সুদের টাকায় ঘর সংস্কার করছেন বানভাসিরা

স্টাফ রিপোর্টার
স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সুনামগঞ্জের ঘর-বাড়ি হারা অসহায় মানুষদের অনেকেই বাড়ি ফিরছেন। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফেরা অনেকে সরকারি বেসরকারি সহায়তা পেয়ে বসতঘর মেরামত করে বসবাস করছেন। কেউ কেউ সরকারি – বেসরকারি সহায়তা না পেয়ে মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার এনে ঘর নির্মাণ করে ফিরছেন আপন ঠিকানায়।
সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার ইকবালনগর এলাকায় লন্ডন প্রবাসী ফরহাদ আহমেদের নির্মাণাধীন সাত তলা ভবনে জীবন বাঁচাতে প্রায় শতাধিক বানভাসি পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে দু-চারটি পরিবার সরকারি সহায়তা হিসেবে নগদ অর্থ পেয়েছেন, কেউ কেউ বেসরকারি সহায়তা পেয়ে নিজ ঠিকানায় ফিরছেন। তবে ওয়েজখালি গ্রামের ঘর-বাড়ি ও সহায় সম্বল হারা আক্কাছ আলী, সজল দেবনাথ, হায়দার আলীরা কোনো সহায়তা না পেয়ে সুদে টাকা ধার এনে ঘর নির্মাণ করে বাড়ি ফিরেছেন।
পৌর শহরের নয় নম্বর ওয়ার্ডের ওয়েজখালি গ্রামের দিনমজুর আক্কাছ আলী জানান, বন্যায় ঘরের বেড়া, চালের টিন তছনছ হয়ে গেছে। গোলায় রাখা ধান, চাউল, আসবাবপত্র সবকিছু পানিতে ভেসে গেছে। চার ছেলে মেয়েসহ পাশের সাত তলা ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে প্রায় একমাস থাকেন। রান্না করা খিচুড়ি, শুকনো খাবারসহ ত্রাণ সহায়তা পেয়েছেন।
তিনি বললেন, এইভাবে কয়দিন থাকা যায়? ঘর মেরামতের জন্য কোন সহায়তা পাই নি। এজন্য সুদে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার নিয়ে নতুন করে ঘর নির্মাণ করেছি। সেখানেই এখন পরিবার নিয়ে আছি।
একই গ্রামের সজল দেবনাথ জানান, তিনি একজন মৎস্যজীবী। নিজের কোনো জায়গা জমি নাই। অন্যের ভিটায় দীর্ঘদিন ধরে একটি টিনসেড ঘর নির্মাণ করে বসবাস করতেন। আকষ্মিক বন্যায় তার ঘরটি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ঘরের ভিটেমাটি পর্যন্ত সরে গেছে। জীবন বাঁচাতে পরিবার পরিজন নিয়ে পাশের বিল্ডিংয়ে আশ্রয় নেন। সরকারি সহায়তা না পেয়ে মহাজনের কাছ থেকে সুদে ধার নিয়ে ভেঙে যাওয়া ঘর নির্মাণ করেছেন।
একইভাবে ওয়েজখালি গ্রামের হায়দার আলী জানান, তিনি দিনমজুরের কাজ করেন। দুটি সন্তান রয়েছে তার। ঘরে বৃদ্ধ মা বাবা রয়েছেন। পাঁচ বছর হয় তার বাবা মাহতাব উদ্দিন দুর্ঘটনায় পা হারান। তারপর থেকে তিনিও অচল। একমাত্র হায়দার আলীর আয় রোজগারে তাদের সংসার চলে। গেল বন্যায় তার বসতঘরের ভিটেমাটি, টিনসহ সবকিছু বানের তোড়ে ভেসে গেছে। পাশের সাত তলা ভবনে আশ্রয় নেন তিনি।
তিনি জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১০ হাজার টাকা কেউ কেউ পেয়েছেন। আমি পাই নি। ৬ হাজার টাকা সুদে এনে ভেঙে যাওয়া ঘরটির আংশিক মেরামত করেছি। সম্পূর্ণ মেরামত করতে আরও টাকা প্রয়োজন।
হায়দার আলী বললেন, মেয়র সাব দেখে গেলেন, সাংবাদিকরাও দেখে গেছেন, আশা করেছিলাম নগদ অর্থ পাবো। ঘর নির্মাণের জন্য এখনো কোন সহায়তা পাই নি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কুরবানগর ইউনিয়ন এলাকায় খাইমতিয়র গ্রামের আবিদ আলী বললেন, আমি একজন শ^াসকষ্টের রোগী। হাওরে মাছ ধরে পরিবার চালাই। বন্যায় বাড়িঘর তছনছ হয়ে গেছে। পাশের দু’তলা ভবনে আশ্রয় নিয়েছি। বন্যায় তছতছ হওয়া ঘর মেরামত করার জন্য মহাজনের কাছ থেকে বিশ হাজার টাকা সুদে এনেছি।
জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বললেন, প্রথম পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুদান জেলার পাঁচ হাজার পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৪শ’ বান্ডিল ঢেউটিন ও নগদ ৭২ লাখ টাকা গৃহহারাদের দেওয়া হবে। প্রতি পরিবার দুই বান্ডিল ঢেউটিন ও নগদ ছয় হাজার টাকা করে পাবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই অনুদান পাচ্ছেন।