাবি পুলিশের। কিন্তু খোদ জামাত দাবি করেছে তাদের মাত্র ৩ জন গ্রেফতার হয়েছে যার মধ্যে দুই জন ইতোমধ্যে জামিনে ছাড়া পেয়ে গেছেন। অন্যদিকে গ্রেফতারকৃত ২০২ জনের একটি বড় অংশ ছাড়া পেয়ে গেছে অভিযান চলাকালীন সময়েই। জেল সুপার জানিয়েছেন অভিযানের ৭ দিনে জেলে প্রেরিত আসামীর সংখ্যা ১০৬ জন। এই ১০৬ জনের সকলেই অভিযানের গ্রেফতার এমনটি মনে করারও কোন কারণ নেই। পুলিশের ৭ দিনের সাঁড়াশি অভিযানের দেশ ও জেলার এই পরিসংখ্যানকে মোটাদাগে বিশ্লেষণ করলে খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হওয়ার সুযোগ নেই। উদ্বেগের বিষয় হলো অভিযান চলাকালেই রিপন চক্রবর্তী নামে মাদারিপুরের এক কলেজ শিক্ষককে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে। সুতরাং এই ধরনের অভিযানকে কথিত জঙ্গিগোষ্ঠী যে খুব বেশি পাত্তা দিচ্ছে সেটি মনে করারও কোন উপায় নেই। আনুষ্ঠানিকভাবে ৭ দিনের অভিযান শেষ হলেও পুলিশের দায়িত্ব-কর্তব্যের জায়গাটি একটুও কমেছে বলে আমরা মনে করি না। বরং আমরা মনে করি দেশব্যাপী চলমান জঙ্গি হুমকি মোকাবিলায় পুলিশের দায়িত্ব অনেক অনেক বেশি বেড়ে গেছে। পুলিশকে প্রথাগত পদ্ধতির বাইরেও এই হুমকি মোকাবিলার উপায় খুঁজতে হবে।
গত দুই বছর যাবৎ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের যে বিশেষ প্যাটার্নটি ধীরে ধীরে পরিপুষ্ট হচ্ছে তার সাথে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের বিস্তর ব্যবধান। এখানে যেমন ইসলাম ধর্মের বিশেষ মতাবলম্বীদের হত্যা করা হচ্ছে আবার মুক্তমনা হিসাবে পরিচিত চিন্তকদের হত্যা করা হচ্ছে তেমনি একেবারেই সাধারণ হিন্দু ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষকেও হত্যা করা হচ্ছে। হত্যাকারীরা হত্যাকা- ঘটানোর পর দেশীয় কোন প্রচার মাধ্যমে অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর দায় স্বীকার করছে না। সন্দেহজনকভাবে প্রায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমেরিকার একটি সাইট থেকে এর সাথে আইএস জড়িত থাকার তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও আইএস’র অস্তিত্ব শক্তভাবে অস্বীকার করা হচ্ছে। এরকম একটি জটিল অবস্থায় গুপ্তঘাতকদের প্রকৃত পরিচয় এখন মানুষের নিকট অজানা, সম্ভবত সরকারেরও অজানা। এই ধরনের দমবদ্ধ অবস্থার অবসান ঘটা জরুরি। আর একারণেই পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি মাত্র। পুলিশকে জনগণকে আস্থায় নিয়ে বিস্তৃত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গুপ্তঘাতকদের তথ্য সংগ্রহ করে এদের পাখা ভেঙে দিতে হবে। অন্যদিকে এধরনের জঙ্গিবাদ যে কখনও কোন ধর্মীয় আদর্শের ধারক নয় একথাটি সর্বত্র নিরবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রচার করে সাধারণ মানুষকে সংহত করতে হবে। এ কাজে আমাদের সম্মানীত আলেম-ওলামা সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
বাংলাদেশে গুপ্ত হত্যার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে বিদেশি হস্তক্ষেপও বাড়তে থাকবে। বৈশ্বিক ক্ষমত্ াবলয়ের দাবার দাবা খেলার কোন ঘুটি যাতে আমাদের প্রিয় স্বদেশটি কখনও না হয় সেটিই লক্ষ রাখতে হবে সর্বাগ্রে। এজন্য দেশে রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার সবচাইতে বেশি।

