ধর্মপাশা থেকে জয়শ্রী-সড়ক থেকেও নেই

এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
‘বর্ষায় নৌকা আর হেমন্তে পা’ হাওরাঞ্চলের একটি  প্রচলিত কথা। তবে ধর্মপাশা-জয়শ্রী সড়কের কাজ যখন শুরু হয়েছিল তখন হাওরবাসী স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন কথা বিলুপ্ত হবে। উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। কিন্তু ধর্মপাশা উপজেলার হাওরপাড়ের জয়শ্রীসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের এমন স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেলো। ধর্মপাশা-জয়শ্রী সড়ক নির্মাণ হয়েছে ঠিকই কিন্তু ‘বর্ষায় নৌকা আর হেমন্তে পা’ এখনও স্থানীয় এলাকাবাসীর যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম।
জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে রুরাল ট্রান্সপোর্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (আরটিআইপি) প্রকল্পের আওতায় ধর্মপাশা-জয়শ্রী সড়কে প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কাজ প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৭ সালে শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রজেক্ট বিল্ডার্স লিমিটেড নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিকিভাগ কাজও শেষ করতে পারেনি। পরে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করে আবার দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ঠিকাদার মনোনীত হয় মঞ্জুরুল আহসান অ্যান্ড কোং নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫.১ কিলোমিটার অংশের কার্যাদেশ দেওয়া হয় তাদের। ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর তারা কাজ শুরু করে এবং পরের বছরের জুন মাসে তাদের কাজ শেষ করার কথা ছিল। তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্ধেক কাজও শেষ করতে না পারায় প্রকল্পের টাকা ফেরত যাওয়ার উপক্রম হয়। পরে কাগজেপত্রে কাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে বিলের পুরো টাকা উত্তোলন করা হয়। এ নিয়ে সমকালে সংবাদ প্রকাশিত হলে তড়িঘড়ি করে কিছুটা কাজ করা হয়।
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এ সড়ক মরণ
 ফাঁদে পরিণত হয়। এ সড়কের প্রায় দুই কিলোমিটারের মত জায়গা এখনও কাঁচা। বর্ষার পানিতে সড়কের মাটি সরে গিয়ে সড়কটি হাওরের পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। সড়ক নির্মাণে নি¤œমানের উপকরণ ব্যবহার ও যেনতেন ভাবে কাজ করায় এ সড়কে ব্যয় করা টাকা পুরোটাই আজ ভেস্তে গেছে। এ সড়কে চারটি ব্রীজ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ব্রীজের গোড়ার মাটিও সরে গেছে। ফলে মানুষসহ সাধারণ যান চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এ সড়ক। পানি কিছু কমলে মাঝে মধ্যে যাত্রীবাহী যান চলাচল শুরু হয়। তখন যান উল্টে পড়ে হাওরের পানিতে। ঘটে হতাহতের ঘটনা। ফলে জয়শ্রী, সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ও সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নসহ তাহিরপুর, জামালগঞ্জ উপজেলার কয়েক লাখ মানুষকে চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সড়ক নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্টরা তড়িঘড়ি করে যেনতেনভাবে কাজ করেছে। সড়কে ঠিকমত মাটি ফেলা হয়নি। এমনকি সড়কের পাশে নি¤œমানের ব্লক ব্যবহার করায় তা হাওরের সামান্য পানির চাপে অনেকে আগেই ভেঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। সড়কের মাটি যেভাবে সরে গেছে তাতে কিছু দিন পরে এটি সড়ক না হাওর তা বুঝা মুশকিল হবে।  
ধর্মপাশা মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘যখন পানি থাকেনা তখন আমরা লেগুনা সমিতির লোকজনকে নিয়ে সড়কে মাটি ফেলে চলাচলের উপযোগী করে রাখি। এতে করে তখন মোটরসাইকেলে বা লেগুনায় করে মানুষজন সহজেই যাতায়াত করতে পারেন। মোটরসাইকেলের ঝাঁকুনি সইতে না পেরে অনেকেই পায়ে হেঁটে যাতায়াত করেন।’dharmapasha-pic-1
