Deprecated: Required parameter $month follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $day follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $year follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $display_count follows optional parameter $sharing_type in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/sassy-social-share/public/class-sassy-social-share-public.php on line 292

Deprecated: Required parameter $total_shares follows optional parameter $sharing_type in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/sassy-social-share/public/class-sassy-social-share-public.php on line 292
হাওরবেদনার হালখাতা – সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক

হাওরবেদনার হালখাতা

উজ্জ্বল মেহেদী
‘চন্দ্রসোনার থাল’। একটি হাওরের নাম। গহিন ধরমপাশার হাওর। এ হাওর দেখতে বড় একটি থালার মতোই! ধান তো কৃষকের আরেক ‘সোনা’। সোনা-ফলা হাওর পানিতে তলিয়ে যায়। চৈত্র মাসের শেষ লগ্নে পানি এলো কোথা থেকে? উদ্বিগ্ন কৃষক হিসাব মেলাতে পারেন না।
শুধু চন্দ্রসোনার থাল নয়, অসময়ে পাহাড়ি ঢলের তোড় সইতে পারল না সোনার থালার মতো সুনামগঞ্জের ছোট-বড় আরও দেড়শতাধিক হাওর। ২৯ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল তিন সপ্তাহের ব্যবধানে একে একে ডুবল ১৫৪ হাওর। প্রবাদ আছে ‘মৎস-পাথর-ধান/ সুনামগঞ্জের প্রাণ’। ছান্দিক প্রবাদই জানান দেয় প্রাণ সম্পদের। এবারই প্রথম একসঙ্গে হাওরের দুই প্রাণসম্পদ ধান ও মাছে লাগল শক্ত এক আঘাত। বেদনার হালখাতার আখ্যান এখান থেকেই। এক ফসলি হাওরের একমাত্র ফসল কৃষক ঘরে তুলতে না পারলে তো ঘোর বিপাকে পড়তে হয়। এ  বিপাক ত্রাণ দিয়ে কোলাবার নয়। বৈশাখ যেখানে নতুন ধান ঘরে তোলার বার্তা নিয়ে আসে, সেখানে ‘চৈতের নিদান’ পরিস্থিতির মুখোমুখি হাওরের কৃষক পরিবার। উগার খালি, ধান মাড়াইয়ের খলা খালি, ঘর-গৃহস্থালির আরেক অবলম্বন গবাদিপশুর খাদ্যসংকট। তাই গেল ১৮ এপ্রিল দুপুরবেলা সুনামগঞ্জের হাওরযাত্রার আগাগোড়া ছিল এপ্রিলফুল।
একেক হাওরের একেক চরিত্র। সীমান্ত লাগোয়া টাঙ্গুয়ার হাওর ‘মাদার ফিশারিজ’। শুধু মাছের জন্য বিখ্যাত হলেও সেখানেও কিছু জমিতে ফলে বোরো ধান। হাওরভাটির মধ্যেও উজান হওয়ায় টাঙ্গুয়ার হাওরে শুরুর দিকে পাহাড়ি ঢল নামে না, তলায় না কখনো। টাঙ্গুয়া থেকে ঢলের পানি চলে যায় ভাটির দিকে। দক্ষিণে আছে নলুয়ার হাওর। জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওর যেন সাগরসম। হাওরপারের বাসিন্দারা ‘সায়র’ বলে ডাকেন। ফসলহানি ঘটলে সবার আগে নলুয়া ডুবে। এবারও ঘটল তাই। আমাদের কাছে তাই এপ্রিল ফুল হয়ে থাকল নুলুয়ার হাওরডুবি।’
