হাওরাঞ্চলের দীপশিখা- আবাসনসহ নানা সংকটে ভোগছে

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরাঞ্চলের দ্বীপশিখা শাল্লা ডিগ্রি কলেজ। প্রায় ৩১ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে একেবারে হাওরের তলানির উপজেলা শাল্লায়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে অল্প সময়েই এটি সুনাম কুড়িয়েছে। ২০১৫ ও ২০১৭ সালের এইচএসসি’র ফলাফলে সেরা হয়েছে প্রত্যন্ত জনপদের এই প্রতিষ্ঠানটি। বছরের বেশিরভাগ সময় কলেজের চারদিকে থৈ থৈ করে পানি। প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থীকেই ঐ সময় ট্রলারে কিংবা হাতের নৌকা বেয়ে (চালিয়ে) কলেজে আসতে হয়। এজন্য শুরু থেকেই কলেজটিতে ছেলে-মেয়েদের জন্য আলাদা-আলাদা ছাত্রাবাস করার দাবি ওঠে। কিন্তু কলেজ প্রতিষ্ঠার ৩১ বছর পরেও সেটি হয়ে ওঠেনি। এছাড়া শিক্ষক, অবকাঠামো সমস্যা এবং বাউন্ডারী দেওয়াল না থাকায় অরক্ষিত থাকে কলেজ ক্যাম্পাস।
১৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ১৯৮৬ সালে শুরু হওয়া শাল্লা কলেজে বর্তমান বছরে ছাত্র-ছাত্রী’র সংখ্য ১৩৩০ জন। ২০১২-১৩ ইংরেজিতে কলেজটি ডিগ্রিতে উন্নীত হয়। ২০১৫ ইংরেজির এইচএসসি পরীক্ষায় ১৭ জন
 শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ এবং ২০১৭ ইংরেজি (বিগত পরীক্ষায়) সনে ৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়ে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকে জেলায় সেরা প্রতিষ্ঠান হয় এটি। কলেজটিতে ২ জন প্রভাষক, ২ জন প্রদর্শক, হিসাব রক্ষক ও নৈশ প্রহরী’র পদ শূন্য।
কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবুল বাশার বললো, ‘কলেজের একটি কক্ষেও একসঙ্গে দেড়’শ শিক্ষার্থী বসার মতো ব্যবস্থা নেই। অথচ. ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ৪২৬ জন। শিক্ষকের সংকট থাকায় সেকশনও একটি। অর্ধেক শিক্ষার্থী উপস্থিত হলেও ক্লাস করতে সমস্যা হয়।’
একই শ্রেণির শিক্ষার্থী কনিকা রানী দাস বললো, ‘কলেজে কোন অডিটোরিয়ামও নেই। এজন্য কোন অনুষ্ঠানও হয় না। সম্মিলিত কোন ক্লাসও করা যায় না। এটি আমাদের জন্য খুবই দুঃখের বিষয়।’
উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের মৌলপুর গ্রামের বাসিন্দা একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সমাপ্তি দাস ছাত্রী নিবাসের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘একাদশ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে উত্তীর্ণের পরীক্ষায় ট্রলার পেতে পেতে বিলম্ব হওয়ায় আমার যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। অথচ. এই বিষয়ে আমার সবচেয়ে ভালো প্রস্তুতি ছিল।’
একই শ্রেণির শিক্ষার্থী কনিকা রানী দাস বললো, ‘বৃষ্টি-বাদল কিংবা আবহাওয়া খারাপ হলে প্রায়ই ট্রলারডুবি বা নৌকাডুবির ঘটনায় আমাদেরও শিকার হতে হয়। এই বছর একদিন আমি ট্রলারডুবিতে পড়েছিলাম। অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছি। একটি জেলে নৌকা এসে আমাকে উদ্ধার করে।’
কলেজের ইংরেজী শিক্ষক এনামুল হক বলেন, ‘কলেজের একটি টিনশেড পুরোনো ঘরে ১৫-১৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে একটি ছাত্রাবাস চালু করা হয়েছে। এই ছাত্রাবাসটির দেখাশুনার দায়িত্ব পালন করছি আমি। ছাত্র এবং ছাত্রী নিবাসের ভালো ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষার্থীরা ফলাফল আরো ভাল করতো।’ তিনি জানান, জেলা পরিষদের ৬ লাখ টাকা’র অনুদানে ২০০৮ সালে কলেজের ডানদিকে ছাত্রী নিবাস ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন প্রয়াত সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। ছাত্রী নিবাস ভবনের ফাউন্ডেশনের কাজ হয়েছে। অর্থ সংকটে বাকী কাজ হচ্ছে না।
কলেজ অধ্যক্ষ আব্দুশ শহীদ বললেন, ‘ছাত্রাবাস, অডিটোরিয়াম, শিক্ষক সংকট কলেজের প্রধানতম সমস্যা। বাউন্ডারী দেওয়াল করাও জরুরি। স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা চেষ্টা করছেন, আমরাও চেষ্টা করছি। একটি আশার কথা হচ্ছে, স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রচেষ্টায় কলেজটি সরকারীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে কলেজের স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি শিক্ষা সচিবের নামে দানপত্র দলিল করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের দাবি কলেজটি দ্রুত সরকারীকরণ করার। একই সঙ্গে কলেজের সমস্যার সমাধান হলে- ভাটি অঞ্চলকে আলোকিত করবে এই বিদ্যাপীঠ।’