সিরাজগঞ্জ, পাবনা থেকেও এসেছে বেপারি

সাইদুর রহমান আসাদ
সুনামগঞ্জের ছোট বড় ১৫০ হাওরে এবার বোরো চাষাবাদ হয়েছে। ভারি বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে অসময়ে নির্মিত সুনামগঞ্জের কিছু বাঁধ ভেঙে এবং কোন কোন হাওরে পাড় উপচে পানি ঢুকে ১৯ টি হাওর ডুবেছে। ডুবে যাওয়া আধাপাকা ধানও ঘরে তুলতে প্রাণান্তকর চেষ্টা আছে কৃষকের। সুনামগঞ্জের কৃষকদের সঙ্গে কাজ করছেন অন্য জেলা থেকে আসা প্রায় ২১ হাজার কৃষি শ্রমিক। তারা প্রতিবছরে মতো এবারও কৃষকদের ধান গোলায় তুলে দিয়ে সহায়তা করছেন। তাতে তারাও আর্থিকভাব লাভবান হচ্ছেন।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, পুরো জেলায় ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এই ধান গোলায় তুলতে হাওরে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। জেলার শ্রমিকদের সঙ্গে অন্য জেলার প্রায় ২১ হাজার শ্রমিক ধান কাটতে কাজ করছেন। সোমবার (২৫ এপ্রিল) পর্যন্ত জেলায় ১৯ টি হাওর ডুবে ৫ হাজার ৭০০ হেক্টর জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ধান কাটা হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার হেক্টর জমির। যা মোট জমির ৮০ ভাগ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব শ্রমিক প্রতিবছর নির্দিষ্ট কৃষকের আওতাধীন এসে থাকেন। যাদের স্থানীয়ভাবে বেপারি বলে ডাকা হয়। নির্দিষ্ট কৃষকের ধান কাটা শেষ হলে অন্য কৃষকেরও ধান কেটে দেন বেপারিরা। তারা ধানের ভাগ ও টাকার বিনিময়ে ধান কাটেন। সাধারণত, বাড়ির নিচে বা হাওরের কিনারে খড়, বাঁশ ও বেত দিয়ে নির্মিত এক ধরণের দু’চালা ঘর নির্মাণ করে থাকেন তারা। রান্নাও করেন সেখানে।
সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালি থানার উমরপুর ইউনিয়নের দত্তকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মো. রবিউল ইসলাম। ৭ সদস্যের পরিবারে মা—বাবা সহ ৪ বোনের সংসার তার। প্রতি বছরের মতো এবারও বৈশাখ মাসে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে ধান কাটতে এসেছেন তিনি। তার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের নলুয়ার হাওর দেখা।
তিনি এ প্রতিবেদককে বললেন, প্রতি কেয়ারে ২ বস্তা দরে ধান কাটছি। ধান ছাড়াও নগদে ২ হাজার টাকা হিসাবে প্রতি কেয়ার জমির ধান কাটছি। এরকম ২০— ২৫ দিন ধান কাটলে ১৮ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়া যাবে। এছাড়াও এই কয়েকদিনে ধান কেটে যে টাকা পাওয়া যাবে, তা দিয়ে ধান কিনে বাড়ি নিয়ে যাবো।
শুধু রবিউল ইসলাম নয়, তার সঙ্গে একই দলে আরও ২০ বেপারি সিরাজগঞ্জ থেকে ধান কাটতে জগন্নাথপুরে এসেছেন। প্রতিবছরই ২১ জনের বেপারির দল এই উপজেলার নলুয়ার হাওরে ধান কাটতে আসেন তারা।
একই এলাকা থেকে আসা বেপারি বাবুল মিয়া বললেন, আনসার ফটিক গেরস্তের ধান কাটতেছি। কেয়ারে (৩০ শতাংশে ১ কেয়ার) ২ মণ, আবার কোথাও টাকা দিয়ে কেটে দিচ্ছি। ধান ভালো হয়েছে। তাই টাকার থেকে ধানের ভাগে কাটলে ভাল বলে জানালেন তিনি।
পাবনার বেড়া উপজেলার নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়নের খড়গা বাজার গ্রাম থেকে আসা বেপারি মো. দাউদ হোসেন বললেন, অনেকদিন হলো নলুয়ার হাওরে ধান কাটছি। আরও সপ্তাহখানেক ধান কেটে বাড়ি চলে যাবো।
জানালেন, তার দলে আরও ২২ জন রয়েছেন। ক’দিন পরে দুই থেকে আড়াইশ বস্তা ধান নিয়ে যেতে পারবেন তারা। এতে জনে ১৫ থেকে ২০ মণ ধান পাবেন।
জগন্নাথপুরের বুড়াখালী গ্রামের কৃষক মাহবুব মিয়া বললেন, বেপারিদের আমরা নিজেরা খাওয়াবো। পুরো মাস তারা আমাদের ধান কেটে দিবে। ধান কাটা শেষে বাড়ি যাওয়ার সময় আমরা ধান শুকিয়ে— উড়িয়ে কেয়ারে ২ বস্তা ( ২ মণ) করে দেবো। এরকম চুক্তিতে অন্য জেলা থেকে আমাদের হাওরে ধান কাটতে এসেছে তারা। বাড়ি থেকে যাওয়া আসার ভাড়াও দিবো আমরা।
জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরের কৃষক মো. ইলা মিয়া বললেন, আমি ১৫ কেয়ার (৫ একর) জমি করেছি। এই জমির ধান কাটতে বেপারিকে প্রায় ৩০ মণের উপর ধান দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এই বেপারিদের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। বহু দূর থেকে আমাদের ধান কেটে দিতে এসেছেন। মাস শেষে তাদের বাচ্চা কাচ্চার জন্য কিছু ধান নিতে পারবে। অন্য হাওর থেকে আমাদের হাওর অনেক ভালো রয়েছে। আমরা ভাগে ও টাকায় দুইভাবেই তাদেরকে পারিশ্রমিক দেই।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, সুনামগঞ্জ জেলায় সোমবার পর্যন্ত ১৯ টি হাওরে পানি ঢুকে ৫ হাজার ৭০০ হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমির ধান কাটতে প্রায় ৩ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেছেন। বাইরের জেলা থেকে ২১ হাজার শ্রমিক এসেছেন। সবার সহযোগিতায়ই সোমবার পর্যন্ত জেলার আশিভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে। কয়েকদিনের ভেতর হাওরে আবাদকৃত জমির পুরো ধান কাটা শেষ হবে বলে জানান তিনি।