সিসি ক্যামেরার কার্যকরিতা নিয়ে প্রশ্ন- সবকিছুই অস্পষ্ট রেকর্ড হচ্ছে

বিশেষ প্রতিনিধি
নিরাপত্তা ও নাশকতা রোধে শহরের বিভিন্ন স্পটে সম্প্রতি স্থাপিত সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কার্যকরিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পরও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সামনে চুরি-ছিনতাই ও অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে।
শহরে ঘটে যাওয়া একাধিক নাশকতা ও অপরাধমূলক ঘটনা সিসি ক্যামেরার সামনে ঘটলেও মূল অপরাধিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সিসি ক্যামেরায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়লেও ক্যামেরার দুর্বলতার কারণে অপরাধিরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকছে। সিসি ক্যামেরা আছে জেনে শুনেও অপরাধিরা অপরাধ করে যাচ্ছে। সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণে কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে কোন লোক বসা না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধি শনাক্ত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই।
জানা যায়, গত ২১ নভেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উত্তর দিকের গেইটের কাছ থেকে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন (এনজিও) কর্মকর্তার একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরার মাত্র কয়েক ফুট দূর থেকে ওই দিন মোটরসাইকেলটি চুরি হয়। মোটরসাইকেলটি চুরির পুরো বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিসি  
 ক্যামেরায় ধরা পড়ে। মোটরসাইকেল চুরি করার ঘটনায় পুরো ভিডিওটি জেলা প্রশাসক ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ফেইসবুক পেইজসহ অনেকের ফেইসবুক পেইজে আপলোড করা হলে বিষয়টি নিয়ে বেশ সাড়া পড়ে।
কিন্তু সিসি ক্যামেরায় চুরির ঘটনা রেকর্ড হলেও অস্পষ্ট হওয়ায় চোরকে কোনভাবে চেনা সম্ভব হয়নি। মোটরসাইকেল চুরির ঘটনাটি ভিডিওতে ধরা পড়া ও ফেইসবুকে প্রচারের ফলে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও এর কার্যকরিতা নিয়ে নানা মহল থেকে প্রশ্ন উঠতে থাকে। এছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার পর সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণসহ নিয়মিত তদারিক না করার ফলে অনেক সিসি ক্যামেরায় কোন কিছুই রেকর্ড হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বছর শহরের কাজির পয়েন্টের পাশে দক্ষিণে কুটুমবাড়ি রেস্তুরার সামনে খুনসহ পৃথক দু’টি অপরাধ সংগঠিত হলেও  কোন ঘটনাই কুটুম বাড়ির সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। যদিও কুটুমবাড়ি রেস্তুরায় লোক দেখানো সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা রয়েছে। দিন দুপুরে শহরের হাছননগরের যুবক বিশ্বজিৎ চৌহান খুনের ঘটনা কুটুম বাড়ির সিসি ক্যামেরার সামনে ঘটলেও বিশ্বজিৎ চৌহানের পরিবার ও পুলিশ প্রশাসন ওই দিনের ঘটনার কোন ভিডিও ক্লিপ পায় নি। রেস্তুরা কর্তৃপক্ষ তাদেরকে জানিয়েছিলেন ওই সিসি ক্যামেরা নষ্ট, কোন কাজ করেনি সেদিন।
গত গত ১০ অক্টোবর তারিখে শহরের পুরাতন বাসস্টেশনের প্রাইম ব্যাংকের সামনে থেকে পৌনে ৩ টায় সিসি ক্যামেরর আওতাধীন এলাকা থেকে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শেরেনুর আলীর ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলটি চুরি হয়। সাইকেল চুরির ঘটনাটি ব্যাংকের সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড হলেও ক্যামেরার সক্ষমতা অনেক কম হওয়ায় চোরকে চেনা সম্ভব হয়নি। এঘটনায় সদর থানায় একটি জিডি হলেও মোটর সাইকেল উদ্ধার হয়নি।
এর আগে গত বছর শহরের দু’টি ব্যাংকে গ্রাহকের কাছ থেকে কৌশলে টাকা চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে অপরাধি শনাক্ত করা যায়নি। চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড হলেও অপরাধ রোধে কাজে আসেনি ওই সব ক্যামেরা।
সরকারি কলেজের ছাত্র মো. রফিক বলেন,‘সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে আশপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি মনিটরিং করা। কোন অপরাধ সংঘটিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু শহরে বার বারই সিসি ক্যামেরার সামনে একাধিক চুরি ও অপরাধ হলেও ক্যামেরার মান ভাল না থাকায় অপরাধি ও চোরকে ভাল করে চেনা যায়নি। এছাড়া সিসি ক্যামেরার মনিটরে কেউ না থাকায় তাৎক্ষণিক অপরাধিকে আটক করা সম্ভব হচ্ছে না। ক্যামোর মান যে ধরনের হোক মনিটরের সামনে লোক থাকলে নিশ্চয়ই অপরাধিকে ধরা সম্ভব হতো বলে দাবি করেন তিনি।’
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শেরেনুর আলী বলেন,‘সিসি ক্যামেরা নিশ্চয়ই আরো আধুনিক ও মানসম্মত করা প্রয়োজন। তবে পুলিশকেও মোটরসাইকেল চুরি রোধে ও চোর ধরতে তৎপর হতে হবে। এখন পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদর থানা পুলিশ মোটরসাইকেল চোর ধরতে আন্তরিক নয়।’ শহরে চোর চক্রকে ধরতে ও আইনী ব্যবস্থা নিতে পুলিশের চরম গাফিলাতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সদর থানার ওসি হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন,‘সদর থানার পুলিশ চোরসহ সকল অপরাধিকে ধরতে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সব সময় আন্তরিক। এতে পুলিশ বিভাগের কোন গাফিলতি নেই।  তিনি আরো বলেন,‘ কোন অপরাধ ও অপরাধি শনাক্ত করতে সিসি ক্যামেরা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। ঘটনাস্থলে সিসি ক্যামেরা থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই সিসি ক্যামেরা থেকে মূল ঘটনা জানা যায়। তবে সিসি ক্যামেরার মান ভাল হতে হবে, না হলে লোক দেখানো সিসি ক্যামেরা দিয়ে কোন কাজ হবে না। ভাল মানের আধুনিক ক্যামেরা হলে অবশ্যই সিসি ক্যামেরা থেকে অনেক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া সম্ভব।’ সার্বক্ষণিক মনিটরিংএর বিষয়ে তিনি বলেন,‘ এই কাজের জন্য কোন পৃথক জনবল নেই। তাই সব প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কর্মকর্তারাই এসব কাজ মনিটরিং করে থাকেন। সার্বক্ষণিক জনবল নিয়োগের বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ে ভাবতে হবে।’
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আইসিটি শাখার সহকারি প্রোগ্রামার ও সিসি ক্যামেরা দেখভালকারী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন বলেন,‘ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মোট ৮টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন রয়েছে। সিসি ক্যামেরা থাকায় মোটর সাইকেল চুরির বিষয়টি ধরা পড়েছে। ক্যামেরার মান আরো বাড়ানো যায় কি না তা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে কথা বলে দেখা যাবে।’