অভিজিৎ চৌধুরী
৩০ অক্টোরবর ছিল হাওরপাড়ের গল্প উৎসবের শেষ দিন। বিষয় ছিল বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত স্মরণ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানস্থলে যাওয়ার পূর্বে একটু টেলিভিশন সেটের সামনে বসে দেখলাম আলোচনা সভা শুরু হয়ে গেছে। আলোচনা সভার প্রথম পর্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য। বিশেষ আলোচক ছিলেন কথা সাতিহ্যিক স্বপন কুমার দেব। আলোচনা সভাটা খুবই সুন্দর, তথ্য সমৃদ্ধ ও মনে রাখার মতো হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে বিশেষ করে পিএসসি চেয়ারম্যান জনাব সাদিক সাহেবের বক্তব্যের কোন তুলনাই হয় না। উনার বক্তব্যের ভাব, ভঙ্গি, গল্প, ও বিনয় সব কিছুই (আমরা যারা টিভি সেটের সামনে বসা ছিলাম) আমাদের মনকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। মনে হয়েছে যেন কেউ গান গাইছে। কয়েক জন তো বলেই বসলো, উনি যদি আরো বলতেন তাহলে আমরা আরো শুনতাম। এটাই তো গান। এক কথায় মানুষ উনার বক্তৃতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে। কথা বলার মধ্যে যে শিল্প আছে উনি তা শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। আমি উনার বক্তৃতা আগেও শুনেছি। কিন্তু গত সোমবারের সারগর্ভ কথাবার্তার মধ্যে একটা মাটির ও মানুষের মনের ভেতরের কথা ভাব-ভঙ্গিমার মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দর ও সহজ ভাবে তুলে এনেছেন তিনি। এক কথায় আলোচনাটা জমিয়ে দিয়েছেন। উনার বক্তৃতার মধ্যে মানুষ নব্বইয়ের দশকের লোক উৎসবের স্বাদ পেয়েছে।
তখন দেশ বরেণ্য আলোচকবৃন্দ ঢাকা সহ সারা দেশ থেকে আসতেন। এরমধ্যে রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ থাকতেন। সরকারি জুবিলী স্কুলের সামনের মাঠে মঞ্চ হতো। এই মঞ্চেই প্রতিদিন বিকাল ৩টায় আলোচনা সভা শুরু হতো। পুরো মাঠে আলোচনা শোনার জন্য লোকে লোকারণ্য থাকতো। আমি উনাদেরকে বলতে শুনেছি, আলোচনা শোনার জন্য এতো লোক উনারা আগে কোথাও দেখেন নি। এ আলোচনা সভাগুলি তখন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেতো তাদের প্রকাশ ভঙ্গির মাধ্যমে। গত সোমবার ডা. সাদিক সাহেবের আলোচনায় অনেকেই অতীতের কথা স্মরণ করেছেন। উনি অতীতকে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। পিএসসি’র চেয়ারম্যান সাহেবকে কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাই। ঐ সময়ের অনুষ্ঠান কয়েকটা পর্বে থাকতো। স্থানীয় শিল্পী এবং বাইরের শিল্পীদের জন্য সময় নির্ধারণ করা থাকতো। এরপর রাত ১১টার থেকে শুরু হতো বাউল শিল্পীদের নিয়ে বাউল গান ও মালজোরা গানের আসর । চলতো রাত ৩-৪টা পর্যন্ত। আব্দুর রহমান বয়াতির মতো শিল্পীরাও এইসব অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের মানুষের ঢল নামতো মঞ্চের দিকে। প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্যই আলাদা আলাদা ভাবে লোকদেরকে দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া হতো। সব গ্রুপের জন্য একজন সমন্বয়কারী থাকতেন। গত সোমবারের অনুষ্ঠানটা ভাবলাম জমজমাটই হবে। ‘জলের ঘাটে দেইখ্যা আইলাম কি সুন্দরও শ্যামরায়’ এই ধামাইলের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হলো। নৃত্যটি খুবই চিত্তাকর্ষক হয়েছে। এটাকে নৃত্য