হাওরাঞ্চলের অর্ধেক মানুষের কুরবানির চিন্তা বাদ- বাঁচার তাগিদে হালের বলদ নিয়ে যাচ্ছেন বাজারে

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওর পাড়ের গ্রাম রামনগর, আমতৈল ও শ্রীনাথপুর। তিন গ্রামে ১২৫ পরিবারের বসবাস। গত কোরবানি’র ঈদে এই তিন গ্রামের ১৮ পরিবার কুরবানি দিয়েছিলেন। এবার এই ১৮ পরিবারের ৮ পরিবারেরই কুরাবানি দেওয়া হচ্ছে না। কৃষিজীবী এই পরিবারগুলো কুরবানি’র চিন্তা বাদ দিয়ে ঋণ পরিশোধ ও এক বেলা খেয়ে বেঁচে থাকতে ঈদের হাটে নিয়ে যাচ্ছেন হালের বলদ (গরু)। এই অবস্থা কেবল দেখার হাওর পাড়ের এই তিন গ্রামে নয়। হাওরাঞ্চলের সকল গ্রামেরই একই চিত্র।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে ৫০ পরিবারের বাস। সকলেই মুসলিম             
সম্প্রদায়ের। গত বছর এই গ্রামের ৭ পরিবার কুরবানি দিয়েছেন। এরা হলেন মকবুল হোসেন ও জহুর আলী যৌথভাবে, সিরাজ মাস্টার, হান্নান মাস্টার, গিয়াস উদ্দিন, হবিব উল্লাহ্, আব্দুল ওয়াহাব ও ফরিদ আহমেদ। এবার মকবুল হোসেন, ফরিদ আহমদ ও আব্দুল ওয়াহাব কুরবানি দেবেন না। পাশের গ্রাম শ্রীনাথপুরে ৪১ পরিবারের বাস। গ্রামের বশির উদ্দিন ও মিসবাহ্ যৌথভাবে, রফিকুল ইসলাম, আব্দুল খালিক, রুবেল মিয়া, আব্দুল হেকিম, চাঁদ মিয়া, ফারুক মিয়া ও আবিদ আলী যৌথভাবে গত ঈদে কুরবানি দিয়েছেন। এবার বশির উদ্দিন, রফিকুল ইসলাম ও আব্দুল খালিক কোরবানি দিচ্ছেন না। পাশের আমতৈল গ্রামেও একই অবস্থা। ৩৪ ঘরের এই গ্রামে গত কুরাবানির ঈদে আব্দুর রহমান, জালাল উদ্দিন, কমরুছ মিয়া ও মদরিছ আলম কুরবানি দিয়েছিলেন। এবার কেবল কমরুছ মিয়া কোরবানি দিচ্ছেন। অন্যরা কেউ কুরবানি দিচ্ছেন না। কুরবানি না দেওয়া প্রসঙ্গে কৃষকরা জানালেন, বোরো চাষাবাদ করেই সারা বছর খেয়ে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা। এবার এক ছটাক বোরো ধানও কেউ চোখে দেখেনি। ঋণ করে চাষাবাদ করার যে টাকা এনেছিল, সেটাই শোধ হয়নি। এখন কোরবানি দেবার চিন্তা নয়। খেয়ে বেঁচে থাকার চিন্তা করছেন তারা।
রামনগর গ্রামের কৃষক মকবুল হোসেন বললেন,‘১২ কেয়ার (৪ একর) জমিন করছিলাম ঋণ কইরা। ধান চৌখে ( চোখে) দেখছি না। এরপরে ১ টা গরু বেইচ্ছা (বিক্রি করে) লাইনে দাঁড়াইয়া চাউল (চাল) কিইন্না (কিনে) খায়রাম। গত কুরবানির ঈদে ২ জনে মিইল্লা ৪০ হাজার টেকায় (টাকায়) গরু কিনছিলাম। ইবার (এবার) কুরবানির গরু কিনা (কেনা) দূরের কথা, খাইয়া বাঁচনের লাগি হালের বলদ বাজারও (বিক্রি করতে) লইয়া যাওন লাগবো (নিয়ে যেতে হবে)।’
শ্রীনাথপুরের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুর রহিম বলেন,‘এক জনে কুরবানি দিলে আত্মীয়-এগ্না (আত্মীয়-স্বজন) ১০ জনে গোস্ত পায়। ই-বার যারা কুরবানি দিতো নায়, তারার আত্মীয় এগ্নায়ও কুরবানির গোস্তের দেখা পাইতো নায়। যারা দিব, তারার নিজেরার আত্মীয়-স্বজনরে দেওয়ার পরে- না, অন্যরারে (অন্যদের) দিতো।’
আমতৈল গ্রামের রফিক মিয়া বললেন,‘সকালে স্ত্রী-সন্তান মিলে পালই শাখ তুলে বাজারে বিক্রি করে ৪০০ টাকা পেয়েছিলাম। এই টাকা দিয়ে সাতকড়া কিনে এনেছিলাম। গরুর গোস্ত রান্নায় এলাকার সকলেই সাতকড়া কাজে লাগান। এজন্য নিজের গ্রাম ও আশপাশে বিক্রি করে কিছু টাকা লাভ করার চিন্তা করে সাতকড়া আনি। গ্রামে এসে শুনলাম কমরুছ মিয়া ছাড়া আর কেউ কুরবানি এবার দেবেন না। সাতকড়া নিয়ে আমাদের গ্রামে ও আশপাশের গ্রামের বাড়ী বাড়ী গিয়েছি। কেউ একটা সাতকড়া কিনলো না। অথচ. গত বছর ১৫ দিন আগে থেকে সাতকড়া কিনে এনে বাড়ী বাড়ী বিক্রি করেছি। এবার আজই (সোমবার) প্রথম সাতকড়া এনেছি, দুয়েকজন কিনতে চাইলেও বাকী নিতে চান। আমার পুঁজিই চার-পাঁচ’শ টাকা, এরমধ্যে বাকী দেই কীভাবে?’ রফিক মিয়া জানালেন, দেখার হাওরপাড়ের সকল গ্রামেই একই অবস্থা। দুয়েকজন প্রবাসী ছাড়া কারো ঘরে খাবার-দাবার নেই। লাইন ধরে ১৫ টাকার চাল কিনে এনে কোনভাবে দিন কাটাচ্ছেন মানুষ।’
মোল্লাপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল হক বলেন,‘আমার ইউনিয়নের অর্ধেক মানুষই এবার কুরবানি দেবেন না। জেলার সকল এলাকায়ই একই চিত্র। আমার ইউনিয়নের শতভাগ মানুষই ধান অইলেই ধনি। না হইলে ঋণি। ঋণগ্রস্ত মানুষ কুরবানি’র চিন্তা বাদ দিয়ে খেয়ে-বেঁচে থাকার লড়াই করছে।’