হাওরাঞ্চলে কারা বয়স্ক বা বিধবা ভাতা পায়?

বিশেষ প্রতিনিধি
নির্মলা বিশ্বাস’এর বয়স ৭০ বছর। ৪০ বছর আগে তার স্বামী বজিন্দ্র বিশ্বাস মারা গেছেন। ৬ শতক বাড়ী’র জমি ছাড়া আর কোন সম্পদ ছিল না দিনমজুর স্বামী’র। ২ মেয়ে ও ১ ছেলেকে নিয়ে খেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করেছেন একনাগারে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। ছেলে রামাকান্ত বিশ্বাস বছর খানেক আগে মারা গেছেন। তারও (রামা কান্ত বিশ্বাসএর) ৩ মেয়ে ও ১ ছেলে। অভাব অনটনের সংসারে ঘানি টানতে ৭০ বছর বয়সেই বাসা বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করেন নির্মলা বিশ^াস। চোখের পানি ঝড়াতে ঝড়াতে আক্ষেপ করে বললেন, ‘কতবার মেম্বারের টাইন গেছি। আমার বিধবা ভাতা অয় না, তারার হকলের (আত্মীয়-স্বজন) ভাতা অইযায়।’ নির্মলা বিশ্বাস এর এই কষ্টের কথা শুনে এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিশ^ম্ভরপুরের লক্ষীপুর গ্রামের একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফতেহপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আগে ছিলেন আশিশ পুরকায়স্থ। তার সময়কালে লক্ষীপুরের কয়েকজনের বয়স্কভাতা হয়েছে এরমধ্যে উমেশ, সুরেশ এবং সুরেন্দ্র বিশ^াসসহ বেশিরভাগই আশিশ মেম্বারের শ^শুর বাড়ী’র আত্মীয়। বর্তমানে এই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জগন্নাথ বিশ্বাস জগন্নাথ বিশ^াস’এর ভাই রাম কুমার বিশ্বাস, ভাইয়ের বউ বিশখা বিশ^াস, মা মাধবী বিশ^াস, বোন সারাদা বিশ্বাস এরা সকলেই সমাজসেবা অধিদপ্তরের ভাতা পান। কেউ বয়স্ক, কেউ প্রতিবন্ধী, কেউবা বিধাব ভাতা। জগন্নাথ বিশ্বাস’এর স্ত্রীও কিছুদিন আগে মাতৃত্ব ভাতা পেয়েছেন। ভাতার ক্ষেত্রে
কেবল আশিশ বা জগন্নাথ মেম্বার নয় বেশিরভাগ ইউনিয়নের গ্রামগুলোতেই এই অবস্থা। হয় আত্মীয়করণ না হয় টাকা পয়সা যারা দিতে পারবে, তারাই ভাতা পায় এমন কথা বললেন, বিশ^ম্ভরপুরের ব্যবসায়ী কবির আহমদ। তিনি জানালেন, তার চাচার বয়স্ক ভাতা’র কার্ড ৩০০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন।
সম্প্রতি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার বংশিকু-া ইউনিয়নের চাপাইতি গ্রামের সন্তান সাবেক তথ্য সচিব, বর্তমান তথ্য কমিশনার মরতুজা আহমদ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে হাওরাঞ্চলের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির সহায়তা প্রদান কার্যক্রমের ত্রুটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
মরতুজা আহমদ ওই সভায় বলেছেন, গ্রামে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলেন তিনি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ অনেকেই এসে বলেছেন, সরকার শুনেছি বয়স্ক ভাতা দেন, আমরা কেন ভাতা পাই না, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজসেবা অফিসে ঘুরে ঘুরে তারা হয়রান। তিনি এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে তাৎক্ষণিক জবাবও চান।
চাপাইতি গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান দুলালের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সচিব সাব (মরতুজা আহমদ) বাড়ীতে আইছলা হুইন্না (শুনে), গ্রামের হানিফ মিয়া (৭৫), কামাল উদ্দিন (৬৫), সখিনা আক্তার (৭০) সহ বেশ কয়েকজন দেখা করে তাঁকে আকুতি জানিয়েছে, আপনি থাকতে আমরা বয়স্ক ভাতা পাই না। আমরা মেম্বার, চেয়ারম্যান ও সমাজসেবা অফিসে ঘুরে ঘুরে হয়রান।’
মিজানুর রহমান জানালেন, হাওরাঞ্চলে সরকারের এসব ভাতা সাধারণ বা নিরীহ পরিবারের সদস্যরা কমই পায়। মেম্বার চেয়ারম্যানের আত্মীয়-স্বজন বা কার্ড করার জন্য ঘুষ যারা দিতে পারে, তারাই ভাতা পায়। অনেক মৃত মানুষের কার্ডও টাকা দিলে হাত বদল হয়।
বয়স্ক ভাতা নিয়ে এ ধরণের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিশ^ম্ভরপুরের ফতেহপুরের ইউপি সদস্য জগন্নাথ বিশ^াস বলেন, আমার গ্রামে বয়স্ক ভাতার কার্ড আগের ইউপি সদস্য করে গেছেন। আমার মায়ের কার্ডও তার সময়কালেই করা। আমাকে একটি বিধাব ভাতা’র কার্ড’এর নাম দেবার জন্য বলা হয়েছে, আমি এবার নির্মলা বিশ^াস’এর ছেলের বউ যমুনা বিশ^াস’এর নাম দিয়েছি। আমার ভাই রাম কুমার বিশ^াস বয়স্ক ভাতা পান তার ভাইয়ের কার্ড দিয়ে। সৎ ভাই গোপালপুরের হরিচরণ বিশ^াস মারা যাবার পর তার বয়স্ক ভাতার কার্ড প্রতিস্থাপন করে ভাতা পান তিনি। এটি আমি ইউপি সদস্য হবার আগেই করা হয়েছে।
ধর্মপাশার বংশিকু-া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মজনু মিয়া বলেন, আমার আগে যিনি ইউপি সদস্য ছিলেন, তিনি চাপাইতি’র বয়স্ক বা বিধবাদের নাম ঠিকভাবে পাঠান নি। আমি তাদের নাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে সমাজসেবা কার্যালয়ে জমা দিয়েছি।
বংশিকু-া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিম মাহমুদ বলেন,‘বয়স্কভাতা বয়স্ক ব্যক্তি এবং বিধবা ভাতা বিধবাদেরই দেই। আত্মীয়-স্বজনকে দিতে চাইলে, কয়জন আত্মীয় বয়স্ক এবং বিধবা পাওয়া যাবে। আমার ইউনিয়নে এই নিয়ে স্বজনপ্রীতি হয় না।’
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সুচিত্র রায় জানালেন, এ ধরণের অনিয়ম দুর্নীতি ঠেকাতে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেসন সিস্টেম (এমআইনএস)’এর মাধমে অর্থাৎ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভাতা প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর কার্যক্রমও এই জেলায় শেষ পর্যায়ে। সুনামগঞ্জে ৮৪ শতাংশ এমআইএস শেষ হয়ে গেছে। এই বাছাইয়ে ভাতা প্রাপ্তদের মধ্যে ১০ শতাংশের নাম বাদ পড়বে।
এখন নতুন তালিকা হবে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মাইকিং করে বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও বিধবা নারীদের একটি সুবিধাজনক স্থানে সমবেত হতে বলা হবে। এরমধ্য থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে বাছাই করে ভাতা দেবার ব্যবস্থা করা হবে। ২০১৯-২০ অর্থ বছর থেকেই এটি করা হবে।