হাওরতল অবস্থার মধ্যেও টিকেছিল তাহিরপুরের শনির হাওর ও জামালগঞ্জের পাগনার হাওর। ২৯ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত হাওরপারের কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমের চেষ্টা বিফল করে ২৩ এপ্রিল শনির হাওর, শনির পর ২৪ এপ্রিল সর্বশেষ পর্যায়ে পাগনার হাওরও পানিতে তলিয়ে যায়। তখন ধান নামের ‘প্রাণ’ ছিল শনি ও পাগনার হাওরে। প্রাণের স্পন্দন দেখতে ছুটে চলা শনির হাওর পানে। ১৯ এপ্রিল ভোরে প্রথম আলোর সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি খলিল রহমান, আলোকচিত্রী আনিস মাহমুদকে সঙ্গী করে রওনা। হাওরের চিরচেনা যাত্রাপথ নাওয়ে-পাওয়ে এই এক যাত্রাপথে দেখা মেলে প্রকৃতির তিন রূপ। ভোরে মিষ্টি রোদ, সকাল গড়িয়ে দুপুরে মেঘলা আকাশ, বিকেলে ঝড়ো হাওয়ায় বৃষ্টি।
শনির হাওরে আহাম্মকখালি বাঁধ থেকে চার কিলোমিটার ব্যাপী লালুরগোয়ালা পর্যন্ত বালুর বস্তা ফেলে বাঁধ সুরক্ষার স্বেচ্ছাশ্রম। যেন পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে কৃষকের শ্রম-ঘাম এককাট্টা একরূপ। বৌলাই নদ হয়ে নৌযাত্রায় হাওরের ‘আফাল-আউকি’ ভেদ করে শোনা মাইকযোগে আহবান-‘দোকানপাট বন্ধ/ যাইতে হবে বান্ধ (বাঁধে)।’ দেখা গেল, এই এক আহবানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছুটছে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ এলাকায়। স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষায় আছেন তাহিরপুর-জামালগঞ্জের ৪০ গ্রামের মানুষ। উদ্যোক্তাদের একজন, তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল জানালেন, যাঁরা কাজে যেতে পারছেন না, তাঁরা খরচ জোগাতে সহায়তা করছেন।
কামরুল আমার বন্ধু, কিন্তু আমি তাঁর শত্রু! প্রায় দেড় যুগ আগে হাওর যখন ওয়াটারলর্ড নামে সন্ত্রাসকবলিত, তখন থেকেই কামরুলের সঙ্গে বন্ধুশত্রু সম্পর্ক। তাহিরপুরে ‘কামরুল-উজ্জ্বল’ জুটিকে কেউ কেউ আবার আমাকে ভেবে বেমালুম ভুল করতেন। কখনো কামরুলের পক্ষে দুই কলম লিখতে পারিনি।সবসময়ব বিরুদ্ধেই চলত আমার কলম। এবার পাশা ঘুরে গেল। কামরুলকে নিয়ে ইতিবাচক কিছু এবার লিখতে হলো। শনির হাওরে গিয়ে তাঁর কাছে শোনা হয়, বাঁধ রক্ষার লড়াইয়ে ২৯ মার্চ থেকে এক নাগাড়ে আছেন মনেছা বেগম নামের একজন নারী ইউপি সদস্য। সেই দলে কামরুল নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২৪ দিন ও রাত মনেছা বাঁধে কাটিয়েছেন। কিন্তু পারলেন না মনেছারা। ২৩ এপ্রিল লালুরগোয়ালা থেকেই ভাঙল বাঁধ। নিমিষেই তলিয়ে গেল আধা-পাকা ফসল।
ভাটির কৃষক অমর চাঁদ দাশ। দিরাইয়ের শ্যামারচরে বাড়ি। ২৯ মার্চ রাতে যখন পাহাড়ি ঢল নামে, তখন হামলে পড়ে খালিয়াজুড়ি হাওরে। সেই থেকে অমরচানদা নিয়মিত আবহাওয়ার বার্তার মতো করে আমাকে জানাতেন। আর তাড়া দিয়ে বলতেন, ‘আসো তোমরা।’ গেলাম যখন, তখন অমরচানদার আক্ষেপ, দেরি করে ফেলেছো! প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে করে সব হারানোর পর এলে!
