অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার
(পূর্বপ্রকাশের পর)
তখন হাওর পাড়ের মানুষ ‘চাচা আপন পরাণ বাঁচা’ এই লৌকিক ধর্মের দীক্ষায় নির্দয় হয়ে নিজের হাওর বাঁচাতে রাতের আঁধারে অন্য হাওরের বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে নিজের হাওর রক্ষা করে।
এখনই যা করতে হবে—মূল সুরমার সুনামগঞ্জ সদর সংলগ্ন ‘পইন্দা’ নদীর মুখ থেকে ২০ কি:মি: খনন করে কালনী হয়ে কুশিয়ারার সংযোগস্থল পর্যন্ত ভরাট পলিটা সরিয়ে দিতে হবে। ’৭২ ইং সনে দোয়ারাবাজার সংলগ্ন ‘পা-ার খাল’ ভরাট করে ‘দেখার হাওর’ নিরাপদ করা হয়, কথা ছিল সাথে সাথে ‘পইন্দানদী’র মুখ খনন করে দেওয়া হবে, তা না করা হয় নাই। অন্য একটি রাস্তা ছিল এই ফুলে উঠা পানিটা চলে যাবার যা মধ্যনগরের কাছে ‘গোমাই’ নদী। তাও ভরাট হয়ে যাওয়ায় যে পানিটা ‘যাত্রাবাড়ি’র কাছে ‘কংশ’ হয়ে ‘ঠাকুরাকোণা’র দিকে চলে যেতে পারতো তা এখন আর হয় না। তাই জামালগঞ্জের পশ্চিম-উত্তরে এবং ধরমপাশা-মধ্যনগরের পূর্ব-্উত্তরের সবগুলি হাওরকে নিবাপদ করতে ‘গোমাই’ নদীর আবিদনগর থেকে যাত্রাবাড়ি পর্যন্ত খনন করে পূর্বের গভীরতায় ফিরিয়ে দিতে পারলে উল্লিখিত এলাকার হাওরগুলি সাময়িক নিরাপদ হবে।
বললে কেমন হবে জানি না, তবু বলতে যখন বসেছি বলতেই হবে—-। এখনই ভিতরে যে খনন হচ্ছে তা কিছু কিছু কাজ দেবে ঠিকই বাকি সবটুকুই হবে লোকদেখানো বা যাকে বলে আইওয়াস। পানি চলাচলের মুখ বন্ধ রেখে ভিতরে গভীর করলে পানির ধারন ক্ষমতা, পুকুরের গভীরতা বাড়বে ঠিক আছে। কিন্তু এই ভাবে ধারন ক্ষমতা বাড়িয়ে সম্পূর্ণ ‘উবধি পানি’টার ঠাঁই তো করা যাবে না। সুতরাং যে টুকু পানিই উত্তরের পাহাড়-নদী থেকে আসুক না কেন দক্ষিণ দিকে দ্রুত চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারলেই তো আর দুশ্চিন্তার কিছু থাকে না। আরও গভীরভাবে বললে এই উত্তর-পূর্ব-পশ্চিম এলাকা দিনে দিনে অর্থ্যাৎ পঞ্চাশ একশ’ বছর পরে এমনিতেই ভরাট হয়ে আসবে, আর যত ভরাট আর টান বা উঁচু হবে তত তাড়াতাড়ি পানি দক্ষিণ দিকে চলে যেতে সহজ হবে। তাহলে আমি উত্তরে খনন করে আমার অর্থটা কেন অপব্যয় করবো ? যত পারা যায় দক্ষিণ দিকে গভীর করাই তো শ্রেয় বলে মনে করি।
তাও যদি ‘সাবধানের মাইর নাই’ মনে করে ব্যয় এবং খনন করতেই হয়, তাহলে অন্যসব পরে করলেও হয়তো হবে তবে মনে রাখতে হবে মাটি দিয়ে ফাঁকির বাঁধ আর যাই দেন না কেন, ভাটির আগামী ২০১৮ সনের ফসলটি নিরাপদ করতে হলে গত জুন-২০১৭ সনেই ভৈরবের দক্ষিণে-উত্তরে খুব গুরুত্ব দিয়ে পানি বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে গভীরতা মেপে প্রবাহটা