সু.খবর ডেস্ক
সৎ, দক্ষ, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ, নির্দলীয় ও দায়িত্ব পালনে সক্ষম ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন ১২ বিশিষ্ট নাগরিক। রাষ্ট্রপতি গঠিত সার্চ কমিটির সঙ্গে সোমবার বৈঠকে তারা এই পরামর্শ দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে দুই ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আমন্ত্রণ পাওয়া ১২ বিশিষ্টজনের সবাই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের সদস্যসংখ্যা তিনজনে সীমাবদ্ধ রাখা, ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর আগে প্রকাশসহ নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সংবিধানের আলোকে আইন প্রণয়নেরও সুপারিশ করেন তারা। এ ছাড়া সার্চ কমিটি দেশের আরও পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে আগামীকাল বুধবার বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া নামগুলো নিয়ে আজ মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় বৈঠকে বসবে সার্চ কমিটি।
সার্চ কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, নির্ধারিত ১০ কার্যদিবস, অর্থাৎ ৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সব কার্যক্রম শেষ করে ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন কমিশন পাওয়া যাবে।
আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সার্চ কমিটির সদস্যরা গতকাল বিকেল পৌনে ৪টার দিকে জাজেস লাউঞ্জে পেঁৗছান। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক, মহাহিসাব নিরীক্ষক (সিএজি) মাসুদ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শিরীন আখতার। এর পর বৈঠকে আমন্ত্রণ পাওয়া ১২ বিশিষ্ট নাগরিক একে একে বৈঠকস্থলে উপস্থিত হন। বিকেল ৪টার কিছু পরে বৈঠক শুরু হয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা চলে। বৈঠকে অংশ নেওয়া বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সঙ্গে আলাপকালে বলেন, আলোচনায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে কী ধরনের লোক নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা উচিত। তবে বৈঠকে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে কোনো আলোচনা হয়নি।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমরা নির্দিষ্ট করে কোনো ব্যক্তির নাম ধরে আলোচনা না করলেও সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়, এমন একটি চরিত্র তুলে আনার চেষ্টা করেছি। আলোচনা করেছি তারা কেমন হওয়া উচিত। বিশেষ করে তাদের কী কী যোগ্যতা থাকা জরুরি, তা আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, আমাদের কাছে কিছু পদ্ধতিগত বিষয়ে পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল, তা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠনে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নে আমিসহ অনেকে রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ করতে সুপারিশ করেছি। এ জন্য দুই মাস দেরি করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলেও তেমন ক্ষতি হবে না বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।
সুলতানা কামাল আরও বলেন, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে অনেক সময় শুধু নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করা হয়। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত।
এর আগে বৈঠক শেষে সার্চ কমিটি নিয়ে একটি দলের আস্থার সংকট বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে সুলতানা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আস্থার সংকটের বিষয়টি বিভাজিত। কিছু মানুষের আস্থার সংকট আছে, কিছু মানুষের নেই। কেবল আস্থার সংকটের ওপর দাঁড়িয়ে থেকে সামনে এগোনো যাবে না। সার্চ কমিটি হয়েছে, এত দিন ধরে আস্থার যে সংকট ছিল, তার কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছে। আমি মনে করি, তারা অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। দীর্ঘদিন ধরে তারা যোগ্যতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আস্থা আনাটা জনগণেরও নৈতিক দায়িত্ব। ইসি কিংবা সার্চ কমিটি কিন্তু নির্বাচন ভ ুল করে না। নির্বাচনে যদি অস্বচ্ছ ও অন্য কিছু ঘটে, তার জন্য দায়ী থাকে রাজনৈতিক দলগুলো।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, সার্চ কমিটির সঙ্গে আলোচনায় নতুন নির্বাচন কমিশনারদের কীভাবে সিলেক্ট করা যায়, ক্রাইটেরিয়া কী হবে- এসবসহ সার্বিকভাবে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে কথাবার্তা হয়েছে। আমরা বলেছি দক্ষ, যোগ্য, সততা, ন্যয়নিষ্ঠ, দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং সার্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত ব্যক্তিদের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রশাসন চালানোর অভিজ্ঞতাও তার থাকতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, ‘বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবকিছু মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলার কথা। তারপরও আমাদের মধ্যে কেউ কেউ কথা বলেছেন। তবে আমি কথা বলতে চাইছি না।’