বললাম একারণেই এটার মধ্যে কোন ধামাইলের গন্ধ ছিল না। অনুষ্ঠানের শেষের দিকে দু’একটা ধামাইল দেখেছি, কিন্তু এগুলো মানসম্মত নয়। এর চেয়ে গ্রামের মহিলাদেরকে এনে শুধু ঢোলক ও একটা বাঁশি দিয়ে মঞ্চে তোলা হলে প্রকৃত ধামাইল গান কী তা অনেকেই জানতে পারতো। সব কিছুই যেন ডিজিটালাইজড। যা দেখানো হলো তা বিকৃত সংস্করণ। এর মধ্যে স্বপ্না দে সহ প্রাক্তন অনেক বিশিষ্ট শিল্পীর টেলিফোনই পেয়েছি। বেসুরো গান সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমি কারণ ব্যাখ্যা করতে পারি নাই। তবে কয়েকটা গান ভালোই হয়েছে। হলে বসে গান শোনলে বিকট শব্দ, আবার বাসায় এসে গান শুনলে মিউজিকের শব্দ কষ্ট করে খুঁজে বের করতে হয়েছে। এই সমন্বয়হীনতার কারণ বুঝতে পারলাম না। তবে ঢোল ও প্যাড’র বিকট শব্দ অবশ্য প্রকট ভাবে শোনা গেছে।
প্রত্যেক মানুষের তার নিজস্ব মতামত প্রকাশ করার অধিকার আছে। এই বিশ্বাস নিয়ে আমি আজ অনুষ্ঠানের উৎকর্ষ সাধনের জন্য কি করা দরকার তা লিখব। আমার কথা কেউ শোনুক না’ই শোনুক তবুও আমি লিখব। নতুন শিল্পী বের করে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে হলে প্রতি বছর উৎসবের পূর্ব থেকে পত্রিকার মাধ্যমে প্রচার করতে হবে (যা আগে করা হতো)। উৎসবের এক সপ্তাহ আগেই প্রতিযোগিতা শেষ করতে হবে। সকল অংশগ্রহণকারী শিল্পীদেরকে নিয়ে উৎসবের দুই দিন আগেই মূল মঞ্চে শব্দযন্ত্র সহ পূর্ণাঙ্গ উৎসবের মহড়া দিতে হবে। এই মহড়ার মাধ্যমে ত্রুটিগুলি বের হয়ে আসবে। আগে উৎসবের দু’তিন দিন পূর্বেই বাহির থেকে যন্ত্রিদের নিয়ে আসা হতো। এতে অনেক টাকা পয়সা খরচ হতো ঠিকই। এখন তো আমাদের স্থানীয় যন্ত্রিরাই গুণে মানে যথেষ্ট ভালো। তাহলে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ মহড়া দিতে পারবো না কেন? এটা একা কিংবা চার/পাঁচ জন ব্যক্তির দ্বারা সম্ভব নয়।
মনে রাখতে হবে এটা সুনামঞ্জের লোক উৎসব। এটা আমাদের এলাকার গৌরবের বিষয়। অনুষ্ঠানের স্বার্থেই আরো শিল্পীমনা মানুষেকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাহলেই একটা সুন্দর কিছু উপহার দেয়া যাবে। না হলে উৎসবে শুধু টাকাই খরচ হবে, ভবিষ্যতে কোন ভালো শিল্পী জাতীয় পর্যায়ে যেতে পারবে না। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শামসুল আবেদিনের সাথে আমার কথা হয়েছে। তিনিও এ বিষয়ে একমত। কিছু হলেই সব দোষ সাধারণ সম্পাদকের। এটা হতে পারে না, চলতে দেয়া যায় না। আমি বলেছি, সাহিত্যিক, শিল্পী, কবি ও শিল্পীমনা মানুষদেরকে নিয়ে আপনি বসুন। দেখবেন, উৎসবের আগের জৌলুস ফিরে আসবে এবং উৎসব প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। তখন একা আপনার কোন দোষ নিতে হবে না। দেবদাস চৌধুরী রঞ্জন, তুলিকা ঘোষ, অমিত বর্মন, সোহেল রানা, সন্তোষ কুমার চন্দ ও আরো অনেকে কষ্ট করেছেন। আপনাদেরকে ধন্যবাদ।
তবে রূপশ্রীর মতো একজন শিল্পীকে অনুষ্ঠানে চোখে পড়লো না। এই চারদিনের উৎসবে দেবদাস চৌধুরী রঞ্জন ও তুলিকা ঘোষের একক অনুষ্ঠান থাকলে অনুষ্ঠানটির শ্রীবৃদ্ধি হতো। সবশেষে, ভবিষ্যতের অনুষ্ঠানের জন্য আমাদের সাহায্যের হাত প্রসারিত রইলো।
লেখক : কণ্ঠশিল্পী ও লেখক
- সাংস্কৃতিক রাজধানী ঘোষণার দাবিটি আমাদের সকলেরই প্রাণের দাবি
- গত বছর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ক্ষতি ১২৯ বিলিয়ন ডলার


