সাইদুর রহমান আসাদ
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের ১০০ শয্যার করোনা ইউনিট। এর সামনে রয়েছে পুরো হাসপাতালের ডিসপেনসারি, রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার ডাক্তারের কক্ষ। হাসপাতালের সবচেয়ে ব্যস্থতম জায়গা এটি। সাধারণ জ¦র, সর্দি বা করোনার উপসর্গ নিয়ে রোগীরা আগে এই জায়গায় ভিড় করেন।
সারা দেশের করোনা রোগীদের ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোর মধ্যে একটি সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের ১০০ শয্যা বিশিষ্ট করোনা ইউনিট। পুরাতন ২ তলা বিশিষ্ট ১০০ শয্যার হাসপাতালকে করোনা রোগীদের জন্য ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম দিকে করোনার উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের রাখা হয় নিচ তলায়। আর করোনায় সনাক্ত রোগীদের রাখা হয় দ্বিতীয় তলায়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে করোনা ইউনিটে মোট ১২ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৭ জন করোনায় সনাক্ত। এদের উপরের তলায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বাকী ৫ জনের করোনা উপসর্গ থাকায় নিচের তলায় রেখে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। এসব নরমাল রোগীদের সার্পোট দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে হাসপাতালে। রোগীর উচ্চ মাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন হলে যেতে হবে ৬৫ কিলোমিটার দূরে সিলেট বিভাগীয় শহরে।
এদিকে করোনা ইউনিটে আইসোলেশন কক্ষের জন্য একটা ইউনিটের কাজ চলছে। এই ইউনিট নির্মাণের জন্য ৭- ৮ জন শ্রমিক কাজ করছেন প্রতিদিন। করোনা ইউনিটের ভেতরে এসব শ্রমিক কাজ করলেও কারোর মধ্যে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। ব্যবহার করছেন না স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী। এছাড়াও নার্স ও পরিচ্ছন্ন কর্মীদের নিরাপত্তা সামগ্রী ছাড়াই ভেতরে দেখা গেছে। তারা অবাধে ভেতরে ও বাইরে চলাচল করছেন। এতে করে চিকিৎসা সেবা দেয়া এসব কর্মীদের মাধ্যমে বাইরে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভবনা রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
করোনা ইউনিটে কাজ করা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী (পিপি) রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে রোগীদের সেবা দিলেও সব সময় পিপি পড়তে ভালো লাগে না তাদের। এজন্য অনেক সময় পিপি ছাড়াই করোনায় আক্রান্ত রোগীদের দেখশুনা করেন তারা।
হাসপাতালের সুপারভাইজার সিরাজুল ইসলাম। সকাল ১০ টা ১৮ মিনিটে করোনা ইউনিটে প্রবেশ করেছেন দায়িত্বে থাকা স্টাফ দের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর নেবার জন্য।
সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়া করোনা ইউনিটে প্রবেশ করছেন কেনো? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি ভেতরে যাই নি। করোনা রোগীদের ওয়ার্ডে যারা কাজ করছেন, তাদের বলছি নিচে আসতে। এখান থেকেই স্বাক্ষর নিয়ে চলে যাবো।
তার অভিযোগ, করোনা ইউনিটে আইসোলেশন কক্ষ নির্মাণের কাজ যারা করছেন, তারা কোনো সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াই উপর ও নিচ তলায় চলাচল করছেন। যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
করোনা ইউনিটের নিচ তলায় উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার রাত থেকে ভর্তি রয়েছেন অনিমা দাস। নমুনা পরীক্ষার জন্য দিলেও এখনও জানা যায়নি তিনি করোনায় আক্রান্ত কি না। গেল তিন দিন যাবৎ তার সঙ্গে রয়েছেন প্রান্তোষ দাস নামের এক যুবক। তিনি করোনা ইউনিটেই থাকছেন।
তার দাবি, নিচ তলা করোনা ইউনিট নয়। তাই তিনি এখানে থাকছেন। নিরাপত্তা সামগ্রী ছাড়াই ঘুরাফেরা করছেন।
রাজ মিস্ত্রি (শ্রমিক) শুকুর আলী বললেন, আমরা এখানে কাজ করছি। এটা যে করোনা ইউনিট আমরা জানতাম না। ডাক্তারও বলেন নাই। আমাদেরকে কোনো কিছু দেন নাই। আমরা ভবনের উপর ও নিচ তলায় কাজ করছি।
করোনা ইউনিটে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গেল ৩ মাস যাবৎ কাজ করা রিপন। তার মুখে মাস্ক থাকলেও সুরক্ষা সামগ্রী ছিলো না। তিনি বললেন, আমার সুরক্ষা সামগ্রী উপরে রয়েছে। একটু আগে আসছি তাই এখনও পড়েনি। এখন গিয়ে পড়বো।
সুনামগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি বিন্দু তালুকদার বললেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই নেই সাধারণ মানুষদের মধ্যে। হাসপাতাল এলাকায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীরা মাস্ক ছাড়াই চলাচল করে। করোনা ইউনিটের মধ্যে বিভিন্ন শ্রমিক ও স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার কর্মীরা কাজ করছেন। তাদেরও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী (পিপি) নেই। আমি মনে করি এভাবে চলতে থাকলে করোনার প্রকৌপ আরও বাড়বে। শ্রমিক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের মাধ্যমে তাদের পরিবার ও অন্যান্য লোকজন আক্রান্ত হতে পারে।
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ( উপপরিচালক) ডা. মো. আনিসুর রহমান বললেন, আমাদের হাসপাতালে ১০০ শয্যার করোনা ইউনিট রয়েছে। এখন পর্যন্ত ১২ জন ভর্তি রয়েছেন। এরমধ্যে ৭ জন পজেটিভ।
করোনা ইউনিটে স্বাস্থ্যকর্মী ও নির্মাণাধীন শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী নেই কেনো? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবাইকে পিপি পড়ার জন্য বলা আছে। তবে আমাদের এখানে আইসোলেশনের জন্য একটা ইউনিট প্রস্তুত করা হচ্ছে। যারা এখানে কাজ করছেন তারাই পিপি ছাড়া অবাধে চলাচল করছেন। তবে কোভিডে যারা পজেটিভ তাদের একটা ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। ওয়ার্ডে প্রবেশের সময় পিপি পড়ে যেতে হয় সবার।


