সুস্বাদু আনারস ‘হানিকুইন’ চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে

বিশেষ প্রতিনিধি
দেশের সবচেয়ে সুস্বাদু আনারস ‘হানিকুইন’ চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে সুনামগঞ্জের হাসাউড়ার চাষীদের। মুখরোচক এই আনারসের উৎপাদনও বাড়ছে। তবে চাষাবাদ বাড়াতে স্থানীয় কৃষি অফিস বা সরকারি সহায়তা চাষীরা পাচ্ছেন না বলেই চলে। গত ১০ বছরের মধ্যে কৃষি অফিস থেকে কোন সহায়তা করা যায় নি স্বীকার করলেন কৃষি কর্মকর্তারাও।
সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদী পাড় হয়ে ১৫ কিলোমিটার দূরের মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড়ের নীচের উঁচু টিলায় প্রায় ৩০ বছর আগে হানিকুইন (স্থানীয়ভাবে হাসাউড়ার আনারস হিসাবে পরিচিত) আনারসের চাষাবাদ শুরু হয়। হাসাউড়া গ্রামের দুই সহোদর চাষী আব্দুল খালেক ও আব্দুল বারেক প্রথমে সামান্য জমিতে আনারস চাষাবাদ করেছিলেন। তাদের সফলতা এলাকার অন্য চাষীদেরও উৎসাহিত করে। প্রতিবছর বাড়তে থাকে আনারস চাষের জমি। হাসাউড়ার পাশের উঁচু পাহাড়ি এলাকায় এই বছর প্রায় ৬০ হেক্টর ভূমিতে আনারস চাষাবাদ হয়েছে। এখন চাষীর সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে গেছে।
স্থানীয় আনারস চাষীরা বললেন, আনারস বাগানে পানি সেচের প্রয়োজন হয়, পানি সেচ দেওয়া ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকের পক্ষে সেই খরচ মেটানো সম্ভব হয় না বলে চাষাবাদও করতে পারে না। না হয় আরও বাড়তো আনারস চাষের জমি।
হাসাউড়া গ্রামের হিরণ মিয়া বললেন, ১০-১২ বছর আগে একবার সারসহ আনারস চাষের কিছু উপকরণ দিয়ে সহায়তা করেছিল কৃষি বিভাগ। এরপর আর কোন সহায়তা পাওয়া যায় নি। কৃষি অফিসের কেউ এসে দেখেও না, কোন পরামর্শও দেয় না। তিনি জানান, চারা লাগিয়ে একবছর পরিচর্যা করার পর বাগানে আনারস ধরা শুরু হয়। জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাস জুড়েই আনারস বিক্রি করা যায়।
হাসাউড়ার বড় আনারস বাগানের মালিক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা নুরুজ্জামান চৌধুরী শাহী। তাঁর বাগান দেখভাল করেন হাসাউড়ার নিতাই চন্দ্র দাস নামের একজন আনারস চাষী।
নিতাই চন্দ্র দাস বললেন, ৪৭ কেয়ার (১৫ একর দুই কেয়ার) জমিতে আনারস করেছেন তারা। চারটি ডিপ টিউবওয়েল বসিয়ে মোটরের সাহায্যে পানি তুলে সপ্তাহে একবার সেচ দেওয়া হয়। সারও পরিমাণমত দেওয়ায় এবার ফলন বাম্পার হয়েছে। বাগানের আনারস দেখলে মন জুড়িয়ে যায় বললেন এই চাষী। তিনি জানালেন, প্রতিদিন ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত বাগান থেকে আনারস কেটে একটি ঘরে রাখছেন তারা। ওখান থেকেই সিলেট, সুনামগঞ্জ ও সাচনা বাজারের পাইকাররা এসে আনারস কিনে নিয়ে যাচ্ছে। তিন হাজার থেকে তিন হাজার দুই শ’ টাকা শ’ হিসাবে এবার আনারস বিক্রি করছেন তারা। কোন কোন পাইকার অগ্রিম আনারস বুকিং দিয়ে রেখেছিল, এখন নিচ্ছে। তিনি জানালেন, আনারস চাষ বাড়াতে হলে টিলায় ডিপ টিউবওয়েল করে দিতে হবে, সারসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে চাষীদের সহায়তা করলে চাষাবাদ বাড়বে। এই চাষী হাসাউড়ার যোগাযোগ সড়কের দুরাবস্তার কথা জানিয়ে বললেন, যোগাযোগ সড়ককে চলাচল উপযোগী করার পাশাপশি বাগানের ভেতরের সড়কগুলোকে মূল সড়কের সঙ্গে যুক্ত করে পাকা করে দিলে ভালো হয়। তাহলে ক্রেতারা এখান থেকে সহজে আনারস বহন করে নিতে পারবে, দামও ভালো পাওয়া যাবে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সালাউদ্দিন টিপু বললেন, দেশের সবচেয়ে সুস্বাদু আনারস হানিকুইন (মধুররানী) সুনামগঞ্জের হাসাউড়া ও শ্রীমঙ্গল ছাড়া অন্য কোথাও হয় না। এই আনারসের বাজার এখন সিলেট ছাড়িয়ে রাজধানীসহ অন্য জেলায় হচ্ছে। কিছু কিছু আনারস ঢাকাসহ অন্য জেলায়ও নিয়ে বিক্রি করছেন ফল বিক্রেতারা। তবে সিলেট অঞ্চলে এর (হাসাউড়ার আনারসের) ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমাদের হিসাবে এই বছর আড়াই কোটি টাকার আনারস বিক্রি করতে পারবেন চাষীরা। গত বছর বিক্রি হয়েছিল দুই কোটি ২০ লাখ টাকার। গত প্রায় ১০ বছর আনারস চাষীদের পরামর্শ ছাড়া কোন সহায়তা দেওয়া যায় নি স্বীকার করলেন তিনিও। বললেন, ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ‘কমলা ও আনারস চাষ প্রকল্প’ নামের একটি প্রকল্প ছিল। ওই প্রকল্প চলাকালীন সময়ে সারসহ নানা উপকরণ দিয়ে চাষীদের সহায়তা করা হয়েছে। আনারস চাষীদের সহায়তা দেবার বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বিএডিসির উদ্যোগে উপজেলা সেচ কমিটির সভা হয় দুই-তিন মাস পর পর, আগামী সভায় হাসাউড়ায় আনারস বাগান বাড়াতে সেচ’এর কি ব্যবস্থা করা যায়, তা নিয়ে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।