মধ্যনগরের সুমেশ্বরী ও গোমাই নদী ভরাট হয়ে নৌচলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানি আটকে রাখতে পারছে না নদী, এই পানি ভাসিয়ে নিয়ে যায় হাওর ভরা বোরো ফসল। নদীতে পানির হাহাকার। জমিতে সেচ দেয়ার মত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ভাটির দেশে পানির রাস্তা হারিয়ে যাওয়ায় ব্যবসা ও জীবন-জীবিকায় তৈরি হয়েছে সংকট। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সুমেশ্বরী ও গুমাই নদীর হতশ্রী অবস্থা নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। কিন্তু এর প্রতিকার কী? প্রতিকারের সর্বজনস্বীকৃত যে পথ ও পদ্ধতি রয়েছে সেটি সকলের জানা। তা হল- ব্যাপকভাবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে নদী খনন করা। নদীর তলদেশ ভরাট হওয়া থেকে রক্ষা করা। কিন্তু কোথায় সেই প্রচেষ্টা? স্থানে স্থানে সাগর পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে নদী খননের খবর শুনি আমরা। কিন্তু এতে উপকার দেখতে পাওয়া যায় না। কারণ যথানিয়মে নদী খনন করা হয় না। নদী খননের নামে টাকার আদ্যশ্রাদ্ধ ঘটে। কিন্তু শুকনো নদী আর সুজলা হয়ে উঠে না। নদী খনন করা হয় খালের মত করে। নদী থেকে খননকৃত মাটি আবার নদীতেই ফেলে দেয়া হয়। এরকম হাস্যকর ঘটনা শুনেও আমরা অভ্যস্ত। এরকম অবস্থায় হাওরসমৃদ্ধ মধ্যনগর উপজেলার রক্তনালী সুমেশ^রী ও গোমাই নদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সকলেই আতংকিত।
গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বাংলাদেশের জীবন ও জীবিকা নদীকেন্দ্রীক। নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে জনপদ, ব্যবসাকেন্দ্র। নদীই আমাদের মাটিকে করেছে উর্বর। নদীর পানি আমাদের জমিকে সুফলা করে তুলেছে। প্রকৃতির এই অফুরন্ত উপহারের প্রতি আমরা সযতœ থাকতে পারিনি। আমাদের উদাসীনতা, অবহেলা, ব্যভিচার, অদূরদর্শিতা বহু নদীকে হত্যা করে ফেলেছে। বড় বড় নদীর বুকে জেগে উঠেছে ধু ধু চর। যে নদী একসময় প্রমত্তা ছিল সেই নদীর বুকে এখন নির্দ্বিধায় গাড়ি চলে। নদীর এমন অপমৃত্যু বা সংগীন অবস্থা আমাদের চিরাচরিত উৎপাদন, সংস্কৃতি, জীবন ও পরিবেশকে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। জলবায়ুর যে পরিবর্তনের কথা আমরা সম্প্রতি বেশ উচ্চকণ্ঠে বলে থাকি, তার পিছনেও রয়েছে নদী হননের অবশ্যম্ভাবী ভূমিকা। সুজলা বাংলাদেশ এখন কবে ঊষর মরুময় অঞ্চলে পরিণত হবে তাই দেখার জন্য বোধ করি আমরা অপেক্ষমাণ রয়েছি।
সুমেশ^রী পাড়ের মধ্যনগর এতদঞ্চলের ধান ব্যবসার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল নদীভিত্তিক নৌযোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার কারণে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এখন সেই যোগাযোগ ভেঙে পড়েছে। যার অনিবার্য প্রতিক্রিয়া পড়েছে ধান ব্যবসায়। মধ্যনগরের ধানের আড়ৎদাররা বলেছেন, এই বাজার থেকে বছরে ৩৫ লাখ মণ ধান জেলার বাইরে পাঠানো হয়। নৌযোগাযোগ সংকটের কারণে এখন এই ব্যবসা ঝুঁকির মধ্যে। এ হলো ক্ষতির একটি দিক। প্রধান দিকটি হলোÑ কৃষিজ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। বোরো মৌসুমে এখন প্রচুর সেচের প্রয়োজন পড়ে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এই জায়গায় সংকট তৈরি হয়েছে। নদী বন্যা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। এখন তা করতে অপারগ হওয়ায় বন্যার পানি-বেগ আঁছরে পড়ে ফসলি জমিতে। পানির অভাবে মরুময়তা তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নদী খননের উপর সকলেই গুরুত্ব দিয়েছেন। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীও বলেছেন জেলার ১৪ টি নদী খননের প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা। মূলত নদীর পরিকল্পিত খননই এর একমাত্র সমাধান। নদীকে নদীর মতই রাখতে হবে। বাঁধ দিয়ে নদীর চলার পথকে রুদ্ধ করার নাম আত্মহনন। খনন করতে হবে সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে। খননের নামে লুটপাট বন্ধ করতে চাই শক্তিশালী উদ্যোগ। খনন কাজে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করতে হবে। এখন বিভিন্ন জায়গায় যে নদী খনন কার্যক্রম চলমান রয়েছে সেখানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও জনসাধারণের কোন অংশগ্রহণ না থাকায় কাজের মান যাচ্ছেতাই হচ্ছে বলে অভিযোগ বিস্তর। মূলত নদী রক্ষার নামে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে চাই দেশপ্রেমের জাগরণ।