দেরির কারণটা তাঁকে বললাম। সিলেটে তখন আরেক যুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল। সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’। সুনামগঞ্জ শহরকেও শোকাচ্ছন্ন করেছে। অকালে পুলিশ কর্মকর্তা হারানোর বেদনায়। আামিও ছিলাম সেই সন্ধ্যায়। ২৫ মার্চ, প্রথম বোমা হামলার স্থানটি সন্ধ্যার আগে সহকর্মী সংবাদকর্মীদের সদলবলে পদযাত্রার মতো করে পাড়ি দিয়েছিলাম। সন্ধ্যার আবছা আলোয় দেখি সেই পথে বারুদের গন্ধ, ক্ষতবিক্ষত মানুষ। আর্ত-চিৎকার। কী করে বাঁচলাম আমি? এমন প্রশ্ন সারাজীবনের জন্যই থাকবে।
জঙ্গি, বোমার ভাবনা মাথা থেকে সরছিল না। কিন্তু সরাতে চাই। একটি বড় ঘটনা তলাতে হলে চাই আরেকটি বড় ঘটনা। এরমধ্যে আসল ‘হাওর অ্যাসাইনমেন্ট’।
তৃণমূল সাংবাদকিতার একটি পথনকশা আছে। যে পথনকশা আমরা শুরু থেকেই চর্চা করে আসছি। পংকজদার (সম্পাদক, সুনামগঞ্জের খবর) কাছ থেকে শেখা। কোনো কিছু ঘটলে উপরের চিন্তা-ভাবনাটাও রপ্ত করা দরকার। আমি সুনামগঞ্জ যেতে যেতেই সেরে নিলাম এ কাজ। ফোনে বাংলাদেশের পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আইনুন নিশাতকে পেয়ে গেলাম।  ঢাকাও লুফে নিল। এ জন্য প্রথম পর্বেই প্রথম আলো প্রধান শিরোনাম- ‘ভরা বৈশাখে চৈতের নিদান’।
কথায় আছে ‘বাঘের চেয়ে টাগ বড়’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মিডিয়া নামের বাঘের ঘাড়ে ‘টাগ’ হয়ে আছে। নিউ মিডিয়া বলে অভিহিত হচ্ছে। নববর্ষের দিনে প্রথম আলোয় খলিল রহমানের একটি প্রতিবেদন সেই বাঘের ওপর টাগে সওয়ার হয়েছিল। আবার আলোড়িত হয় হাওর পরিস্থিতি। প্রথম আলো প্রথা ভেঙে ঢাকার বাইরে প্রথম গোলটেবিল করে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন নিয়েও উন্নাসিকতা ছিল। সেই উন্নাসিকতা উনুনে গেছে। আরও কিছু সুযোগসন্ধানী তৎপরতা পীড়া দিচ্ছে এখন। হয়তো আগামী বছর ফসল তোলা পর্যন্ত এ পীড়ায় পীড়িত হতে হবে। পীড়ার মর্ম ভেদ করলেন ছাত্র থাকা অবস্থায় হাকালুকি থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর চষে বেড়ানো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এক বন্ধু। ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘তোমরা যখন হাওর জার্নালে ব্যস্ত, তখন হাওর তল হওয়ার মওকায় নিজ পেশা ছেড়ে দেয় কিছু উল্লুক প্রকৃতির চেনা মুখের মানুষ। রঙচঙা শার্ট গায়ে দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা-রাতে সেইভ করে নিয়মিত টিভিতে চেহারা দেখায়। এক লহমায় বনে যায় হাওর গবেষক। সেই সব বর্ণচোরারা হাওরে নেমে কান্নার অভিনয় করে ফেসবুকে ছবি দেয়। অবার সেই কান্নার মুখ বদলে যায় শিলং গিয়ে, অতল হাওর বাণিজ্য করে শিলংয়ে জন্মদিন পালন করা হয় তাদের। কেউ কেউ করে ঈদ-উদযাপন।’
আমি, আমরা সবাই তাদেরকে চিনি। বন্ধুর ক্রোধ বিদ্রোহী ভৃগুর মতো। মর্মভেদ হলেও পেশার দায়ে বর্ষা ছুড়ে জবাব দিতে পারি না। শুধু বলি, বাদ যাবে না কিছুই। এ দৃশ্যপটও লিপিবদ্ধ হবে হাওরে বেদনার হালখাতায়।