স্যার ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যু, যতটুকু গণমুখী ততটুকু নন্দিত তিনি

ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যুসংবাদ গণমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি সংগঠনকে বিশ্বব্যাপী প্রসার ও এর বহুমুখী বিস্তৃতি সাধন ঘটিয়ে ফজলে হাসান আবেদ যেমন দেশে প্রশংসিত হয়েছেন তেমনি বিশ্বব্যাপীও তিনি সমান সুনাম কুড়িয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে আবেদ একটি বহুজাতিক কোম্পানির উচ্চপদস্ত পদে কর্মরত ছিলেন। সেই চাকুরি ছেড়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও তহবিল সংগ্রহের জন্য ইংল্যান্ড চলে যান এবং সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তিনি নিজ পেশায় প্রত্যাবর্তনের পরিবর্তে দেশ গঠনে মনোযোগী হন এবং গড়ে তোলেন ব্র্র্যাক নামক বেসরকারি সংগঠনটি। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আনন্দপুর গ্রাম থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরই। এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শুরুর শাল্লার আনন্দপুরের সেই প্রথম প্রতিষ্ঠানটি এখন কার্যকর না থাকলেও দেশ ও বিদেশে ব্র্যাকের সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। নিজস্ব পরিকল্পনা মাফিক তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে কেবলই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়েছেন। ব্র্যাকের মাধ্যমে তিনি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারী সমাজকে অর্থনৈতিক মুক্তি দানের লক্ষ নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্ষুদ্রশিল্প প্রভৃতি জায়গায় অভূতপূর্ব সফলতা প্রদর্শন করেন। আড়ং নামের বৃহৎ চেইন শপ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। এ সবই করেন তিনি গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত ব্র্যাক সদস্য/সদস্যাদের নামে। এজন্য তিনি বিশেষ কর সুবিধাও পেয়েছেন। দেশের অপর একটি বৃহৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকও অনুরূপভাবে নানা ক্ষেত্রে বিশাল বিশাল সাফল্য অর্জন করেছে। বলা যেতে পারে ব্র্যাক ও গ্রামীণ ব্যাংক বাংলাদেশের অন্যতম দুই নাম যার কারণে বিশ্ববাসীর প্রশংসা কুড়ানো সম্ভব হয়েছে।
গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নামে এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নানা জায়গায় পুঁজির কেন্দ্রীভবন ঘটানোর ফলাফলটা গ্রামীণ জীবনে কেমন প্রভাব ফেলেছে সেটি একই সাথে সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত সুফলভোগীরা কি দারিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছেন, তারা কি জাতীয় সম্পদের উপর ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্ত হয়েছেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর গবেষণা নির্ভর। তবে মাত্রই একদিন আগে আমাদের পরিকল্পনামন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেছেন আমাদের দেশে প্রতি ৫ জনে এখনও ১ জন দরিদ্র ব্যক্তি রয়েছেন। অর্থাৎ এখনও আমরা প্রায় ২০ ভাগ মানুষকে দারিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে পারিনি। স্বাধীনতা লাভের ২ বছর কম অর্ধ শতকে দারিদ্রতার প্রকোপ অনেক কমেছে, মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক বেড়েছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে সত্য। কিন্তু এত উন্নয়নের পরও শতকরা ২০ ভাগ মানুষের দরিদ্র থেকে যাওয়া এইসব উন্নয়নকে প্রশ্নের সামনে ঠেলে দেয়। দেশের সম্পদ যদি সুষম বণ্টনের আওতায় থাকত তাহলে এই সময়ে দেশে কোনো দরিদ্র লোক খোঁজে পাওয়া যেত না। জাতীয় সম্পদের এমন পুঞ্জিভবন তথা ব্যাপক আয় বৈষম্য স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমাদের বড় ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা রাষ্ট্রের অপরাপর অংশের সাথে বিশ্বব্যাপী সুনামের দাবিদার দারিদ্র বিমোচনের লক্ষে কাজ করা বৃহৎ এনজিওগুলোরও।
কোনো ধরনের জাতীয় দর্শন ছাড়া ব্যক্তি বিশেষের সদিচ্ছায় সাময়িক কিছু অর্জিত হয় সত্য কিন্তু সেটি ওই দর্শনের অধীনে থেকেই অর্জিত হয়। বলাবাহুল্য আমাদের অর্থনৈতিক নীতিতে মানুষে মানুষে বৈষম্য কমানোর কোনো দর্শন এখনও ব্যাপকভাবে প্রযুক্ত হতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে থেকে স্যার ফজলে হাসান আবেদের ভূমিকার যতটুকু গণমুখী ততটুকুর জন্য তিনি বহুদিন নন্দিত থাকবেন। আমরা এই মহাপ্রাণ ব্যক্তির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তাঁর স্মৃতির প্রতি আমাদের অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।