জয়শ্রী ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি গৌতম চন্দ্র সরকার বলেন, ‘এখন সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেল চলে না। জয়শ্রী থেকে কান্দাপাড়া পর্যন্ত ট্রলারে করে যেতে হয়। উপজেলা সদরে যেতে ট্রলার, লেগুনাসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করতে হয়। বিল্লালপুর থেকে জয়শ্রী বাজার পর্যন্ত সড়ক পানিতে ডুবে গেছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে গেলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’
জয়শ্রী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ ফরিদ আহমেদ বিদ্যালয় চলাকালে প্রতিদিন ধর্মপাশা থেকে নিজ কর্মস্থলে যান। বর্ষায় ধর্মপাশা থেকে কান্দাপাড়া পর্যন্ত মোটরসাইকেল কিংবা লেগুনা করে যানা তিনি। পরে ইঞ্জিন চালিত নৌকা দিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছান। কখনও কখনও যাত্রী কম থাকায় নৌকা দেড়িতে ছাড়ে। তখন তিনি নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারেন না। শুধু শেখ ফরিদ আহমেদই নয়, জয়শ্রী ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০-১৫ জন শিক্ষক প্রতিদিন ধর্মপাশা থেকে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন। এতে সময় অপচয়ের পাশাপাশি মাঝে মধ্যে ফেরার পথে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয় তাদের। শেখ ফরিদ আহমেদ অনেকটা আক্ষেপ করেই বলেন, ‘চাকরির সুবাদে আমাকে বাধ্য হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। শুকনো মৌসুমে মোটরসাইকেলের অনুপযোগী হয়ে যায় এ সড়ক। কখনও বাড়ি ফেরার পথে ট্রলারের যাত্রী না থাকায় একাই ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দিয়ে ট্রলার নিয়ে কান্দাপাড়া আসতে হয়।’
জয়শ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মাজাহার সিদ্দিকী বলেন, ‘দলমত নির্বিশেষে সকলের প্রাণের দাবি ধর্মপাশা-জয়শ্রী সড়ক। ধর্মপাশা থেকে জয়শ্রীর দূরত্ব ৭ কিলোমিটার হলেও কান্দাপাড়া থেকে কান্দাপাড়া পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের কাজ করলেই এই এলাকার মানুষের প্রাণের দাবি পূরণ হওয়ার পাশাপাশি এখানকার জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। চিকিৎসা সেবা গ্রহণ সহজতর হবে। বিশেষ করে জটিল রোগী, গর্ভবতী মহিলাদের দ্রুত হাসপাতালে পৌছাঁনোর বিষয়টি নিশ্চিত হত। মাতৃ মৃত্যু রোধ হতো।’
জয়শ্রী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সঞ্জয় রায় চৌধুরী বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলার মানুষ যাতায়াত করেন। তাহিরপুর থেকে নৌপথে বালু পাথরসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। কিন্তু এ সড়কটি সংস্কার হলে জয়শ্রী স্থল বন্দরে পরিণত হবে। রাজধানী ঢাকার সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে। বর্ষায় সড়কটি পানিতে ডুবে যায় আবার শুকনো মৌসুমে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। তখন স্থানীয় লেগুনা সমিতির লোকজন প্রশাসন ও নিজেদের খরচে সড়কের সংস্কার কাজ করে কোনো রকমে মানুষের যাতায়াতের কষ্ট লাঘব করেন। যদিও মোটরসাইকেল চালকেরা তাদের নিজেদের জন্য সড়কে কাজ করেন কিন্তু এতে করে আমরাই উপকৃত হই। অচিরেই এ সড়কটি সংস্কারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমি সুনামগঞ্জ আসার পর ধর্মপাশা-জয়শ্রী সড়কটি সরেজমিনে দেখেছি। এ সড়ক সম্পর্কে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত আছেন। সড়কটি সংস্কার হওয়া দরকার। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে যাতে সড়কের সংস্কার কাজ করানো যায় সেজন্য চেষ্টা অব্যহত রয়েছে।’