আরও একটি বছর হারিয়ে গেল মহাকালের অতল গহ্বরে। সময়ের নিয়মে বর্ষপঞ্জি পরিবর্তন হয়। পুরনো বছর বিদায় নিয়ে নতুন বছরের আগমন ঘটে। এই প্রাকৃতিক নিয়মের কোন ছেদ নেই। সময় কখনও স্থির থাকে না। সময় সদা প্রবহমান। এই প্রবহমানতা বা গতিশীলতাই বিকাশের লক্ষণ। মানুষের সভ্যতা সময়ের মতই একটু একটু করে এগিয়েছে। আরও এগোবে। সময়ের অস্তিত্ব যতদিন থাকবে ততদিনই বিকাশের এই ধারা চলতে থাকবে। সময় যেমন অন্ধ নিয়মে কেবল এগিয়েই যায় মানুষের জীবন সেরকম নয়। মানুষের জীবনে আছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, আছে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, আছে উন্নয়ন-বঞ্চনা; মানুষের এই দ্বান্দ্বিক অগ্রযাত্রাও আরেক সামাজিক বিজ্ঞানের নিয়ম মেনেই ঘটে চলেছে। আমরা যে ভোগবাদী ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সময় কাটাচ্ছি সেখানে মানব সমাজের উন্নয়ন ঘটছে চরম অসম রেখায়। এই রেখার এক প্রান্ত যদি থাকে দশ ফুট উঁচু তো আরেক প্রান্ত থেকে যায় এক ফুটের অনুচ্চতায়। সমাজের অভ্যন্তরস্থিত অর্থনীতি ও রাজনীতি এমন চরম বৈষম্যমূলক অবস্থার তৈরি করে। মানুষ এই অগ্রগতির রেখাকে সমান করে দিতে চায়। মূলত মানুষ যখন থেকে নিজেকে জীবজগৎ এর উন্নত প্রজাতি ভাবতে শিখেছে তখন থেকেই এই অভিলাষ। কিন্তু শক্তির জোরে, সংগঠনের জোরে, বুদ্ধির জোরে অল্প কিছু মানুষ সাধারণ মানুষের অগ্রগতির মিছিলকে সোজা পথে এগোনোর পথ বন্ধ ও অসমতল করে দিয়ে নিজেরা রেখার উর্দ্ধবিন্দুতে অবস্থান গ্রহণ করে। পুরো পৃথিবীর আর্থ-রাজনীতির বাস্তবতা এখনও এরকমই। এই অসম পৃথিবীতে আরও একটি ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ বছর পেরিয়ে গেল। শেষ হয়ে যাওয়া বছরে ুেযমন আশা জাগানিয়া কিছু ঘটনার সন্ধান মিলে তেমনি এর বিপরীতে দেখা পাওয়া যায় আরও বেশি মন খারাপ করা ঘটনাপুঞ্জ। এই ভাল ও মন্দ মিলিয়ে পৃথিবীর মানুষ অনাগত ভবিষ্যৎকে আরও সহনীয় ও সুন্দর রূপে দেখার বাসনা করে। মূলত মানুষের মনের এই শুভবোধই পৃথিবীর অগ্রগতির চালিকা শক্তি। এই জায়গায়ই সকলের ভরসা।
বাংলাদেশে খ্রিস্টিয় ২০২১ সনের প্রায় অর্ধেক অংশ করোনা বিপর্যস্ত হয়ে থমকে গিয়েছিল। বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে যখন একটু একটু করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার দিকে এগুচ্ছিল, তখনইÑ বছরের শেষ সময়ে এসে আবারও করোনার চোখ রাঙানি দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিনই একটু একটু করে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। করোনার নতুন ঢেউ পৃথিবীর অপরাপর অংশে আঘাত হানা শুরু করেছে পূর্ণ শক্তি নিয়ে। গত এক সপ্তাহে পৃথিবীর করোনা সংক্রমণ আগের যেকোন সপ্তাহের রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশে করোনার ঢেউ আঘাত করে একটু দেরিতে। তাই নতুন বছরটি শুরু হতে যাচ্ছে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের ঝুঁকি সামনে নিয়ে। সুতরাং মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাসকে আবার জীবনের অংশ করে নিতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশে নতুন করে অতি ধনীর সংখ্যা বেড়েছে আবার দরিদ্র লোকের সংখ্যা সেই তুলনায় আরও বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ সম্পদের কেন্দ্রীভবনের মাত্রা বিগত বছরেও সমানভাবেই কার্যকর ছিল। রাজনৈতিকভাবে বছরের শেষদিকে কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিলেও সেটি কতটা স্বাভাবিক আর কতটা শাসক দলের প্রশ্রয়ে সম্ভব হয়েছে সে নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দির সমস্যা সংকট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কোন কর্মসূচি ছিল না, যা কর্মসূচি সবই নিজেদের ক্ষমতার অংশীদার করার ইচ্ছাপ্রসূত, ফলে এগুলোর সাথে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কোন আগ্রহ-সম্পর্ক তৈরি হয়নি। বছর শেষের ইউপি নির্বাচনের ফলাফল শাসক দলের নিশ্চিতভাবে মাথা ব্যথা বাড়িয়ে দিবে সন্দেহ নেই। ক্ষমতাসীন দলের প্রতীক নিয়ে যেভাবে প্রার্থীরা হেরেছেন, জামানত খুইয়েছেন; নতুন বছরে দলটি এ নিয়ে নতুন করে হিসাবনিকাস করে কিনা তাই দেখার বিষয়।
আমাদের জেলার অবস্থাও জাতীয় অবস্থারই অনুরূপ ছিল। তবে ভাল খবরÑ এই বছরে মধ্যনগর উপজেলার ঘোষণা এসেছে। হাওরে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে উচ্চ বাজেটের প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে।
সামনের বছরটি সকলের জন্য সুখকর হোক। নতুন বছরে মানুষের বিকাশমুখী চেতনার আরও জাগৃতি ঘটুক।

