সাফল্যে খুশি সংগ্রামী নাসুমের পরিবার

বিশেষ প্রতিনিধি
জাতীয় দলের জার্সিতে দারুণ পারফরম্যান্স করলেও দেশের তারকা ক্রিকেটার নাসুম আহমেদ নিজ জেলা সুনামগঞ্জের ক্রিকেটে আজীবন নিষিদ্ধ রয়েছেন। ২০১৩ সালে সুনামগঞ্জ জেলার পক্ষে না খেলার অভিযোগে তাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে সুনামগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থা। বাঁহাতি এই স্পিনারের বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ক্রিকেটাররা।
ক্রিকেটার নাসুমের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের মধুরাপুর গ্রামে। বাবা আক্কাস আলী ও মা শিরিয়া বেগম প্রায় ৩০ বছর আগেই জীবিকার তাগিদে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে সিলেটে চলে যান। ওখানেই তাদের বসবাস।
নি¤œবিত্ত পরিবারের ক্রিকেট পাগল নাসুম ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করে আর স্কুলে যায় নি। পরে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ে কিছু পড়াশুনা করেছে সে। সারাদিনই ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত থাকতো নাসুম।
২০০৯ সাল থেকে সুনামগঞ্জে প্যারামাউন্ট ক্রিকেট ক্লাব এবং সিলেটে আরেকটি ক্লাবে খেলতো সে।
২০১৩ সালে সুনামগঞ্জ জেলা দল ও সিলেট বিভাগীয় দলের হয়ে ম্যাচ খেলার আমন্ত্রণ পায় নাসুম। এসময় সে সুনামগঞ্জের হয়ে না খেলে সিলেট বিভাগীয় দলের হয়ে ম্যাচ খেলে। ওইসময় তাকে আজীবন নিষিদ্ধ করে সুনামগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থা।
প্যারামাউন্ট ক্রিকেট ক্লাবের সভাপতি উজ্জ্বল বখ্ত বললেন, একইসঙ্গে দুই স্থান থেকে ম্যাচ খেলায় আমন্ত্রণ পাওয়ায় বড় পরিসরে খেলার সিদ্ধান্ত নেন নাসুম। এজন্য তাকে সুনামগঞ্জ জেলা ক্রিকেট ক্লাব আজীবন নিষিদ্ধ করার বিষয়টি অনেকটা ‘লঘু পাপে গুরুদ-’ দেবার মত সিদ্ধান্ত। একই সময়ে আরও চারজনকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি তার বিষয়টি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা জরুরি।
প্যারামাউন্ট ক্রিকেট ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বললেন, এ ধরণের অপরাধে অতিতে বিভিন্ন ক্লাবের খেলোয়ারের শাস্তি হয় নি, এমন উদাহরণও আছে। সর্বশেষ ২০১৯ সালে প্যারামাউন্টের হয়ে নাসুম সুনামগঞ্জে খেলতে আসলেও তাকে নামতে দেওয়া হয় নি। অবিলম্বে নাসুমের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সুনামগঞ্জে খেলার সুযোগ দিলে, তাঁর সংস্পর্শে এসে আরও তরুণ জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাবে।
ক্রীড়া সংগঠক মাহবুবুল হাছান শাহীন বললেন, বিখ্যাত এই তারকা ক্রিকেটার নিজের জেলায় নিষিদ্ধ, এটি আমাদের জন্য লজ্জার। ক্রীড়া সংস্থার মাধ্যমেই আইন তৈরি হয়, এই আইন পরিবর্তনযোগ্য। আমি মনে করি নাসুমের আবেদনের অপেক্ষা না করে, এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার ক্রিকেট বিভাগের সাধারণ সম্পাদক রেজুয়ানুল হক রাজা বললেন, নাসুমের সাফল্যে আমরা গর্বিত। জেলা পর্যায়ের লীগে অংশ নিলে জেলা দলে খেলতে বাধ্য থাকবে, এমন সিদ্ধান্ত অনেক আগে থেকেই আছে। নাসুম ২০১৩ সালে এই সিদ্ধান্ত মানেন নি। এজন্য তাকে শোকজ করা হয়েছিল। একই সময়ে আরও ৪ জনকে এভাবে শোক করা হয়, তাদের মধ্যে ৩ জন শোকজের জবাব দেওয়ায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান ইমদাদ রেজা চৌধুরী বলেন, সুনামগঞ্জের হয়ে না খেলায় জেলা ক্রিকেট বিভাগের সিদ্ধান্তে তাকে শোকজ করা হয়। তিনি শোকজের জবাব দেন নি। এজন্য তাকে নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৯ সালে সে সুনামগঞ্জে খেলতে এসেছিল, তখনো তাকে শোকজের জবাব দিয়ে আবেদন করতে বলা হয়েছিল। সেও আবেদন না করায় বিষয়টি এভাবেই আছে। আমরা তার সাফল্যে আনন্দিত। নাসুম চাইলেই সুনামগঞ্জে খেলারও সুযোগ পাবে।
সংগ্রামী পরিবারের ছেলে নাসুম
দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের মধুরাপুর গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের তিন ভাই আব্দুল কাইয়ুম, লুবন মিয়া ও আক্কাস আলী।
জীবিকার সন্ধানে প্রথম লুবন মিয়া সিলেটে যান। কয়েক বছর পর অন্য দুই ভাই আব্দুল কাইয়ুম ও আক্কাস আলীকে সিলেট নিয়ে যান লুবন মিয়া।
লুবন মিয়া সিলেট শহরের হাউজিংস্ট্যাট এলাকার সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশনের সুপার ভাইজার।
লুবন মিয়া বললেন, সংগ্রামী জীবন তাঁদের। জীবিকার তাগিদে অনেক কিছুই করেছেন তাঁরা। বড় ভাই আব্দুল কাইয়ুম বাক প্রতিবন্ধী। ছোট ভাই আক্কাস আলী (নাসুমের বাবা) একসময় রিক্সা চালাতেন, পরে কোস্টারের হেলপার এবং সিএনজিও কিছুদিন চালিয়েছেন। তার স্ত্রী (নাসুমের মা) শিরিয়া বেগম করোনার শুরু’র দিকে মারা গেছেন। ভাই আক্কাস আলী অসুস্থ্য, এখন ঘরেই থাকেন। সংসার চালায় ভাতিজা নাসুম। ছোট বেলা থেকেই ক্রিকেটে নেশা তার। ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে পড়েছে, এরপর প্রাইভেট পড়েছে এবং খেলা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তিনি বললেন, ‘সবই আল্লার ইচ্ছা, গরিবের ঘর আলোকিত হয়েছে, আমাদের মধুরাপুর গ্রামে থাকা আত্মীয়-স্বজন গ্রামবাসী খুশি।’
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ২৩ রানের জয় পায় বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হন নাসুম আহমেদ। চলতি বছরের মার্চে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন নাসুম আহমেদ।