সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়/ প্রকৃত অর্থেই হাওরাঞ্চলকে প্রতিনিধিত্ব করুক

সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারে বলে একটি সুখবর পাওয়া গেছে। গত ২৯ মার্চ বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ৪৮তম সভায় এই সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত ও জায়গা চিহ্নিত করার কাজ শেষ হলেও এখনও কোনো স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি। এ প্রেক্ষিতে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ইতোমধ্যে সমাপ্ত অথবা নির্মাণাধীন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট বা অন্য কোনো সরকারি স্থাপনায় অস্থায়ী ক্যাম্পাস করে শিক্ষা কার্য়ক্রম শুরুর চিন্তা করা হয়েছে। সারা দেশে সুষমভাবে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের সরকারি কর্মসূচির অংশ হিসাবে সুনামগঞ্জে এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার মধ্য দিয়ে একটি নতুন যুগের সূচনা ঘটাবে। হাওরবাসী হিসাবে এটি সকল মানুষের জন্য সুখ ও আনন্দের। আমরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।
সরকার ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটে ৪ জনকে মনোনয়ন প্রদান করেছেন। ১৫ সদস্যের সিন্ডিকেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপউপাচার্য, ট্রেজারার ও রেজিস্ট্রার ছাড়া বাকি ১১ জন বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মনোনীত হয়ে থাকেন। যে ৪ ব্যক্তি ইতোমধ্যে সিন্ডিকেট সদস্য হিসাবে মনোনীত হয়েছেন তাঁদের ছাড়া অবশিষ্ট ৭ জনও সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে মনোনীত হবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। ২০২০ সনের ২৩ নং আইন যা সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২০ নামে অভিহিত, অনুসারে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালিত হবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের অন্যান্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রায় একই ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুরুতে আমরা ধারণা করেছিলাম, যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়টি হাওরাঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে সেহেতু এই বিশ্ববিদ্যালয়কে হাওরের অনন্য প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ, পেশা, উৎপাদন ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও জীবনবোধ নিয়ে বিশেষায়িতভাবে তৈরি করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সেরকম কিছু আমরা দেখতে পাইনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্ট এলাকার সংস্কৃতি ও বৈশিষ্টকে শিক্ষা কার্যক্রমের ভিতরে আনার ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মানেই হলো নতুন জ্ঞান তৈরির জায়গা। এ লক্ষ্য পূরণে নতুন চালু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি কতটা সফল হবে তা কেবলমাত্র ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। তবে আমরা শুধু এটুকু বলতে চাই, বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলে রয়েছে এক অফুরন্ত সম্ভাবনার সুযোগ। আমরা বিশ্বাস করি, হাওরের উৎপাদনশীলতা ও সম্ভাবনার অধিকাংশই এখনও আমরা নিজেদের আয়ত্বে আনতে পারিনি, পারিনি এর সদ্ব্যবহারের উপযুক্ত প্রযুক্তি-কৌশল উদ্ভাবন করতে। নবলব্ধ বিশ্ববিদ্যালয়টি এই জায়গায় বিশেষ করেÑ ফসল ও মিঠা পানির মাছের উৎপাদন বাড়ানোসহ বর্ষায় কোল ও কিনারহীন প্রমত্তা হাওরের পানির অর্থপূর্ণ ব্যবহার বিষয়ে নতুন নতুন আলো জ্বালিয়ে সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলোকে সকলের জন্য উন্মোচিত করুক এই আমাদের কামনা। হাওরাঞ্চলের সংস্কৃতি আজ বৈশ্বিক আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শত শত বছর ধরে প্রবহমান এই সংস্কৃতি এই অঞ্চলের সবিশেষ ভাব-সম্পদ। একে ধারণ করাও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তব্য বটে। বিশ্ববিদ্যালয় নিছক ডিগ্রি বিতরণের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ধারণাকেই ধারণ করতে দেখা যায় না। এর পরিবর্তে কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি বিতরণ করাকেই মূল কর্তব্য জ্ঞান করা হয়। নতুন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এই জায়গায় দৃষ্টান্ত স্থাপনাকারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে আমরা খুশি হব।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ, নির্মাণ ও ক্রয় নিয়ে যেসব অভিযোগ শোনা যায়, আমরা মনেপ্রাণে চাইব এই বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন তা থেকে মুক্ত থাকে। হাওরের মনোরম পটভূমিতে তৈরি হতে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রকৃত অর্থেই হাওরাঞ্চলকে প্রতিনিধিত্ব করুক এবং এই এলাকার জ্ঞান বিস্তারে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখুক, শুরুর শুভক্ষণে আমাদের এই শুভকামনা।