সুস্থ ব্যক্তিদের করোনায় সংক্রমিত হবার আশংকা

সাইদুর রহমান আসাদ
জেলার সাধারণ মানুষের একমাত্র উন্নত চিকিৎসার আশ্রয়স্থল সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল। ছোট খাটো বা বড় কোনো শারীরিক সমস্যার নিরাময় ও ভরসার জায়গা এটিই। জেলা সদরের এই হাসপাতালে গত রবিবার সরেজমিনে ঘুরে ভেতরে অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষ বলছেন, জনবল কম হওয়ায় চাইলেও তারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসতে পারছেন না।
সকাল ১০টা থেকে হাসপাতালে প্রবেশ পথে দেখা গেছে বেশিরভাগ মানুষকে মাস্ক ছাড়া ভেতরে ঢুকতে। অনেকের আবার মুখের থুতনির উপরে রাখা মাস্ক। নেই শারীরিক দূরত্ব। হাসপাতালে আগতদের বেশিরভাগই রোগীর আত্মীয় স্বজন। বিধি নিষেধ অমান্য করে চলাফেরা করায় সংক্রমনের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
হাসপাতালের ডিসপেনসারির সামনেও একই অবস্থা রয়েছে। সামাজিক দূরত্ব থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো উদ্যোগ নেই তাদের। বহির্বিভাগে ৫ টাকা ফি দিয়ে ব্যবস্থাপত্রের কাগজ পেতে যেমন রয়েছে দীর্ঘ লাইন, আবার ডাক্তার দেখাতেও একই রকম অবস্থা। অপেক্ষা ছাড়া এখান থেকে মুক্তি মিলছে না কারো। কয়েক ঘন্টার দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্যবিধি না মানায় মহামারি করোনা ভাইরাস সংক্রমনের আশংকা রয়েছে।
আটতলা বিশিষ্ট হাসপাতালের উপরে উঠতে রয়েছে দুটি লিফট। অনেকে পায়ে হেঁটে উপরের তলায় উঠলেও বেশিরভাগ রোগী ও তাদের আত্মীয় স্বজনরা ঠেলাঠেলি করে এই দুটি লিফট ব্যবহার করছেন। এতে পরিশ্রম কমানোর জন্য লিফটে উঠে জেনে শুনে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন তারা।
হাসপাতালের ৪ তলায় দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র। দুই পাশের ওয়ার্ডের সংশ্লিষ্ট ডাক্তাররা রোগীদের দেখছিলেন। এসময় রোগীর আত্মীয় স্বজনদের ওয়ার্ডের বাইরে বের করে দেয়া হয়। ৪ তলার দুই কেবিনের মাঝে ফাঁকা জায়গায় এসে অবস্থান নিয়েছেন ভর্তিরত রোগীদের আত্মীয় স্বজন। তাদের পরস্পরের মাঝে শারীরিক দূরত্ব ও সখ্যতা দেখে বুঝার উপায় নেই মহামারি করোনা পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে সময় পার করছি আমরা।
ডাক্তারের ওয়ার্ড পরিদর্শন শেষে ৫ তলায় পুরুষ সার্জারির ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডের ভেতরকার অবস্থা আরও ভয়াবহ দেখে গেছে। ওয়ার্ডের বাইরে থেকে অতিরিক্ত মানুষের জন্য সিটে ভর্তি রোগীকে দেখা যাচ্ছিলো না। ভেতরে ঢুকতেই স্পষ্ট দেখা মিলে অতিরিক্ত চার থেকে পাঁচজন করে রোগীর স্বজনকে। তাদের কারো মুখেই নেই মাস্ক। যাদের রয়েছে তাও থুতনির নিচে পড়া। এতে করে ডাক্তার ও নার্সদের দেখে নাক মুখ ডাকা গেলেও করোনা থেকে বাঁচা সম্ভব নয় দাবি নিজেদেরই।
পৌর শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জলিলপুর গ্রামের বাসিন্দা ওমর ফারুক। তার স্ত্রীর শরীর ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন ৪ দিন আগে। আর যাওয়া হয়নি। সকাল ১১টায় নিচ লায় দেখা তার সঙ্গে। মুখে মাস্ক নেই কেনো এমন প্রশ্নের জবাবে সে জানায়, ওয়ার্ডে মাস্ক রেখে এসেছেন তিনি। ডাক্তার আসবে তাই ওয়ার্ডের নার্সরা তাড়াহুড়া করে বের করে দেয় তাকে। তাই মাস্ক ফেলে এসেছেন ওয়ার্ডে।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের ডুংরিয়া গ্রামের বাসিন্দা হারুন মিয়া। বয়সের ছাপ তার মুখে ও শরীরে বহন করে হাঁটছেন হাসপাতালের বারান্দায়। বললেন, বাতিজা সুফিয়ানকে গতকাল রাতে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। এখন সে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আলাপচারিতার সময় মাস্কের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি বাইরে বেরিয়ে যান। অবশ্য কিছুক্ষণ পরে মাস্ক সহ দেখা গেছে তাকে।
