সুরঞ্জিতের দিরাই-শাল্লায় ভবিষ্যত কাণ্ডারি কে?

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের নির্বাচনী এলাকা দিরাই—শাল্লা অপেক্ষাকৃত রাজনীতি সচেতন এলাকা হিসাবেই পরিচিত। এই নির্বাচনী এলাকার আওয়ামী রাজনীতি এখন অনেকটা শৃঙ্খলাহীন। দলের কাণ্ডারি সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ড. জয়া সেন গুপ্তা সেখানকার দলের হাল ধরার চেষ্টা করলেও গেল প্রায় দেড় বছর হয় অসুস্থ্য সংসদ সদস্য জয়া সেন। নির্বাচনী এলাকায় এই সময়ে আসতে পারেন নি তিনি। তার একমাত্র ছেলে সৌমেন সেন গুপ্তও দেশের বাইরে। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি এবং উন্নয়ন কাজও অনেকটা অভিভাবক শূন্য এই নির্বাচনী এলাকায়। আগামী জাতীয় নির্বাচনে সুরঞ্জিতের এই আসনটি কে ধরে রাখবে, এই নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে দিরাই—শাল্লায়।
ষাটের দশকের উত্তাল রাজনীতি থেকে ওঠে আসা বামপন্থি নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। দীর্ঘ ৫৯ বছর তিনি রাজনীতি করেছেন দাপটের সঙ্গে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ৫ নং সেক্টরের অধীন টেকেরঘাট সাব সেক্টরে প্রথম সাবসেক্টর কমান্ডার এবং পরে সংগঠক, ১৯৭২ সালে সাংবিধানিক সংসদ সদস্য, দিরাই—শাল্লা থেকে পরপর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৪৫ সালের ৫ মে দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৭০—এর নির্বাচনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ন্যাপ থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ন্যাপের ভাঙনের পর গণতন্ত্রী পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতা—পরবর্তী সময়ে মোট সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৮৬ ও ১৯৯১— এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে জয়ী হন। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সুরঞ্জিত প্রথমে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পরে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন। পঞ্চম সংসদের সদস্য থাকাকালেই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে প্রথমে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পরে দলটির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য হন। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে সুরঞ্জিত সেন ভোটে হেরে গেলেও পরে হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জ—বানিয়াচঙ আসনে উপ—নির্বাচন করে তিনি বিজয়ী হন। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা নিযুক্ত হন তিনি।
২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সুরঞ্জিতকে আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর রেলমন্ত্রী করা হয় তাঁকে। ব্যক্তিগত সহকারীর দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় রেখে দেন। পরে তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সুরঞ্জিতকে নির্দোষ ঘোষণা করে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তিনি পুনরায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য।
২০১৭ সালের চার ফেব্রুয়ারি বর্ণাঢ্য এই রাজনীতিকের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পর উপ—নির্বাচনে জয়ী হয়ে দিরাই—শাল্লায় সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের শূন্যতা কাটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন স্ত্রী ড. জয়া সেন গুপ্তা।
উপ—নির্বাচনে জয়ী হয়ে বছর খানেক সক্রিয়তার সঙ্গেই দিরাই—শাল্লায় জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন ড. জয়া সেন গুপ্তা। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে তাঁকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়, তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ীও হন। নির্বাচনের কিছুদিন পর থেকেই তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। ক্রমেই নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমতে থাকে তাঁর। ২০২১ সালের ১৭ মার্চ শাল্লার হিন্দুপল্লী নোয়াগাঁওয়ে মামুনুল হক সমর্থকদের সাম্প্রদায়িক হামলার পর র‌্যাব প্রধান, আওয়ামী লীগ—বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ সুশীল সমাজের বিশিষ্টজনেরা নোয়াগাঁওয়ে আসলেও এখনো পর্যন্ত স্বশরীরে আসতে পারেননি ড. জয়া সেন গুপ্তা। তবে তাঁর ছেলে সৌমেন সেন গুপ্ত গ্রামের মানুষকে সমবেদনা জানাতে গিয়েছিলেন। গেল দেড় বছরের মধ্যে সৌমেন সেন একবারই দিরাই—শাল্লায় যান। সৌমেন বর্তমানে স্ত্রী—সন্তানসহ আমেরিকায় আছেন।
দেশের রাজনীতিতে জাতীয় নির্বাচনের আলাপচারিতা শুরু হওয়ায় অপেক্ষাকৃত রাজনীতি সচেতন দিরাই—শাল্লায় গত কয়েকদিন ধরে আলোচনা শুরু হয়েছে সুরঞ্জিতের দিরাই—শাল্লার এবার কাণ্ডারি কে?
