সুনামগঞ্জের ভেসে ওঠা অংশে দুর্গন্ধে টিকা দায়

বিশেষ প্রতিনিধি
ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে ভেসে ওঠা সুনামগঞ্জ শহরের অলিগলি। দুর্গেন্ধে টিকে থাকতে কষ্ট হচ্ছে এসব এলাকায়। স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন হাজারো মানুষ। যেসব এলাকা ভাসেনি সেখানেও নাক বন্ধ করে বুক থেকে গলা সমান পানি পার হচ্ছেন বাসিন্দারা। এমন মহাদুর্গতিতে টিকে থাকা দায় বলছেন শহরের বাসিন্দারা।
শুক্রবার সকালে সুনামগঞ্জ শহরের পূর্ব-পশ্চিম নতুনপাড়া, বাঁধনপাড়া ও শহীদ আবুল হোসেন রোড ঘুরে দেখা গেছে, ভেসে ওঠা ঘরবাড়ি পরিস্কারের জন্য ফিরেছেন বাসিন্দারা। ঘরের ও সাত দিনের ঢলের পানিতে ভেসে আসা ময়লার দুর্গন্ধে সড়কে ঘরে টিকে থাকা দায়। বিছানাপত্র, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য তৈজসপত্র ও আসবাবপত্র পচেও দুর্গন্ধ বেরিয়েছে। শহরবাসী বললেন, আপাতত সবকিছুই সড়কে ফেলা ছাড়া কোন উপায় নেই। কোনভাবে ঘরে ফেরার চেষ্টা করছেন তারা। এই অবস্থায় পুরো শহরই যেন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এ যেন আরেক মহাকষ্ট নাগরিকদের।
পাড়ায় পাড়ায় এখনো পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা কাজ শুরু করতে দেখা যায় নি। সড়কগুলো দিয়ে চলাচল করা কষ্টদায়ক হয়ে ওঠেছে। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্র আলফাত স্কয়ার (ট্রাফিক পয়েন্ট), ফল মার্কেট, জগন্নাথবাড়ি রোড, মাছবাজার, সবজি বাজার, পশ্চিম বাজার, মধ্যবাজার, পুরাতন বাসস্টেশনসহ প্রধান প্রধান সড়কগুলোতেও ময়লার স্তুপ। পৌর সভার নয়টি ওয়ার্ডের যে অংশই ভেসেছে, সেখানেই ময়লা-আবর্জনা লেগে আছে।
নতুনপাড়ার বাসিন্দা কাজল দে বললেন, গলা সমান পানি ছিল ঘরে। অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে গন্ধ বেরিয়েছে। আবার ভাসা পানিতে আসা ময়লা আবর্জনা ঘরে, আঙ্গিনায় ও সড়কে আটকা পড়েছে। যা এখন পচে দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে। নাকে দুটো মাস্ক পড়লেও গন্ধ লাগছে।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী কালী কৃষ্ণ পাল বললেন, পৌর এলাকায় ২২ কিলোমিটার সড়ক এবং ১২ হাজার বাড়িঘরেই ময়লা আবর্জনা লেগে আছে। যেগুলো ভেসেছে, সেগুলো থেকে দুর্গন্ধ বেরিয়েছে বেশি। কিছু এলাকায় পানি নেমে যাবার পর বাড়িঘর পরিষ্কারের ময়লাও কিছুক্ষণ পর পর সড়কে ফেলছেন বাসিন্দারা। একদিকে পরিষ্কার করে আসলে, আরেকদিকে ময়লা ফেলছেন বাসিন্দারা।
পৌর মেয়র নাদের বখ্ত বললেন, তিন থেকে আট ফুট ডুবে থাকা সুনামগঞ্জ শহর ভেসে ওঠছে। পরিচ্ছন্নতার কাজও শুরু হয়েছে। এক এলাকা বার বার পরিচ্ছন্ন করতে হচ্ছে। ত্রাণ কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে পৌরসভা। পরিচ্ছন্নতা কর্মীও বাড়ানো হয়েছে। শহর পরিচ্ছন্ন করার জন্য নাগরিকদের কাছে ১৫ দিন সময় চাইলেন তিনি।
নতুন করে আবার সংসার শুরু করতে হবে
সুনামগঞ্জ শহরের উঁচু এলাকার ঘরে ফেরা মানুষের মুখেও হাসি নেই। সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র, ব্যক্তি মালিকানাধীন দু’তলা, তিন তলা ভবন, আবাসিক হোটেল থেকে শুক্রবার সকালে অনেকে বাড়ি ফিরেছেন। বৃষ্টি না হওয়ায় এবং রোদের দেখা মেলায় বাড়ি ফিরে আরেক কষ্টের দেখা মিলেছে তাদের। ঘরের আসবাবপত্র, বিছানাপত্র, ফ্রিজ, টিভি, আইপিএস সব কিছুই গিলেছে প্রলংকরী বন্যা।
নতুনপাড়ার বাসিন্দা বাণী তালুকদার বললেন, আমার বাড়ি মহল্লার একতলা বাড়িগুলোর অনেকের চাইতে উঁচু, তবুও ঘরে নাক সমান পানি ওঠেছে। বের হবার সময় মালামাল সরানোর চিন্তা বাদ দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছি। দরজায় তালা দেওয়াই ছিল কষ্ট, কোনভাবে বেরিয়ে গেছি। ৩১ বছর হয় ঘরের বউ হয়ে এসেছি, এই সময়ের গুছানো সংসার তছনছ হয়ে গেছে। আসবাবপত্র, প্রিজ, টেবিলফ্যান সব কিছুই নষ্ট হয়েছে। বেশিরভাগই ফেলে দিতে হবে। নতুন করে আবার সংসার শুরু করতে হবে। এই মহল্লার মুকুল রঞ্জন রায় বললেন, বাড়ির বিছানাপত্র সকালে এসেই ফেলে দিয়েছি, এগুলো আর কাজে লাগবে না। ঘরে থাকা আরও অনেক কিছুই ফেলে দিতে হবে। কমপক্ষে দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
নীল দত্ত বললেন, ঘর ভাসলেও এখনই ফেরা যাবে না, বিছানাপত্র ফেলে দিয়েছি, ফ্রিজ নষ্ট, উপরের ফ্যান, ঘরের ইলেকট্রিক লাইন সবই বিকল, ধরলে সট করছে, দুর্ঘটনারও ভয় আছে, এসব মেরামত করার লোকই এখন পাওয়া যাবে না।
সাংস্কৃতিক সংগঠক নিতাই পাল বললেন, বিছানাপত্র, দুটি প্রিজ, আইপিএস, শোকেসসহ কয়েক লাখ টাকার মালামাল দ্রুত অনেক কষ্ট করে পাঁচ ফুট উচ্চতায় তুলেছি। এরপরও যখন পানি লাগা শুরু হয়েছে, সকলকে নিয়ে সাঁতার কেটে মহল্লার আরেক দু’তলায় ওঠে জীবন বাঁচিয়েছি, বাড়ির ছয় কক্ষের ৯০ ভাগ আসবাবপত্র, বিছানাপত্র ফেলে দিতে হবে।
মহল্লার শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফাড়িয়া একাডেমির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বললেন, আগুনে পুড়ার মতো অবস্থা হয়েছে, কারো কিছু রেখে যায় নি। ঘরের খাবার-দাবার দলিলপত্র, মূল্যবান কাগজ, আসবাবপত্র সবই গেছে।
শহরের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর গোলাম সাবেরীন সাবু বললেন, শুক্রবার থেকে ছয় দিন নৌকা নিয়ে প্রায় ২০ ঘণ্টা আমার ওয়ার্ডের মহল্লায় মহল্লায় ঘুরেছি, কারো কারো বুক সমান, কারো দরজার উপরের চৌখাট, কারো ছালে পানি লেগেছে। একতলা বাড়ির সকলেই আসবাবপত্র বাঁচানোর চিন্তা ছেড়ে জীবন বাঁচানোর লড়াই করেছেন। শুক্রবার বাড়ি ফিরে মনকষ্টের মধ্যে পড়েছেন সকলে।
প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে গেল বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়। শুক্রবার ভোর তিনটায় কিছুক্ষণের মধ্যেই ডুবে যায় জেলার ৮০ ভাগেরও বেশি এলাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলা। এই তিন উপজেলার বেশিরভাগেরই ছাল ছুঁয়েছে ঢলের পানি। অন্যান্য উপজেলার মানুষও পানিবন্দি হয়ে পড়েন। তালা দেওয়া অনেক দুতলা গুরুত্বপূর্ণ অফিস ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবনের তালা ভেঙে জীবন বাঁচিয়েছেন লাখো মানুষ। ভয়াবহ বন্যার তা-বে ঘরে থাকা ধান-চাল, জমিতে থাকা সবজী, পুকুরের মাছ সবই ভেসে গেছে। এখনো লাখো মানুষ পানিবন্দি, ঘরে খাবার নেই, বাইরে কাজ নেই, সিংহভাগ দোকানপাঠও এখনো খুলতে পারেন নি দোকানীরা।