হালুয়ারঘাটের বাসিন্দা মিনারা বেগম বললেন, তার মাস্ক বাড়িতে ভুলে ফেলে এসেছেন। বাড়িতে নিয়মিত মাস্ক পড়তে হয় না তাই এমন ভুল হয় মাঝেমাঝে।
সুনামগঞ্জের সচেতন মহলের দাবি, করোনা মহামারি সারা দেশে যেভাবে বিস্তার রয়েছে তা প্রতিরোধ করার জন্য সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এছাড়াও দেশের মধ্যে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে সুনামগঞ্জের প্রথম একজন সনাক্ত হয়েছেন। মানুষের যেকোনো অসুস্থতার জন্য সর্বপ্রথম সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে যেতে হয়। করোনা নেগেটিভ/ পজেটিভ পরে জানা যায়। এর আগে কিন্তু হাসপাতালে যায় সবাই। তাই সবাই যদি স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলে, তাহলে হাসপাতাল হবে করোনার সংক্রমিত হবার জায়গা।
সুনামগঞ্জ জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি অ্যাড. আইনুল ইসলাম বাবলু বললেন, সবাই মাস্ক পড়া প্রয়োজন। কারণ সীমান্ত জেলাগুলোতে যেরকম করোনা রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, নিজ থেকে সচেতন হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এবিষয়ে দর্শনার্থীদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও আরও সচেতন হতে হবে।
সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের সাবেক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বললেন, সুনামগঞ্জ সীমান্ত জেলা। এখানো এতো উদাসীন হলে হবে না। সদর হাসপাতালে কে রোগী কারা আত্মীয় স্বজন চেনা যায় না। রোগীর সঙ্গে চারজন পাঁচজন করে থাকেন। কারো মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। এজন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা রয়েছে। সাধারণ মানুষ যদি তাদের কথা না শোনে, পুলিশের সহায়তা নেবে। এসব কিছু না করে আমাদেরকে মৃত্যুর দিকে টেলে দিচ্ছেন তারা। কারণ সবধরণের রোগী এখানে আসে। কর্তৃপক্ষ যদি স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে না পারেন তাহলে একজন ভালো মানুষ সংক্রমিত হয়ে বাড়ি যাবে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আনিছুর রহমান বললেন, হাসপাতালের ভেতরে রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনরা মাস্ক পড়েন না। এছাড়াও তিনজন চারজন জমায়েত হয়ে গল্প করে। এতে করোনা বিস্তার হবার আশংকা রয়েছে।
তিনি আরও বললেন, আমরা চেষ্টা করছি সবার স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করবার জন্য। আমরা যখন রাউন্ডে যাই তখন সবাইকে ওয়ার্ড থেকে বের করে দেয়া হয়।
জনবল সংকটের কারণে সবকিছু চাইলেও সুন্দরভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বললেন, কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক আসবে বলেছিলো। তাদের জন্য আমরা পরিচয়পত্র বানিয়ে রেখেছিলাম। পরে তারা আসেনি। তবে খুব তারাতারি বাইরে কোলাপসিবল গেইট নির্মাণ করে দর্শণার্থী ও রোগীদের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হবে বলে জানান তিনি।