দিরাই পৌরসভার মেয়র বিশ^জিত রায় বললেন, দিরাই—শাল্লায় এখনো প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের ইমেজকেই কাজে লাগানো হয়। গেল পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রয়াত নেতার কর্মীরাই জয়ী হয়েছে। সুরঞ্জিতের পরিবার থেকে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী না হলে, এই আসনে অসংখ্য প্রার্থী মনোনয়ন চাইবেন, দলে বিভক্তি বা বিভাজন বেড়ে যাবে। জয়া সেন গুপ্তাকে আবারও সংসদে দেখতে চান দলীয় কর্মীরা। জয়া সেন গুপ্তা শারীরিক অসুস্থ্যতার জন্য একান্তই নির্বাচন করতে না পারলে, তার ছেলেকেই আওয়ামী পরিবারের অভিভাবক হিসাবে দেখতে চান দলের কর্মী ভোটার ও শুভানুধ্যায়ীগণ। জয়া সেন গুপ্তা দেড় বছর হয় এলাকায় আসছেন না জানিয়ে তিনি বললেন, ভাচুর্য়ালি কয়েকবার এলাকাবাসীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তিনি। সৌমেন সেন এর এলাকায় যোগাযোগ আছে কি—না, জানতে চাইলে বিশ^জিত বললেন, তিনি (সৌমেন) একবার এসেছেন, তবে নির্বাচনে অংশ নেবার বিষয়ে তার আগ্রহ কম। জয়া সেন গুপ্তা ও সৌমেন সেন দুজনেই নির্বাচনে না আসলে বিকল্প প্রার্থীর কথা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডকেই ভাবতে হবে মন্তব্য করেন পৌর মেয়র বিশ^জিত রায়।
দিরাই পৌরসভার সাবেক মেয়র মোশাররফ মিয়া অবশ্য বিশ^জিতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বললেন, প্রায় দেড়বছর ধরে রাজনৈতিক কর্মসূচীতে না থাকায়, এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা এবং সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের ছেলে সৌমেনও আমেরিকায় থাকায় দলের কিছু নেতারা জয়া সেনকে ভুল তথ্য দিচ্ছেন। এ কারণে দলীয় গ্রুপিং বাড়ছে। সুরঞ্জিত পরিবারের জনপ্রিয়তা কমে গেছে। সুরঞ্জিত পরিবারে প্রার্থী না থাকলে ওখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কারা হতে পারেন, জানতে চাইলে মোশাররফ মিয়া বললেন, দিরাইয়ের ভাটিপাড়ায় শেখ পরিবারের (শেখ সেলিম সাহেবের) আত্মীয়রা আছেন, শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী এবং সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অবনী মোহন দাসও তৃণমূলে কাজ করছেন।
দিরাইয়ের বাসিন্দা জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক অ্যাড. আজাদুল ইসলাম রতন বললেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যারা দলের প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ করে প্রার্থী হয়েছিল। তাদেরকে দলীয় পদবী বা আগামী জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হলে তৃণমূলের কর্মীরা কষ্ট পাবে। দলের প্রার্থী যেই হোক তারপক্ষে সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকলে এই আসনে আওয়ামী লীগেরই থাকবে।
শাল্লা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াররম্যান বিশ^জিত চৌধুরী নান্টু বললেন, জয়া সেন শারীরিক অসুস্থতার জন্য নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান, শাল্লার সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অবনী মোহন দাস, সাংবাদিক দীপক চৌধুরী, দিরাই পৌরসভার সাবেক মেয়র আজিজুর রহমান বুলবুল, ব্যারিস্টার অনুকুল তালুকদার ডাল্টন, দিরাইয়ের আওয়ামী লীগ নেতা আলতাব উদ্দিনও মনোনয়ন চাইবেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমানও বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বললেন, দীর্ঘদিন এলাকায় এমপি না থাকায় দিরাই—শাল্লায় দল এবং সরকারের উন্নয়ন কাজে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে গেছে। নিজে সুস্থ্য থাকলে আগামী নির্বাচনে সুনামগঞ্জ—২ (দিরাই—শাল্লা) এবং সুনামগঞ্জ—৪ (সদর—বিশ^ম্ভরপুর) আসনে মনোনয়ন চাওয়ার কথা জানিয়ে বললেন, আমাকে যে কোন এক আসনে মনোনয়ন দিলেই জয়ী হব। অসুস্থতা থাকলে মনোনয়ন চাইবেন না বলেও জানান তিনি।
ড. জয়া সেন গুপ্তা এসব বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, আমি অসুস্থ, আমার ছেলে আমেরিকায় আছে, ছেলে জুন— জুলাইয়ে আসতে পারে, ছেলে না আসা পর্যন্ত কে নির্বাচন করবো—কি করবো না, বলতে পারছি না। আমি আশা করছি পরবর্তী সংসদের অধিবেশনের পর দিরাইয়ে গিয়ে কিছুদিন থাকবো। অনেকদিন মানুষের সঙ্গে থাকা হয় নি।