সিলেটের দক্ষিণ সুরমার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নাজিরবাজার কুতুবপুর এলাকায় বুধবার ভোরে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ শ্রমিকের প্রাণ হানির মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা বাকরুদ্ধ, অনুভূতিশূন্য ও স্তব্ধ হয়ে গেছি। প্রতিনিয়ত সড়ক দানবের হাতে অসংখ্য প্রাণ হানির দৈনন্দিন দুঃসংবাদের মাঝেও এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর আমাদের কাছে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক সংবাদ হিসাবে প্রতিভাত হয়েছে। নিহত ১৪ নির্মাণ শ্রমিকের ১২ জনই আমাদের সুনামগঞ্জের মানুষ। নিতান্ত পেটের তাগিদে এরা বেরিয়েছিলেন রোজগারের জন্য। একটি পিকাপে করে এদের বহন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল কাজের জায়গায়। এই শ্রমিকরা এমনই হতভাগা যে গন্তব্যে যেতে এদের কপালে জোটেনি কোনো যাত্রীবাহী যান। মালবাহী এক পিকাপে করে সিলেট শহরের আম্বরখানা শ্রমিকবাজার থেকে এদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এই শ্রমিকরা যেন মানুষ নয়। নিতান্তই তাচ্ছিল্যকর এবং বোধহীন। দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে যেটুকু খবর পাওয়া গেছে সে মোতাবেক বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাকটি ছিলো সড়কের রং সাইডে অর্থাৎ ডান দিক থেকে এসে সজোরে ধাক্কা মারে শ্রমিকবাহী পিকাপটিকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে মনে হয়েছিলো দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ট্রাকের চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলো যেরকম ঘটনা আমরা হরদমই শুনে অভ্যস্ত। এবং যথারীতি দুর্ঘটনার পর দায়ী ট্রাকচালক ও হেলপার পালিয়েছে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ট্রাক চালানোর খেসারৎ দিতে হলো অসহায় ১৪ শ্রমিককে নিজেদের জীবন দিয়ে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহত শ্রমিকদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অর্থাৎ এই দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে এখন আর কোনো মামলা মোকদ্দমা হওয়ার সুযোগ থাকলো না। আমরা যেভাবে প্রতিদিনকার দুর্ঘটনাকে দায়মুক্তি দিয়ে চলেছি আলোচ্য বৃহৎ হত্যাকা-টিও তেমন দায়মুক্তি পেয়ে গেলো বলা যেতে পারে। দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবার পরিজন পেয়েছেন কিছু খুদকুড়ো অনুদান ও শুকনো সহনাভূতি। এই দান কোনো শ্রমিক পরিবারের আকাশ বিদীর্ণ করা বিলাপধ্বনিকে থামাতে পারবে না। যে পরিবারগুলো কর্মক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে সারাজীবনের জন্য অসহায় ভবিষ্যৎ প্রাপ্ত হলো তাদের কাছে একটুও স্বস্তির কারণ হবে না এই তথাকথিত অনুদান। বরং বলা চলে দায়মুক্তির বদৌলতে সড়কে মৃত্যুর আরও নতুন মিছিল তৈরি হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হলো।
আমরা নির্বাক অসহায়ত্ব নিয়ে নিহত শ্রমিক পরিবাদের জীবিত স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করি। দেশে একটি সড়ক আইন বহাল আছে। ওই আইনে দুর্ঘটনায় নিহত-আহতদের আইনি প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণের কিছু বিষয় উরেøখ আছে। আমরা আশা করব কর্তৃপক্ষ নিহত আহতদের পরিবারকে আইন অনুসারে প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেয়ার মানবিক দায়িত্ব পালন করবেন। নিহতদের পরিবারগুলো একান্তই প্রান্তিক ও অস্বচ্ছল শ্রেণির। এরা নিজেদের অধিকার বোধ সম্পর্কে বেখেয়াল। এরা জানতেও পারবে না কী উপায়ে পেতে হয় এই ক্ষতিপূরণ। দয়া করে এই অসহায় পরিবারগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়ান। বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন এই দায়িত্ব নিতে পারেন। যদি আইনি ক্ষতিপূরণ অন্তত পাইয়ে দেয়া যায় তাহলে অন্তত মানুষ হিসাবে সকলের আত্মতৃপ্তির একটু সুযোগ তৈরি হতে পারে। মানবিক বোধ ও বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ক্রমশ আমরা কঠিন জড়পদার্থে পরিণত হয়ে যাচ্ছি। যে কারণে সর্বত্র নিয়মহীনতাই নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে। ১৪ টি তাজা প্রাণও আমাদের সেই কঠিন শিলাতে পরিণত হয়ে পড়া বোধের শক্ত আস্তরণ কি ভাঙতে পারে না? সড়কে বোরোলেই মৃত্যুভীতি নিয়ে আর কতকাল পথ চলতে হবে আমাদের? এই প্রশ্নগুলো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কাছে। উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে না। কিন্তু প্রশ্নগুলো করে রাখা হলো, মহাকাল হয়তো এর জবাব দিবে। মহাকালের উদ্দেশ্যেই আবারও প্রশ্নÑ সড়ক দানব আর কত ঝরাবি প্রাণ?


