শিল্পকলা একাডেমি একটি খুব ভাল কাজ শুরু করে প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। দেশের লোকজ সংস্কৃতিকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে এই কর্মসূচীটি ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। অনাদি কালের শিল্পবোদ্ধা ও উৎসসন্ধানীদের নিকট এই মহৎ কর্মকা-টি চিরকাল প্রশংসিত হয়ে থাকবে। কী করেছেন তারা? গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায় ‘জল জোছনার সুর’ নামের একটি প্রকল্পের আওতায় শিল্পকলা একাডেমি সুনামগঞ্জের ২৫ লোককবির ৩৭৫০ গানের রেকর্ডিং শেষ করেছেন। এই গানগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হবে। এই অঞ্চলের যে ২৫ লোকশিল্পীর গান রেকর্ড করা হয়েছে তার মধ্যে যেমন রাধারমণ, হাছনরাজা, দুর্বিণ শাহ, শাহ আব্দুল করিমের মতো বিখ্যাত লোককবিরা রয়েছেন তেমনি পাদপ্রদীপের অন্তরালে থাকা অনেক শিল্পীর গানই এই কর্মসূচীর আওতায় রেকর্ড করা হয়েছে। গানের বাণী, সুর ও উচ্চারণরীতি আদি অবস্থানে রাখার সচেতন প্রয়াস ছিলো এই কর্মকা-ে। যারা রেকডিংয়ে কণ্ঠ ও বাদ্য পরিবেশন করেছেন তাদেরকেও বাছাই করা হয়েছে বিশেষ যতœসহকারে। এই বিশাল কাজটির গুরুত্ব কতোটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে তা যেকোন সচেতন ব্যক্তি কিংবা গবেষক মাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। আজ আমরা যখন রাধারমণের গানের সংখ্যা ৫ হাজার বলি, তখন কতগুলো গানকে সংকলিত করা গেছে? রাধারমণের বহু গানের কথা বিকৃত হয়েছে, আদি সুর হারিয়ে গেছে। এমন অবস্থা প্রায় সকল লোককবির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু শিল্পকলা একাডেমি আপাতত যে ৩৭৫০ টি গান রেকর্ড করল সেগুলো ভবিষ্যৎকালের অসীম সময়ে অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত থেকে যাবে। এগুলো বিকৃতির দ্বারা অন্তত আক্রান্ত হবে না। যে গবেষকরা সুনামগঞ্জের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির জগৎ নিয়ে গবেষণা করবেন তাদেরকে অশেষ সহযোগিতা করবে এই ডিজিটাল লাইব্রেরি। এরকম একটি প্রশংসনীয় কাজ করার জন্য আমরা শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকসহ স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তা, শিল্পী ও কলাকুশলীদের অভিনন্দন জানাই।
এরকম সংরক্ষণের কাজটি যেকোন সমাজে একটি ধারাবাহিক এবং চলমান প্রক্রিয়া। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ২৫ জন লোককবির ৩৭৫০ টি গান রেকর্ড করা হয়েছে। এই ২৫ লোককবিরই রয়েছে আরও অসংখ্য গান যা এই পর্যায়ে রেকর্ডিংয়ের বাইরে রয়ে গেছে। তাছাড়া আরও অনেক লোককবি রয়েছেন যাদের কোন গানই রেকর্ডিং করা যায়নি। সুনামগঞ্জে লোককবির প্রকৃত সংখ্যা কত তা বলা মুশকিল তবে এই সংখ্যা দুই শতের নীচে হবে না। সকলের গানই সংরক্ষণ করা উচিৎ। আমরা আশা করব শিল্পকলা একাডেমি লোককবিদের গান সংরক্ষণের যে কর্মসূচী হাতে নিয়েছেন নতুন পর্যায়ে নতুন রূপে সেটিকে অব্যাহত রাখবেন।
যেকোন দেশের মর্যাদা বাড়ে তার ঐতিহ্যের সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে। সংগ্রহশালা কিংবা মিউজিয়াম অথবা লাইব্রেরি ওই দেশের সভ্যতার পরিচয় বহন করে। উন্নত জাতি মাত্রই তার আদি ঐতিহ্য সগৌরবে স্বীকার ও প্রচার করে । বাঙালি জাতি এমন এক জাতি যার রয়েছে একটি সুসমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। হাওরের জেলা হিসাবে সুনামগঞ্জের রয়েছে বিশেষ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। এই হাওরের সংস্কৃতি নিয়ে যে সমৃদ্ধ লোকভা-ার রয়েছে সেজন্য এই জেলাকে বাংলাভাষাভাষীদের জন্য সংস্কৃতির রাজধানী হিসাবে অভিহিত করা হয়। আমরা এই মহান রতœরাজি নিয়ে বিশ্বসভায় গর্ব করি। আমাদের গর্বকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে আগামী দিনের মহাকালে জায়গা করে দিতে এগুলোকে যথাযথ সংরক্ষণ করা জাতীয় কর্তব্যেরই অংশ। এই লক্ষে শিল্পকলা একাডেমির শুরু করা বিশাল কর্মযজ্ঞের ধারাবাহিকতা একান্ত কাম্য আমাদের।

