সোজা পথে ভোগান্তি, দালাল ধরলে প্রশান্তি

সাইদুর রহমান আসাদ
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার বীরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আমান উদ্দিন। তিনি সৌদি আরবে কাজ করেন। দেশে ছুটি কাটাতে আসার পর তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরে তিনি চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ২১ তারিখ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। পাসপোর্ট অফিস থেকে ডেলিভারি স্লিপ অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি ১১ তারিখ পাসপোর্ট বুঝে পাবার কথা। সাধারণ পাসপোর্ট পাবার ২১ দিনের সময়সীমা শেষ হয়েছে ৫ মাস আগে। তার প্রশ্ন কাঙ্খিত পাসপোর্ট কবে হাতে পাবেন তিনি?
আমান উদ্দিন বললেন, পাসপোর্টের জন্য প্রথমে উজ্জ্বলের (একজন দালাল) কাছে দিয়েছি সাড়ে ৫ হাজার টাকা। কয়েক মাস পরে পোসপোর্ট অফিসে আসার পর অফিসের স্যারে বললেন আমার পাসপোর্ট এখনও প্রিন্ট হয়নি। পরে উজ্জলরে জানানোর পর বললো, আরও ৫ হাজার টাকা দিলে এক সপ্তাহের ভেতর পাসপোর্ট আসবে। ১৫ দিন আগে আবারও ৫ হাজার টাকা উজ্জ¦লকে দিয়েছি। গতকাল সে ফোন দিয়ে জানিয়েছে, আজকে পাসপোর্ট অফিসে আসার জন্য। তাই আজকে (বৃহস্পতিবার) এসেছি।
পাসপোর্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, ৪৮ পৃষ্টার ৫ বছরের সাধারণ পাসপোর্ট ৪ হাজার ২৫ টাকা, জরুরী ৬ হাজার ৩২৫ টাকা ও অতীব জরুরী পাসপোর্ট ফি ৮ হাজার ৬২৫ টাকা। ৪৮ পৃষ্টার ১০ বছর মেয়াদী সাধারণ পাসপোর্ট ৫ হাজার ৭৫০ টাকা, জরুরী ৮ হাজার ৫০ টাকা ও অতীব জরুরী ১০ হাজার ৩৫০ টাকা ফিসের প্রয়োজন।
৬৪ পৃষ্টার ৫ বছর মেয়াদী সাধারণ পাসপোর্ট ৬ হাজার ৩২৫ টাকা, জরুরী ৮ হাজার ৬২৫ টাকা ও অতীব জরুরী ১২ হাজার ৭৫ টাকা ফিস। একই পৃষ্টার ১০ বছর মেয়াদী সাধারণ পাসপোর্ট ৮ হাজার ৫০ টাকা, জরুরী ১০ হাজার ৩৫০ টাকা ও অতীব জরুরী ১৩ হাজার ৮০০ টাকা ফিস। এই দুরকম পাসপোর্ট পুলিশ ক্লিয়ারেন্স থাকা সাপেক্ষে সাধারণের ক্ষেত্রে ১৫ দিন, জরুরী ৭ দিন ও অতীব জরুরী ক্ষেত্রে ২ দিন লাগার সময় উল্লেখ করা রয়েছে।
ছাতকের বাসিন্দা সৈয়দ মিসবাউল হক। তিনিও দালাল ধরে পাসপোর্ট করছেন। এজন্য গুনতে হয়েছে সাড়ে ৯ হাজার টাকা। দালালকে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে শক্ত একটা সিণ্ডিকেট রয়েছে। আপনি দালাল ধরে না করলে, সময় যাবে তবে পাসপোর্ট আর পাবেন না। অনেকে মনে করেন কিছু টাকা গেলেও পাসপোর্ট আসুক তারাতারি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সৈয়দ মিসবাউল হক লিয়াকত আলী নামে একজনের কাছে টাকা দিয়েছেন। এই লিয়াকত আলী’র ট্রেভেলস এর ব্যবসা সুনামগঞ্জ কালেক্টরেট এলাকার সামনে। মায়ের দোয়া তার ট্রেভেলসের নাম।
লিয়াকত আলী নিজেই স্বীকার করলেন, তার ব্যবসার কোনো বৈধ্যতা নেই। অতিরিক্ত টাকা নেয়ার ব্যপারে তিনি বলেন, ‘দোকান ভাড়া ও কর্মচারিদের বেতন আছে। অনেক স্থানে টাকাও দিতে হয়। তাই সাধারণ পাসপোর্টের জন্য ৭ হাজার ১০০ টাকা নেই আমরা।’
তাহিরপুর উপজেলার পুরান বড়দল গ্রামের বাসিন্দা শিপন। তিনিও নিজে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে গেল বছরের নভেম্বরের ৮ তারিখ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে। এবছর ১৫ জুন পর্যন্ত এখনও পাসপোর্ট পান নি তিনি।
শিপন বললেন, যখনই অফিসে আসি বলে ১ মাস পরে আসেন। ১ মাস পরে আসলে বলে ১৫ দিন পরে, ১৫ দিন পরে এলে বলে ১০ দিন পরে আসেন। আজকে বললো, আরও ৫ দিন পরে আসার জন্য। নিজে করার জন্য এই ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে বলে দাবি তার।
দোয়ারাবাজার উপজেলার বাসিন্দা এমরান হোসেন বললেন, আমি পড়াশুনা করেছি। দালাল ধরবো কেনো? তাই আমার নিজের লেপটপে অনলাইনে ফরম পূরণ করে ব্যাংকে গিয়ে টাকা জমা দিয়েছি। এখন এমন ভোগান্তিতে পড়েছি, দালাল না ধরে উপায় নেই। পরে দালাল একজনকে ফোন দিয়েছি। সে বললো তুমি ফরমের পেছনে ‘আই’ লিখে দাও। তাহলে জমা নিবো। অবশ্য এই টেকনিক ব্যবহার করার আগেই ফরম জমা হয়ে গেছে আমার।
সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম খাঁন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বললেন, কোনো দালাল থাকলে আপনারা বের করে দেন। আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নেব। একজন মানুষের পাসপোর্ট আবেদন থেকে শুরু করে হাতে পাওয়া পর্যন্ত যাচাই বাছাইয়ের কাজ স্বচ্ছতার সঙ্গে করছি আমরা।
সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বললেন, পাসপোর্ট করার জন্য কোনো এজেন্সি আছে কিনা সেটা আমার জানা নেই। কারণ এটা করে পাসপোর্ট অধিদপ্তর। এটা আমাদের কাজ নয়। তবে পাসপোর্ট অধিদপ্তর যখন নাম ঠিকানা আমাদের কাছে পাঠায় আমরা সেগুলো যাচাই করে দেখি সেগুলো সত্য না মিথ্যা। পাসপোর্ট অধিদপ্তর কার কাছ থেকে কাগজপত্র নিবে বা নিবে না সেটা আমাদের কাছে তারা বলতে বাধ্যও না, আমরা জিজ্ঞাসাও করিনা। যারা এমন প্রতারণা করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।