পটুয়াখালী-বরগুনা পর্যন্ত সচল করতে খনন শুরু করা দরকার ছিলো। তা যেহেতু হয় নাই বিকল্প কী করা যায় পরে ভাবা যাবে। এবারে ভিতরে খননের অত্যাবশ্যকীয় স্থানগুলি খুব সাবধানতার সাথে নির্ধরণ করতে হবে। আমি মনে করি সুনামগঞ্জের ভিতরে উল্লিখিত স্থানগুলি খুব গুরুত্বের সাথে খনন করতে হবেÑ(১) গোলকপুর থেকে গজারিয়ার বা সুমেশ্বরীর মুখ পর্যন্ত Ñ১০কি:মি:, (২) সুমেশ্বরীর মুখ থেকে পশ্চিমেÑ ১০ কি:মি:, (৩) জয়শ্রীর কাছেÑ৩/৪ কি:মি:, (৪) বৌলাই-সুরমার মুখ থেকে পাশুয়া বিলের সামনে পর্যন্ত ১০ কি:মি:, (৫) দুর্লভপুর থেকে নিয়ামতপুরের ঊত্তর পর্যন্ত ৮ কি:মি: (৬) সুমেশ্বরীতে আবিদনগর থেকে মধ্যনগর পর্যন্ত ৬/৭ কি:মি:, (৭) মধ্যনগর থেকে গোমাই নদীর বনগাঁও- যাত্রাবাড়িতে কংস নদীর মুখ পর্যন্ত ১২.৫ কি:মি:, (৮) সুনামগঞ্জের কাছে পুরান সুরমার বা পৈইন্দা নদীর মুখে ২০ কি:মি: (৯) ‘ভটেরখাল’র ভমভমি বাজারের কাছে মহাসিং নদীর সংযোগস্থল হালদা অংশে ৬ কি:মি: খনন করলে পরবর্তী অবস্থা পরে বুঝা যাবে, পরবর্তী করণীয় ঠিক করা যাবে।
অতি দু:খের সাথে বলতে হয় ২০১৭ সনের ফেব্রুয়ারি থেকে সুনামগঞ্জে ফসল বিপর্যয় দেখা দেওয়ার ছয় মাস পূর্বেই সুনামগঞ্জে ১৬৯ কি:মি: নদী খনন একনেকে অনুমোদিত হয়ে ইতোমধ্যে কাজও শুরু হয়ে গেছে। ফসল বিপর্যয় দেখা দেওয়ার সাথে সাথে সুনামগঞ্জের সচেতন মহল যখন ‘হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন’ নামে একটি ফোরামে মিলিত হন তারা জানতেই পারলেন না জেলার কোথায় কোন নদীতে কতটুকু কীভাবে খনন হবে। কোন বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে হয়েছে কিনা জানি না, তবে কোন আঞ্চলিত মতবিনিময় নিয়ে এ কাজগুলি অতীতে হয় নাই এবারে সুনামগঞ্জবাসী সোচ্চার হবার পরও ‘নদী খননে’ কোন মতামত দেওয়ার অধিকারী হলেন না। গত বছর ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’-এ সুনামগঞ্জে বৃহৎ নদী খনন প্রকল্পটির কথা প্রচার হবার পর পত্রিকার সম্পাদক আমাকে প্রশ্ন করেন নদী খননের পর মাটি ফেলার কোন পরিকল্পনা নেই, ঠিকাদার যেরকম মনে করে সেভাবে মাটি ফেলবে। আপনি কী মনে করেন ? উত্তরে আমি বলেছিলামÑÑএ নদী খননে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই বেশি হবে, এমন নদী খনন জেলাবাসীর কাম্য ছিলো না। ধরমপাশায় ‘কংশ নদ’ খননের খবর নিয়ে দেখুন মানুষের কী দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সুতরাং অপরিকল্পিত নদী খনন সুনামগঞ্জের উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি হবে, যা কাম্য নয়। তারিখ : ২৭/১২/২০১৭ খ্রি : (সংক্ষেপিত)
সমাপ্ত


