সুনামগঞ্জ মুক্ত দিবস আজ- আসুন, ঐতিহাসিক ভূমিকায় আমরা সকলে নিবেদিত হই

আজ সুনামগঞ্জ মুক্ত দিবস। উনিশ শ’ একাত্তরের সালের এ দিন অবরুদ্ধ পাক হানাদার বাহিনি সুনামগঞ্জের অবস্থান ছেড়ে পশ্চাদপসরণ করে আর অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা বীরদর্পে প্রবেশ করেন স্বাধীন সুনামগঞ্জের পূন্য মাটিতে। এই ঐতিহাসিক দিনটিতে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অমর শহীদানদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। যেসব অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধের ময়দান থেকে আহত অথবা সুস্থ অবস্থায় স্বাধীন স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। আজকের এই দিনটি আমাদের পিছনে ফিরে তাকানোর দিন।  আত্মানুসন্ধান ও আত্মোপলব্ধির দিন। যেসব মহান উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন পণ করে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন সেইসব আদর্শ বাস্তবায়নের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়নের দিনও এটি। নিছক আবেগতাড়িত হওয়ার দিন নয় এটি। আবেগের সাথে নিজেদের ঐতিহাসিক কর্তব্য স্থির করার দিন আজ। আজকের এই দিনে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অনেক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সম্মিলন ঘটবে এসব অনুষ্ঠানমালায়। এখানে নতুন প্রজন্মের তরুণ ও যুবক-যুবতীদের আগমন ঘটবে যারা মুক্তিযুদ্ধ স্বচক্ষে দেখেন নি। এইসব নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের পাঠ দেয়ার পবিত্র কর্তব্য পালনের মাধ্যমে আমাদেরকে ইতিহাস সচেতন জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। নতুবা শিকড়ের পরিচয়হীন নাগরিকরা কখনও পূর্বপুরুষদের বীরত্বব্যঞ্জক প্রতিশ্রুতসমূহের ধারক হতে পারবে না।
এই জনপদে জাতীয় মুক্তি অর্জনের লক্ষে যে যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল ১৯৭১ সনে, সেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, এমন কথা বলা যাবে না। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের যেভাবে পরিচালিত ও এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তা নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে চলেছে। ইতিহাসকে পিছনে ঠেলে দেয়ার সচেতন প্রয়াসের দীর্ঘকালও দেখেছি আমরা। এখন অবশ্য স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনার কঠিন লড়াই চলমান আছে। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে বৈষম্যহীন ব্যবস্থা কায়েমের স্বপ্ন ছিল, সেটি এখনও রয়ে গেছে সুদূর পরাহত। আজ দেশের নাগরিকদের মধ্যে সম্পদ বৈষম্য প্রকট। এই বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। দুর্নীতি যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। যে যেভাবে পারে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে সেই ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির কাজে লাগানোর এক অন্ধ প্রতিযোগিতা চলছে এই দেশে। প্রতাপ, ক্ষমতা, প্রভাব আর বিত্তের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে মানুষের সার্বজনিন অধিকার। এই যে আদর্শের চাইতে বহু দূর পিছিয়ে আসা, সেইটি উপলব্ধি করার দিন হলো এইসব ঐতিহাসিক দিবসগুলো। শুধু উপলব্ধি নয় কর্তব্য নির্ধারণেরও দিন, কীভাবে আমরা আবারও আদর্শের পথে ফিরে যেতে পারি তার। সুতরাং ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ মুক্ত দিবসের স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি আমাদেরকে দৃষ্টি মেলে ধরতে হবে সামনের পানে। যে ভবিষ্যৎকাল অতিক্রম করবে আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। আমরা যদি ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য সুন্দর একটি সমাজ ব্যবস্থা রেখে যেতে না পারি তাহলে সকলেই এর দায় চাপাবে তার পূর্বপুরুষের প্রতি। এমন দায় মাথায় নিয়েই কি আমরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিব ? দেশের জন্য যারা লড়াই করেছেন, যারা নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন জাতির মুক্তির সংগ্রামে, তাঁদেরকে আজ পথ দেখাতে হবে নতুনদের। আসুন আজকের এই পবিত্র দিনে সেই ঐতিহাসিক ভূমিকায় আমরা সকলে নিবেদিত হই।