সব ভাল তার শেষ ভাল যার। কিন্তু সুনামগঞ্জের ইউপি নির্বাচনের শেষটা ভাল হলো না। ৫ম ধাপ পর্যন্ত জেলার ৭ উপজেলার নির্বাচনে তেমন কোন সহিংসতা ঘটেনি, ভোটে জাল-জালিয়াতির তেমন কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ বিরাজিত ছিল সর্বত্র। সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ দেখে সকলেই স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন। নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ব্যক্তিবর্গ ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একারণে সকলের প্রশংসাধন্য হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ ধাপে শনিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ধর্মপাশায় এক কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যুসহ বেশ কয়েক ব্যক্তির আহত হওয়ার ঘটনার সাথে বিভিন্ন জায়গায় কেন্দ্রে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালানো হয়েছে যা পূর্বেকার নির্বাচনী পরিবেশের চাইতে ভিন্নতর। ধর্মপাশার পাইকুরাটি ইউনিয়নের বেখইজোড়া গ্রামে নির্বাচনের পর সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন কোহিনুর চৌধুরী নামের ওই কিশোর। নিহত কোহিনুরের পিতা শামসুল হক চৌধুরী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দিতা করে জয়ী হন। তার বিজয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিপক্ষ একই পদে পরাজিত প্রার্থী তৌফিক মিয়ার সমর্থকরা বিজয়ী শামসুল হকের বাড়িতে হামলা চালায়। ওই হামলায় নির্মমভাবে নিহত হয় তাঁরই কিশোরপুত্র। বিজয়ের আনন্দে উদ্বেল একটি পরিবার মুহূর্তেই বিষাদের অন্ধকারে তলিয়ে গেল। বিজয়ের এমন নির্মমতা বোধ করি শামসুল হক চৌধুরী স্বপ্নেও কল্পনা করেননি। ওই হামলায় আরও অন্তত ১০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানা যায়। এদিকে নির্বাচন চলাকালে সুখাইর রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের জারারকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে ২০ মিনিট ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিল। জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের ফেনারবাঁক ও নোয়াগাঁও কেন্দ্রেও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। ওখানে কিছু সময়ের জন্য এক চেয়ারম্যান প্রার্থীকে আটক করতে বাধ্য হয় পুলিশ। ভীমখালি ইউনিয়নের একটি কেন্দ্রে তিন জাপা কর্মীকে আটক করে পুলিশ। নির্বাচনের পর তাহিরপুরের বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়নে ব্যালটবাক্স ছিনতাইর চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওখানে পুলিশ একজন চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ তিন জনকে আটক করেছে। শেষ ধাপের এই সহিংসতা জেলার নির্বাচন পরিস্থিতির গায়ে অনেকটা কলঙ্ক আরোপ করেছে।
শনিবার পর্যন্ত সারা দেশে নির্বাচনী সহিংসতায় ১০৮ ব্যক্তির প্রাণ গেছে। আহত হয়েছেন ৫ হাজারের বেশি। কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ফলাফল পরিবর্তন, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, নির্বাচনের পর ভোট না দেওয়ার অভিযোগে প্রতিপক্ষকে দলন-পীড়ন বহুল মাত্রায় ঘটতে দেখেছি আমরা। এমন সহিংস নির্বাচন পরিস্থিতির মাঝেও সুনামগঞ্জের শান্তিপূর্ণ অবস্থা আমাদেরকে বেশ কিছুটা পুলকিত করেছিল। বিভিন্ন ইউনিয়নে ভোট কারচুপি নিয়ে যেখানে বিরোধী দল ও অন্যান্য পক্ষগুলো সোচ্চার তখনও সুনামগঞ্জে কেউ এমন অভিযোগ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারেনি। খোদ বিএনপির তরফ থেকেও এমন অভিযোগ আনা হয়নি। বরং দেশের অন্য জেলার তুলনায় এখানে বিএনপি প্রার্থীদের বিজয় হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। সর্বত্র ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেও মানুষ কেন্দ্রে গিয়েছেন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। এরকম একটি আদর্শ নির্বাচনী পরিবেশের শেষ পর্যায়ে অনাকাক্সিক্ষত যে কয়েকটি ঘটনা ঘটল সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলাটাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। তবে এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো না ঘটার জন্য সকল পক্ষকে আরও সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত ছিল।
১১ উপজেলার সকল ইউনিয়ন পরিষদের (আইনগত কারণে জগন্নাথপুরের মীরপুর ব্যতিত) নির্বাচন শেষ হয়েছে। নবনির্বাচিত পরিষদের অনেকেই ইতোমধ্যে শপথগ্রহণ করেছেন। বাকিরা শীঘ্রই করবেন। আমরা সকলের সফলতা কামনা করি।

