সাময়িক দরিদ্র কৃষকদের পুনর্বাসনে বিশেষ উদ্যোগ নিন

এবারের অভূতপূর্ব সর্বগ্রাসী ফসল হানি গ্রামীণ জীবনের চিরাচরিত অনেক বৈশিষ্ট্যকে ভেঙ্গে দিয়েছে। গ্রামে এখন এমনিতেই সম্পন্ন কৃষকের সংখ্যা কম। বৃহৎ পরিমাণ জমির মালিকরা শহরবাসী অকৃষক। কৃষি জমির বাইরে এই বৃহৎ ভূমি মালিকদের রয়েছে নানা ব্যবসাপাতি ও আয়ের উৎস। ফসল হানির ফলে এই অকৃষক ভূমি মালিকরা কোন বিড়     ম্বনায় পড়বেন না। তারা বরং সস্তা দরে জমি কিনতে পারার জন্য এখন থেকেই নানা পরিকল্পনা করছেন। সমস্যায় পড়েছেন গ্রামেই থেকে যাওয়া মাঝারী ও ছোট কৃষকগণ। যারা এক/দেড় হাল বা কয়েক কেয়ার জমির মালিক তারা এবং যারা অন্যের জমি রংজমা/বর্গা চাষ করেন তাদের মাথায় হাত পড়েছে এই ফসল হানির কারণে। কৃষিজীবী এই শ্রেণিটির সামাজিক অবস্থান নি¤œমধ্যবিত্ত থেকে নি¤œবিত্ত পর্যায়ের হলেও মনস্তাত্বিকভাবে এরা মধ্যবিত্ত মন-মানসিকতা ধারণ করেন। ফলে এই শ্রেণিটি এখন না পারছেন সরকারি ত্রাণের খাতায় নিজের নাম লেখাতে না পারছেন লাইনে দাঁড়িয়ে ফেয়ারপ্রাইসের চাল-আটা কিনতে। দুর্যোগের প্রাথমিক পর্যায়ে এদের মান-সম্মান রক্ষার বিষয়টি ইতোমধ্যে সকলের নজর কেড়েছে। এই আত্মসম্মানবোধ তারা কতদিন বজায় রাখতে পারবেন সেটি দেখার বিষয়। তবে পেটের ক্ষুধা নাকি আর সবকিছুকে তুচ্ছ করে দেয়। এই মধ্যবিত্ত মানসিকতার কৃষকরা জমিজিরোত, গরু, গয়না বিক্রি করে মান রক্ষার আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে অবশেষে নিঃস্ব হবেন। দেশের ভূমি মালিকানা পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে কোন না কোন ধরনের অভাবতাড়িত হয়ে গ্রামের কৃষকরা জমিজমা বিক্রি করে থাকেন। এবারের ভয়ানক ফসলহানিজনিত অভাবের কারণে এই ধরনের সর্বস্ব খুইয়ে ফেলার প্রবণতা থেকে গ্রামের মধ্যবিত্ত মানসিকতার কৃষকদের রেহাই দিতে সরকারের বিশেষ ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।
এখন ফেয়ারপ্রাইস বা ওএমএস’র মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে যে চাল-আটা বিতরণ করা হচ্ছে তার বেশিরভাগ সুফল পাচ্ছেন একেবারে হতদরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ । স্বল্পমূল্যের চাল নিয়ে যে মনস্তাত্বিক সমস্যাটি সমাজে রয়েছে তা হলো এই চাল যারা কিনেন সমাজে তারা দরিদ্র বলে বিবেচিত। নি¤œমধ্যবিত্ত-স্বল্পবিত্তরা যাতে অনায়াসে এই ওএমএস’র দোকানে আসতে পারেন সেজন্য প্রথমে তাদের মনস্তাত্ত্বিক উপসম দিতে হবে। বুঝাতে হবে এটি নাগরিক নির্বিশেষে ক্ষতিগ্রস্ত সকল কৃষক পরিবারের প্রাপ্য। এজন্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয়ের বিকল্প কোন উৎস নেই তাদের তালিকা করে প্রতিটি পরিবারকে রেশনকার্ড ইস্যু করা যেতে পারে। রেশনকার্ডের বিপরীতে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি স্বল্পমূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত ওই শ্রেণির কৃষক পরিবারগুলো বেঁচে থাকার একটি উপায় খুঁজে পাবেন। এতে করে তাদের অবশিষ্ট সামান্য জমিজমা রক্ষা পাবে স্বল্পমূল্যে বিক্রির হাত থেকে।
দেশের কৃষি ব্যবস্থার কাঠামো টিকিয়ে রাখতে হলে কৃষক পরিবারগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে বৃহৎ ভূমি মালিক এবং অকৃষক-শ্রমজীবীরা আমাদের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা (উদ্যোক্তা কৃষক) থেকে দূরে থাকেন। কৃষকরা যদি কৃষিকাজ ছেড়ে গ্রাম ছেড়ে দেন তাহলে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা মহাবিপর্যয়ের সন্মুখিন হতে বাধ্য। সরকার হচ্ছে রাষ্ট্রের সকল শ্রেণি-পেশার অভিভাবক। তাকে সকল নাগরিকদের নিয়েই ভাবতে হয়। এখানে কৃষকদের সুরক্ষা করার বিষয়টি তাই রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্যরূপে বিবেচনা পাওয়ার জোর দাবি রাখে। কারণ হিসেবে একই কথার পুনরাবৃত্তি করতে হবে । কৃষি এবং কৃষকই এই দেশের ভিত্তি। কৃষি ছাড়া আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ফাঁপা বেলুনের মতো। ফুলানো দেখা গেলেও চুপসে যেতে সময় লাগবে না।