সড়ক দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের মৃত্যু/ আইন নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দিতে এগিয়ে আসুন

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে ভুক্তভোগীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে ৫ লাখ টাকা এবং অঙ্গহানি হলে ভুক্তভোগী ৩ লাখ টাকা সহায়তা পাবেন। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর বিধিমালায় এমন বিধান রাখা আছে। ২০২২ সনের ২৭ ডিসেম্বর এই বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। ক্ষতিপূরণের দাবিগুলো ১২ সদস্যবিশিষ্ট একটি ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বা তাদের পরিবার এই আইনের আওতায় ক্ষতিপূরণ দাবি করতে চাইলে দুর্ঘটনা ঘটার সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করবেন। বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান পদাধিকার বলে এই ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের জন্য প্রতিটি যানবাহন থেকে বাৎসরিক আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার এমন বিধান থাকার পরও বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত নিহতদের কেউ কি এই ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন?
সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ পাওয়া সংক্রান্ত এই কথাগুলোর অবতারণা করা হলো গত বুধবার ভোরে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কাজিরবাজার এলাকায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫ নির্মাণ শ্রমিকের করুণ মৃত্যুর খবরকে উপলক্ষ করে। শ্রমজীবী এই মানুষগুলো নিতান্ত পেটের টানে রোজগারের আশায় সিলেট পাড়ি জমিয়েছিলেন। দুর্ঘটনায় এতসব শ্রমিকের মৃত্যু তাঁদের পরিবারকে সারাজীবনের জন্য গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। গণমাধ্যমে নিহত শ্রমিক পরিবারগুলোর বেঁচে থাকা পরিবার পরিজনদের নিয়ে যে মানবিক কাহিনী প্রচার হচ্ছে তাতে বুঝা যায় নিহত শ্রমিকরাই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ব্যক্তির মৃত্যু ওই পরিবারে কী বিপর্যয় ঢেকে আনে তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারও পক্ষে বুঝা সম্ভব নয়। নিহত শ্রমিকরা আক্ষরিক অর্থেই সর্বহারা শ্রেণির। এদের কোনো জোতজমি নেই, সহায় সম্পদ নেই। নেই একরত্তি সঞ্চয়। এদের ছিলো কেবল শরীর। এই শরীর খাটিয়ে তারা উপার্জন করত আর কোনো রকমে বেঁচে থাকত। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ন্যায্য হকদার এরাই। দুর্ঘটনার করুণ মৃত্যুসংবাদগুলো পর্যবেক্ষণ করে আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি কোথাও এই পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়ে এক লাইন সংবাদ নেই। কেন নেই? গণমাধ্যমকর্মীদের অজ্ঞতা নাকি সড়ক আইন বিধিমালা সম্পর্কে প্রচার প্রচারণার অভাব? কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক-মানবাধিকার সংগঠনকে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কথা বলতে দেখা গেল না। সড়ক দানবের হাতে অসহায়ভাবে নিহত হওয়া পরিবারগুলোর এই আইনি অধিকার সম্পর্কে সকলের নিরবতা এক আশ্চর্য সামাজিক প্রপঞ্চ বটে।
একজন মানুষের জীবনের মূল্য টাকার অংকে কখনও তুলনীয় নয়। তারপরেও এই ক্ষতিপূরণের টাকাকে অবলম্বন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার একটু বেঁচে থাকার অবলম্বন খোঁজে পেতে পারে। বুধবারের সড়ক দুর্ঘটনায় সুনামগঞ্জের যে শ্রমিকরা প্রাণ হারিয়েছেন তারা সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির। এদের পরিবার পরিজন ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে সামাজিক সংগঠনগুলোকে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সমাজে এখন নানা নামের বিভিন্ন সংগঠনের প্রাচুর্য রয়েছে। এইসব সংগঠনগুলোর প্রতি আমাদের অনুরোধ, আপনারা দয়া করে এই অসহায় পরিবারগুলোর পাশে আশার বাণী ও ভরসার অভয় হাত নিয়ে দাঁড়ান। আপনাদের সঠিক ও আইনসম্মত পদক্ষেপের কারণে যদি এই পরিবারগুলো প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পায় তাহলে আপনারাও অনাবিল আনন্দে উদ্ভাসিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এই ধরনের কাজই হবে মূলত সমাজসেবামূলক প্রকৃত কর্মকাÐ। এর মধ্য দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আহতদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথটি উন্মোচিত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। যারা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন কোনো কিছুর বিনিময়ে তাঁদের ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু তাঁদের উপর নির্ভরশীল বেঁচে থাকা মানুষগুলোর অশেষ দুঃখের সামান্য প্রবোধ হতে পারে এই ক্ষতিপূরণ।