বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (সরকারি এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়) ক্রমশই সুনাম হারাচ্ছে। এসএসসিতে বহুদিনের প্রথা ছিল এই বিদ্যালয় জেলায় সেরা হওয়ার। কিন্তু এ বছর সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারে নি বিদ্যালয়টি। এবার এই বিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম নিয়েও অসন্তুষ্ট অভিভাবকরা। নানা উসিলায় অতিরিক্ত টাকা আদায়ে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অনিয়মিত উপস্থিতি ও অবহেলার কারণে বিদ্যালয়ের ফলাফল নিম্মমুখী বলেও মন্তব্য করেছেন একাধিক অভিভাবক। বিদ্যালয়ের প্রধান প্রধান শিক্ষক হাফিজ মো. মাশহুদ চৌধুরী অবশ্য বলেছেন, এক দুই বছর ফলাফল খারাপ হলেই সুনাম হারায় না। অন্যান্য অভিযোগও মিথ্যা দাবি করেছেন তিনি।
১৯৪০ সালে স্থাপিত সুনামগঞ্জ সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সুনামগঞ্জের সবচেয়ে প্রাচীন নারী শিক্ষা বিদ্যাপীঠ। এই বিদ্যাপীঠ ফলাফলের দিক থেকে সবসময়ই জেলায় ভালো করে আসছিল। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের পড়াশুনার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। গত ২৮ নভেম্বর প্রকাশ হওয়া এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে এই বিদ্যালয়ের ২৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২২৭ জন পাস করেছে। অকৃতকার্য হয়েছে ১৩ জন।
বিদ্যালয়ের অভিভাবকরা জানিয়েছেন, সুনামধন্য এই বিদ্যাপীঠে এখন আর স্বাভাবিক পাঠদানে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ক্লাস চলাকালীন সময়েই অতিরিক্ত ক্লাস চলে। ওই ক্লাসেই (কোচিং) মনোযোগী বেশি প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট কয়েক শিক্ষক। অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য নেওয়া ফি আদায়ের কোন প্রাপ্তি রশিদও দেওয়া হয় না শিক্ষার্থীদের।
গেল সপ্তাহ্ থেকে শহরের সব কয়টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনলাইনে ছাত্র ভর্তির আবেদন শুরু হয়েছে। অথচ. সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন ফরম বিক্রয়ে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটার অভিযোগ ওঠেছে। ওই স্কুলে অফলাইনে বিক্রয় হচ্ছে ফরম। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিপত্রে (স্মারক নং-৩৭.০২.০০০০.১০৭.৩১.৩৩৩.২০২১,অংশ-১, ২৯৬৮) লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আবেদন ফরমের মূল্য কোনভাবেই ১১০/= (একশত দশ টাকা) টাকার উপরে গ্রহণ করা যাবে না উল্লেখ থাকলেও এই বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আগ্রহীদের কমপক্ষে চার ফরমে ৪৪০/= (চারশ চল্লিশ) টাকা রাখা হচ্ছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের গেল ২১ নভেম্বরের ভর্তি সংক্রান্ত জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে বিদ্যালয় হতে কোন ভর্তি ফরম বিতরণ করা হবে না। ভর্তির আবেদন কেবল অনলাইনে https://gsa.teletalk.com.bdঠিকানায় পাওয়া যাবে। অনলাইনে আবেদন করা যাবে ১৬ নভেম্বর থেকে ছয় ডিসেম্বর পর্যন্ত। ভর্তির আবেদন ফি ১১০ (একশত দশ) টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা শুধুমাত্র টেলিটক প্রি-পেইড মোবাইল হতে sms এর’ মাাধ্যমে প্রদান করা যাবে। এই পরিপত্রে অবশ্য উল্লেখ রয়েছে, অনিবার্য কারণে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল লটারি প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হতে পারেন নি এমন প্রতিষ্ঠান শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত (ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী) স্থানীয় ভর্তি কমিটির মাধ্যমে লটারি প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী নির্বাচন করবেন। তবে শিক্ষার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আবেদন ফরমের মূল্য কোনভাবেই ১০০/= (একশ দশ) টাকার উপরে গ্রহণ করা যাবে না।
