সাম্প্রতিক অকাল বন্যায় হাওরে ফসলহানিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান ও হাওর সমস্যার সমাধানে সুপারিশ বিষয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করছে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা।
শনিবার ঢাকার রিপোটার্স ইউনিটিতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজোয়ানা হাসান, এ এল আরডির প্রধান ননির্বাহী শামসুল হুদা, সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পিযুষ পুরকায়স্থ টিটু।
এসময় বক্তারা বলেন হাওরবাসী আজ স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগের সম্মুখীন। দেশের মোট জনসংখ্যার আট ভাগের এক ভাগ বসবাস করেন হাওরাঞ্চলে। এই হাওরাঞ্চলের অর্ধেকের বেশি মানুষের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। একের পর এক হাওরের ফসল যখন তলিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই ‘মরার উপর খরার ঘা’ হয়ে দেখা দিল মাছের মড়ক। উপার্জনের দ্বিতীয় যে উপায়টি দরিদ্র হাওরবাসীর সামনে খোলা ছিল তা-ও বন্ধ হয়ে গেল। হাওরাঞ্চল ফসলহানিত হয়েছে অনেকবার। ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই শতকের প্রথম ১৭ বছরেই হাওরে ফসলহানি হয়েছে আট বার।
তবে বয়স্কজনেরা কেন বলেছেন যে, তারা এমন ভয়াবহ সংকট আর দেখেননি? কারণ এ বছর অকাল বন্যাটি বেশি আগেভাগে হয়েছে। সাধারণত হাওরে অকাল বন্যা দেখা দেয় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে; কিন্তু এবার বন্যাটি দেখা দিয়েছে ২৭ মার্চ থেকেই। অন্যান্য বছর বন্যার সময় ধান কাটার উপযোগী হয়ে য়ায়, পানি এলেও কিছু-না কিছু ধান কাটা সম্ভব হয়। এবার যখন বন্যা এলো তখন ধান গাছে ধান আসেনি। তাই যে হাওর তলিয়ে গেছে সেই-হাওরে থেকে কোনো ধানই আর সংগ্রহ করা যায়নি, তাই এই ফসলহানীর প্রভাব খুব বেশী। গত বছরও ৬০ ভাগ হাওরে ফসল তলিয়ে গিয়েছিল। তাই এবছর কৃষকদের ঋণ করে ফসল ফলাতে হয়েছে। এদের কেউ কেউ আগের বছরও ঋণ করেছিলেন। সেই ঋণও এখনও পরিশোধ হয়নি। এই ঋণের বড় অংশই গ্রাম্য মহাজন, দোকানদারসহ নানা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে নেওয়া। বারবার এসব ঋণ পরিশোধ না হওয়া এবং অর্থেও অভাবের ফলে সমাজে হানাহানি ও বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাবে। অভাবের তাড়নায় বেড়ে যাবে চুরি- ডাকাতির ঘটনাও। সর্বোপরি এই ফসলহানীর ফলে হাওরাঞ্চলে বিরাজ করছে এক মানবিক বিপর্যয়।
পানিতে ধান তলিয়ে যাবার পর অনেকেই উপার্জনের বিকল্প হিসেবে মাছ শিকার করতেন, কিন্তু আকস্মিক দেখা দিল মাছের মড়ক এতে উপার্জনের বিকল্প পথটাও বন্ধ হয়ে গেল। মড়কে ডিমসহ মা মাছ মারা যাওয়ায় মাছের পরিমান ও প্রজাতি নষ্ট হতে পারে। অনেক মাছ মারা যাওয়ায় আগামী কয়েক বছর মাছের সংকট দেখা দিতে পারে। হাওরে কিছু বিলুপ্ত প্রায় মাছ রয়েছে। এসব মাছ মারা গেলে অনেক প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যায়। কমে যাবে জীববৈচিত্র্য।
এর প্রভাব বছরের আগামী মাসগুলোতে গভীর থেকে গভীরতর হবে। বাচাঁর তাগিদে হাওরের দরিদ্র কৃষকরা আজ ভিটা বাড়ি ফেলে শহরমুখী হচ্ছেন। তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
হাওর ঘুরে, তাদের সংস্থার সদস্য ও প্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক অকাল বন্যায় হাওরাঞ্চলের সাতটি জেলায গড়ে ৭৫ ভাগ হাওরের বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরের ৭টি জেলায় মোট ১১লক্ষ ৩৪হাজার ৬০০ পরিবার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সবচেয়ে বেশী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা। এই জেলায় প্রায় ৯৮ ভাগ ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।
এ বছর সুনামগঞ্জে ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৮৭ হেক্টর জমিতে বোরো ফসল চাষ হয়। তন্মধ্যে প্রায় ২ লক্ষ ১৮ হাজার হেক্টর জমির ফসল অকাল বন্যায় তলিয়ে যায়। যা থেকে প্রায় ৯ লক্ষ টন ধান পাওয়া যেত। সাতটি জেলায় এবছর মোট ২২ লক্ষ টন ধান হারালো হাওরের কৃষক। সমগ্র হাওরাঞ্চলে দুই হাজার টন মাছ মারা যায়। প্রায় এক হাজার টন সব্জির ক্ষতি হয়। প্রায় ৩০ হাজার হাঁস মারা গেছে। এতে মোট ১৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে আমরা মনে করি। মাছের মড়কে অনেক বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ বিলীন হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। যা প্রকৃতি ও পরিবেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি।
শুধু টাকার অংক দিয়ে মানুষের এই ক্ষতি নিরূপণ করা যাবে না। এই ফসলের উপর নির্ভর করে কৃষি পরিবারের আচার অনুষ্ঠান, বিয়ে সাদি, ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার খরচ মেটানো হয়। অনেকেই নতুন জামা কাপড় কেনা সহ নানা সখ আহ্লাদ মেটান এই ফসল বিক্রি করেই। হাওরের গ্রামে গ্রামে বসে গানের আসর, কেচ্ছা- কাহিনী, নাটক সহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ বছর অভাবের তাড়নায় হাওরে হয়ত এসবের কিছুই হবে না। বাচাঁর তাগিদে হাওরের দরিদ্র কৃষকরা আজ ভিটা বাড়ি ফেলে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি


