সুনামগঞ্জে সাংবাদিক নির্যাতন : বিচার প্রত্যাশায় সতীর্থরা

আফতাব চৌধুরী
সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী নদী যাদুকাটার তীর কেটে বালু উত্তোলনের ছবি তুলতে গিয়ে হামলার শিকার হন তাহিরপুর প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ও দৈনিক সংবাদ এর তাহিরপুর উপজেলা প্রতিনিধি কামাল হোসেন। কামাল হোসেন উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের কামড়াবন্ধ গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। সাংবাদিক কামাল হোসেনকে দুষ্কৃতকারীরা শক্ত দড়ি দিয়ে গাছের সাথে বেঁধে নির্মমভাবে মারপিট করে। একটি ভিডিও ক্লিপ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সর্বত্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। এদিকে এ নির্মম, নিষ্ঠুর, নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জ জেলা শহরসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ, মিছিল, মানবন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। নির্যাতনকারী দুষ্টচক্রের হোতাদের গ্রেপ্তার করে অবিলম্বে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরদার হচ্ছে।
জানা গেছে, প্রতিদিনের ন্যায় গত ১লা ফেব্রুয়ারী সোমবার যাদুকাটা নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছিলো একটি বালুখেকো চক্র। খবর পেয়ে সাংবাদিক কামাল হোসেন ছবি তুলতে গেলে ঘাগটিয়া গ্রামের রইস মিয়া, দ্বীন ইসলাম ও মাহমুদুলের নেতৃত্বে বালুখেকো চক্রটি তার উপর অতর্কিত হামলা করে মারাত্মক আহত করে। পরে কামালকে নদীর পাড় থেকে টেনে হিঁচড়ে ঘাগটিয়া বাজারে এনে গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে নির্যাতন করতে থাকে। খবর পেয়ে বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে কামালকে উদ্ধার করে। এদিকে কামালের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন। জানা যায় এ নির্মম নির্যাতনে অংশগ্রহণকারী চার জনকে পুলিশ ইতিমধ্যে গেপ্তার করেছে। তারা নাকি কামাল হোসেনকে মারধর করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল।
মৃত্যু অবধারিত, চিরন্তন সত্য একটি বিষয়। এ থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না। অতীতে কেউ পায়নি ভবিষ্যতেও পাবে না। এটা বাস্তব এবং চিরসত্য। মৃত্যু স্বাভাবিক হলে কথা নেই কিন্তু অকারণে অস্বাভাবিক হলে আত্মীয়-স্বজন ও পরিজনদের পীড়া দেয়। কামাল হোসেন তার দায়িত্ব পালন করতে নদীর তীরে গিয়েছিল।
সাংবাদিক মানেই কলম সৈনিক। তারা বছরের পর বছর মার খাচ্ছেন, ভবিষ্যতেও খাবেন। তাই যতদিন এ সমাজটিতে হিং¯্র মানুষদের বিরুদ্ধে সর্বমহলে বিবেক জাগ্রত না হবে ততদিন কলম সৈনিকরা মার খাবেনই। কামাল হোসেনকে নির্যাতন করা হয়েছে। আমরা সতীর্থরা দুঃখ পেয়েছি, আঘাত পেয়েছি, মর্মাহত হয়েছি। বিবেক কিন্তু এখনো জাগেনি। এর আগেও সিলেটসহ সারা দেশে সাংবাদিকরা মার খেয়েছেন, খুন হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই এসবের বিচার হয়নি। বারে বারে কলম সৈনিকদের লাঞ্ছিত করা হচ্ছে, খুন করা হচ্ছে, মামলাও হচ্ছে। দেশের এ কলম সৈনিকরা যদি অন্ধকার জগতের মানুষদের সাথে নৈতিকতা বর্জন করে আপোষ করে চলতো তাহলে এসব আক্রমণের শিকার তাদের হতে হতো না। কলম সৈনিকদের মনের দৃঢ়তা এখনো আছে বলে নীতি ও নৈতিকতার চর্চা হচ্ছে। মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে দেশের সকল কলমসৈনিকরা নীরবে ও সরবে যুদ্ধ করে যাচ্ছে অন্যায়, অবিচার ও অপশক্তির বিরুদ্ধে। এ কলমসৈনিকরা এখনো দেশ, জাতি ও সমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য প্রাণপনে কলম পিষে যাচ্ছেন। এদের অবস্থান সমাজে সুসংহত করার দায়িত্ব এ এ দেশের মানুষেরই। দেশের সকল সমাজশক্তি যদি এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন না করে তাহলে সময়ের পাগলা হাওয়ার চক্রে পড়ে আমরা সকলেই নিঃশেষ হয়ে যাবো।
সাংবাদিক কামাল হোসেন মার খেয়েছেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। সে জন্য দুঃখ-বেদনা থাকলেও অবাক হবার কিছুই নেই। কারণ অতীতে সাংবাদিকরা মার খেয়েছে, বর্তমানে খাচ্ছে, ভবিষ্যতেও খাবে। সাংবাদিক কলমসৈনিকরা যুগে যুগে কলমের সাথে আপোষ করবে না। বর্তমানে করছেনা, অতীতে করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। আর সেজন্য নির্যাতন তাদের উপর আসবেই। দেখেছি যখনই সাংবাদিক এবং কলমসৈনিকরা মার খেয়েছে, নির্যাতনের শিকার হয়েছে তখনই পথে নেমেছে শুধু সাংবাদিক সমাজ। মিছিলে, সভায়, অনশনে, প্রতিবাদে শুধু সাংবাদিকদের আহাজারী। কিন্তু কেন ? সাংবাদিকের কলম চলছে অন্যায়, অবিচার, অনিয়ম এর বিরুদ্ধে। তারা তাদের পুরো জীবনীশক্তি দেশের সকল শ্রমশক্তির পক্ষে ব্যয় করছেন। কলম চালিয়েছেন সমাজশক্তি সমূহের কল্যাণে। সাংবাদিক ও কলমসৈনিকদের কলমবহতা নদীর মতো চলেছে আপামর জনগণের জন্য। তারা কখনো এককভাবে সাংবাদিক সমাজের সুখ-দুঃখের কথা লিখেনি। যেখানে সাংবাদিক সমাজ তাদের নিজেদের দুঃখের কথা না লিখে অন্য পেশার জন্য লিখে সমাজকে জাগ্রত করছেন সে জাগ্রত মানুষগুলো কি সাংবাদিকদের বিপদে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন? রাজনৈতিক দলগুলো পত্রিকার পাতায় দু’কলম বক্তব্য দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেছেন। প্রশাসন বলেন-ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশ বলে, অপরাধী যেই হোক তাকে ধরে বিচারের জন্য সোপর্দ করা হবে। এটাত স্বাভাবিক নিয়ম ও প্রচলিত ভাষা। এ নগরের প্রতিটি সমাজশক্তির অংশের কি কোন দায়বোধ ছিলো না বা নেই? এ পর্যন্ত যতজন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হলেন অথবা মৃত্যুকে বুকে ধারণ করলেন তারা কি নিজের স্বার্থের জন্য কলম চালিয়েছিলেন? প্রতিটি নির্যাতন এবং হত্যার কারণ ছিলো সমাজের মঙ্গল ভাবনা। সাংবাদিকরা সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অনৈতিক বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন সমাজ প্রগতির জন্য। আর সে জন্য হিং¯্র অপশক্তি তাদের শেষ করে দিতে সচেষ্ট। সাংবাদিক শামসুর রহমান, ফারুক ইকবালসহ অসংখ্য সাংবাদিককে হত্যার মধ্য দিয়ে ঘাতক দল প্রমাণ করেছে তারা কলমসৈনিকদের আদর্শের কথাগুলোকে হিং¯্রতা দিয়ে দমন করতে চায়। কিন্তু হিং¯্র মানুষরূপী পশুরা জানে না কলম সৈনিকদের নিঃশেষ করা যাবে না। কারণ একজন কলম সৈনিকের রক্ত থেকে বেরিয়ে আসবে হাজারো তেজী কলম সৈনিক। এদের হত্যা বা নির্যাতন করে অতীতে যেমন কোন অপশক্তি দমাতে পারেনি, বর্তমানে পারছে না এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। বরং দেশের সকল সমাজশক্তি যদি চেষ্টা করে তাহলে অপশক্তিদের নিঃশেষ করা সম্ভব।
সাংবাদিকদের শুধু একটি পেশার মানুষ হিসাবে ভাবলে ভুুল হবে। বরং তাদের ভাবতে হবে জাতির বিবেক হিসাবে। অন্য পেশার মানুষরা যা বলতে পারেন না সাংবাদিকরা তাই মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রকাশ করেন সমাজের কল্যাণে। তারা প্রতিটি পেশা ও শ্রমের মানুষের কথা বলেন চিত্তের শক্তি দিয়ে। ভাবতে দুঃখ লাগে কামাল হোসেন এর জন্য। যে মেধা সাংবাদিকরা দেশের কাজে ব্যয় করছে দেশ তাদের জন্য করছে কি? শুধু একটি মিছিল, দু’চার ছবক বক্তৃতা এবং পত্রিকায় কিছু বিবৃতি। শ্রেফ এগুলো অতীতেও আমরা অনেক দেখেছি। অন্ততঃ দেশে যারা সাংবাদিকদের নির্যাতন করেছে তাদের কোন শাস্তি হয়নি, বরং সাংবাদিকরা তাদের সুন্দর হাসি দিয়ে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাই অনেকে বলেন সাংবাদিকদের জন্ম হয়েছে মার খাওয়ার জন্য। কারণ নেপথ্যের মানুষেরা বেশী মায়াবী হয়ে উঠছেন বলে মনে হয়। এখন কথা হলো সমাজের অবক্ষয়, অন্যায় দুর্নীতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে লেখা যাবে না। কারণ এসব যারা করছেন তারা সমাজের মাথা। তারা যা করে আমাকে আপনাকে চোখ বুঝে সইতে হবে, বলতে হবে আমি দেখিনি ! বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এসব অন্যায়কারীরা সব ম্যানেজ করে ফেলে প্রভাব, অস্ত্র এবং অর্থ দিয়ে। অতীতের ঘটনাবলীর সাথে বর্তমানকে মিলালে ফলাফল তাই বেরিয়ে আসে। বিভিন্ন সময় সংবাদ প্রকাশের কারণে বিভিন্ন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া হয়-এটাতো মামুলি ব্যাপার। এসব হরহামেশাই ঘটছে। তথাকথিত শিক্ষিত ক্রিমিনালরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিভাগের মতো পবিত্র বিভাগের মাথায় বসে আছে বলেই শিক্ষার বিকাশ স্তব্ধ হয়ে আছে। তারা যখন শিক্ষার জন্য কথা বলে তখনই মনে হয় ভূতের মুখে রাম নাম। কথায় বলে যাদের মাঝে থ্রি ডব্লিউ ( 3W ) এর প্রভাব আছে তারা অন্ততঃ শিক্ষা প্রশাসনে থাকা অন্যায়। ন্যায় অন্যায়ের কথা বলা এখানে বাতুলতা। এখন তিনি ভালো প্রশাসক যিনি নিজে ঘুষ খাবেন, ঘুষ দিবেন, যিনি বসদের তেল দিয়ে রাতকে দিন এবং দিনকে রাত বলবেন, তার সাত খুন মাফ। এখন তারাই ভাল প্রশাসনের যারা রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রীদের কথামত চলবেন সব কিছুতেই হ্যাঁ বলবেন, অন্যায় হলেও মেনে নিবেন, সাহস করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবেন না, প্রতিবাদ করবেন না। তারাই ভাল তাদের পদোন্নতি হবে-ভাল পোস্টিং পাবেন। এটা হলো সাম্প্রতিক হাল। নিজে অন্যায় করে অন্যকে অন্যায় না করতে বলা-এটা হলো তাদের আদর্শ। এসবের ব্যাপারে সাংবাদিক আপোষ করতে পারেন না বলেই তারা এখন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দেশের বা সমাজের জন্য কাজ করতে পারছেন না, তাদের ভিন্নভাবে দেখা হয়, দেখা হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো সাংবাদিকরা কি এভাবে মার খেতেই থাকবেন ? এ প্রশ্নের জবাব দিবে কে ? যখন সাংবাদিক মার খান তখন সাংবাদিক সমাজ মাঠে নামেন এবং তারপর ভুলে যান সব। কিন্তু এভাবে চলবে কি ? স্থায়ী প্রতিকার চাই। এর জন্য প্রয়োজন সাংবাদিকদের মন থেকে অপশক্তির প্রতি মায়া মমতা কমাতে হবে। ক্ষমা করে দেয়ার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রতিনিয়ত ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতার কারণে অপশক্তি প্রশ্রয় পেয়ে যাচ্ছে। তাদের ধারণা সাংবাদিকদের আঘাত করার পর দু’চারদিন হৈ চৈ হবে, তারপর তারা একটি আপোষ রফায় এসে মাফ করে দিবে। এটি হতে দেয়া আর ঠিক নয়। কারণ দুষ্টের দমন করতে হবে আইনের আওতায়। এ কথাটি মনে রেখে কলম সৈনিকদের পথ চলতে হবে। ভবিষ্যতে যেন আর কাউকে কলম পেশার জন্য অপশক্তির হিং¯্রতার শিকার হতে না হয় সে পথ সৃষ্টি করতে হবে। সন্ত্রাসী অপশক্তি যেমন করে অস্ত্র নিয়ে তেড়ে আসে কলম সৈনিকদের অস্ত্র হলো কলম। তাই কলমের শক্তির তেজ নিয়ে বিবেককে আরো দৃঢ় করে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দেশের সকল সমাজশক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। একের বিপদে অন্যের সহযোগিতা। জাতির বিবেক সাংবাদিক সমাজ তথা কলমসৈনিকরা যেন আর কখনো অপশক্তির দ্বারা লাঞ্ছনার শিকার না হন সে বিষয়টি দেখার বিষয় সকলের। আর তা দেখতে হবে এখনই আর বিলম্ব না করেই।
সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ০৩.০২.২০২১