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদা বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশনারের সংখ্যা তিনজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বলা হয়েছে। কেননা, পাঁচ কমিশনারের নিয়োগে অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়। ভারতের মতো এত বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি দেশেও মাত্র তিনজন কমিশনার নির্বাচন পরিচালনা করেন। পাঁচজন নিয়োগ দিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। সংবিধানে অনধিক পাঁচজনকে নিয়োগের কথা বলা আছে। অতএব, তিনজন নিয়োগ দিতে কোনো সমস্যা নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিক দলগুলোকেই সমাধান করতে হবে। কী করে একটি ভালো ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা যায়, তা নিয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমাদের অভিমত- নতুন কমিশনারদের নিয়োগের আগে আইন তৈরি করে নেওয়া উচিত। তিনি আর বলেন, নতুন আইন তৈরি করতে দুই মাস সময় লাগলে তা নেওয়া উচিত। দেশে এখন বড় কোনো নির্বাচন সামনে নেই। আইন হলে আইনের আলোকে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলকে আলাপ-আলোচনা করে রাজনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। নইলে এ সমাধান নির্বাচন কমিশন, সার্চ কমিটি- এমনকি রাষ্ট্রপতিও দিতে পারবেন না। এ কথাগুলোই বৈঠকে বলেছি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ বলেন, সার্চ কমিটি প্রথমবারের মতো কিছু নাগরিকের সঙ্গে বসেছে। সেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের মতামত তুলে ধরেছেন। আমরা কিন্তু আগে আলোচনা করে একমত হইনি। কেউ কেউ লিখিতভাবে জমা দিয়েছেন। মোদ্দাকথা হচ্ছে, সার্চ কমিটিকে যেটা সুপারিশ করা হয়েছে, সেটা হচ্ছে একটা মানদণ্ডের মধ্যে থেকে তারা ইসি সদস্যদের মনোনীত করবেন। আরেকটা হচ্ছে মনোয়নের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা। তাতে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস বাড়বে।
সুশাসনের জন?্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সার্চ কমিটির ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর আগে তা প্রকাশ করতে বলা হয়েছে এবং তাদের কেন মনোনীত করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যাও রাখতে বলেছি, যাতে তাদের সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে। এ ছাড়া কিছুটা সময় নিয়ে হলেও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে আইন প্রণয়নের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, আমরা চাই শক্তিশালী একটি নির্বাচন কমিশন। যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, যারা রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না- এমন ব্যক্তিদের দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করার ব্যাপারে মতামত দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষও খুশি হবে।
১২ বিশিষ্টজনের মধ্যে আরও ছিলেন বিচারপতি আবদুর রশিদ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ ছহুল হোসাইন ও এম সাখাওয়াত হোসেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের ব্রিফিং: বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে দেশের ১২ বিশিষ্ট নাগরিক কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ হতে পারে, সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। তারা যে পরামর্শ দিয়েছেন, তার সারমর্ম হচ্ছে নির্বাচন কমিশনার পদে যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন, তারা হবেন সৎ, যোগ্য, নির্দলীয়, নিরপেক্ষ এবং একটি ভালো টিম। আশা করি, সার্চ কমিটি বিশিষ্ট নাগরিকদের মতামতকে গুরুত্ব দেবে।
বিশিষ্ট নাগরিকরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য কারও নাম প্রস্তাব করেননি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, তারা এখানে নাম প্রস্তাবের জন্য আসেননি। এসেছেন কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ হবে এবং তাদের কোন কোন যোগ্যতা থাকতে পারে- সেই পরামর্শ দিতে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, আগামীকাল বুধবার বেলা ১১টায় আরও পাঁচজন বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সার্চ কমিটি। এই পাঁচজন বিশিষ্ট নাগরিক হলেন- সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হেনা, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ।
তিনি আরও জানান, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক দলগুলোর নাম পাঠানোর সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। আজ বিকেল ৩টা পর্যন্ত নাম জমা দেওয়া হবে। আগে এ সময় ছিল বেলা ১১টা পর্যন্ত। রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে নাম পাওয়ার পর তা নিয়ে আজ বিকেল ৪টায় একই স্থানে বৈঠকে বসবে সার্চ কমিটি।
এর আগে গত শনিবার একই স্থানে সার্চ কমিটির প্রথম বৈঠক হয়। সেখানে বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনার সময় ও তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া ৩১টি রাজনৈতিক দলের কাছে নির্বাচন কমিশনের জন?্য পাঁচটি করে নামের প্রস্তাব চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় ওই বৈঠকে। মঙ্গলবার বেলা ১১টার মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এই নাম জমা দিতে বলা হয়েছিল দলগুলোকে।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত বুধবার এই সার্চ কমিটি গঠন করে ১০ কার্যদিবসের মধে?্য নতুন নির্বাচন কমিশনের জন?্য নাম প্রস্তাবের দায়িত্ব দেন। তাদের সুপারিশ থেকেই অনধিক পাঁচ সদসে?্যর ইসি নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।
নাম চূড়ান্ত করছে রাজনৈতিক দলগুলো: এদিকে, সার্চ কমিটির আহ্বানে নাম জমা দেওয়ার জন্য তালিকা চূড়ান্ত করতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। আওয়ামী লীগ গতকাল রাতে দলের কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠক করে নাম চূড়ান্ত করেছে। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ একজন নির্বাচন কমিশনারের নাম চূড়ান্ত করেছে। তিনি হলেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী।