সরকারী সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের মহল্লা হাসননগরের বাসিন্দা রাজেশ দাস ও নরেন ভট্টাচার্য বললেন, শহরের ছোটখাটো স্কুলেও অনলাইনে ভর্তির আবেদন হয়েছে। অথচ শহরের বড় স্কুলে হচ্ছে অফলাইনে আবেদনের নিয়ম কার্যকর। অনলাইনে আবেদনের ব্যবস্থা না করাও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা। অনলাইনে আবেদনের সুযোগ থাকলে যাদের সামর্থ কম তাদের আর্থিক কষ্ট পেতে হতো না। ১১০ টাকায় সকল ক্যাটাগরিতে আবেদন করতে পারতো তারা। একজন শিক্ষার্থী একইসঙ্গে সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীর মেয়ে আবার মুক্তিযোদ্ধার মেয়েও হতে পারে। তাকে ছয়টি ফরম কিনতে হচ্ছে। সাধারণ কোঠায় দুই শিফটে দুটি, সরকারি চাকুরিজীবী কোঠায় দুটি এবং মুক্তিযোদ্ধা কোঠায় দুটি। তাতে টাকা দিতে হচ্ছে ৬৬০ (ছয়শ ষাট) টাকা। আমরা মনে করছি, অফলাইনে ভর্তি ফরম বিক্রয় হচ্ছে ব্যবসায়ীক বা অসৎ উদ্দেশ্যে।
শহরের বড়পাড়ার অভিভাবক সোহানুর রহমান সোহান বললেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি ফরম আনতে গিয়ে তাকে ৪৪০ (চারশ চল্লিশ) টাকা দিতে হয়েছে। অথচ টাকার কোন রশিদ দেওয়া হয় নি।
এর আগেও গত এপ্রিল মাসে এই বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে সেশন ফি’র ১৭০০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছিল। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে এই অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পর কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের ১৭০০ টাকা করে ফেরৎ দিয়েছিলেন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিভাবক প্রেমানন্দ বিশ^াস বললেন, স্কুল চলাকালীন সময়ে এই বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ক্লাসের নামে কোচিং চলে। কোচিংয়ে পাঠদান চলে ঠিকঠাকভাবে। সাধারণ ক্লাসে পাঠদান হয় না। অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এক হাজার এবং নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এক হাজার দুইশ টাকা করে নেওয়া হয়। কিন্তু রশিদ দেওয়া হয় না।
শিক্ষানুরাগী শহরের পুরাতন বাসস্টেশনের বাসিন্দা অ্যাড. মাহবুবুল হাসান শাহীন বললেন, জেলার নামকরা এই বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক সপ্তাহ্ েএকদিনও বিদ্যালয়ে আসেন না। এই প্রতিষ্ঠান কিভাবে ভালো থাকবে। প্রধান শিক্ষক সব সময় স্টেশনে থাকার কথা। তিনি থাকেন না। তার সরকারি কোয়ার্টারে অন্যরা থাকে। তিনি আসেন কালেভদ্রে। এভাবে বিদ্যালয় ভালো থাকবে কীভাবে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, গেল তিন বছর হয় ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ের ফলাফল খারাপ হচ্ছে। ২০২০ ইংরেজিতে ২৪১ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ২২২ জন উত্তীর্ণ হয়। অকৃতকার্য হয় ১৯ জন। ২০২১ ইংরেজিতেও পাঁচ জন অকৃতকার্য হয়েছিল। অথচ. বিদ্যালয়ের রেকর্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এমন অনাকাঙ্খিত ফলাফল আগে কখনো হয় নি।
সরকারি এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফিজ মো. মাশহুদ চৌধুরী ফলাফল খারাপের বিষয়ে বললেন, ফলাফল খুব খারাপ হয়েছে বলা যাবে না। দুই বছর সামান্য খারাপ হয়েছে, যা উল্লেখ করার মতো নয়। এবার ফলাফল খারাপের মূল কারণ হচ্ছে বন্যা। বন্যার কারণে অনেকে পড়াশোনা করতে পারে নি। ক্লাস থেকে কোচিংয়ে গুরুত্ব বেশি দেওয়ার অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, অভিভাবকদের এসব অভিযোগের কোন যুক্তি নেই, আমরা ক্লাস রেখে কোচিং করাই না। ক্লাস সময়ের বাহিরে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া হয়। ভর্তি ফরমে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, অফলাইন আর অনলাইনের মধ্যে পার্থক্য আছে। অনলাইনে একবারই ফরম ফিলআপ করা যায়, তাই সেখানে একবারেই সব বিষয়ে আবেদনও করা যায়। কিন্তু অফলাইনে এক ফরমে একটি বিষয়েই আবেদন করা যায়। তাই যারা একাধিক বিষয়ে আবেদন করতে আগ্রহী তারা একাধিক ফরম নিচ্ছেন। ১১০ টাকার বেশি নেবার যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি ফরম শুধু একটি বিষয়ে আবেদন করার জন্য নির্ধারিত। এখন যদি ১১০ টাকা দিয়ে একাধিক ফরম দেই, তাহলে বাকি ফরমের টাকা কোথা থেকে আসবে? কর্তৃপক্ষকে প্রত্যেকটি ফরমের টাকার হিসাব দিতে হবে আমাকে। আমরা মাওশির দিক নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছি। স্কুলে না আসা এবং স্টেশনলিভ করার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, হেড মাস্টারের থাকার জন্য একটি কোয়ার্টার আছে। জেলা প্রশাসনের সভায় উপস্থাপন করা হয় যে এটি থাকার অনুপযোগী। পরে যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে এই কোয়ার্টারকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। তাই সেখানে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।


