হাওরে নবান্ন উৎসব নেই বৈশাখী উৎসবও হবে না

বিশেষ প্রতিনিধি
বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরকারি হিসাবে সুনামগঞ্জে এক লাখ ১৩ হাজার হেক্টর ফসল পানিতে ডুবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ফসল তলিয়ে গেছে। জেলার ৭০ ভাগ ফসল বিনষ্ট হয়েছে। এ কারণে সুনামগঞ্জের ১৫ লাখ কৃষক পরিবারে দুর্দিন শুরু হয়েছে। চৈত্র মাসের মাঝামাঝি অর্থাৎ ধানের শীষ গজানোর আগেই ফসল তলিয়ে যাওয়ায় এবার কৃষকরা নিজেদের খাবারের জন্যও এক মুঠো ধান ঘরে তুলতে পারেননি। এই অবস্থায় হাওরের কোথাও এবার নবান্ন এবং বৈশাখী উৎসব হচ্ছে না।
সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার নীচু এলাকার ৪৮ বড় হাওরের ৪৬ হাওরই ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে অসময়ে হওয়া বাঁধ ভেঙে, না হয় বাঁধ না হওয়া অংশ দিয়ে পানি ঢুকে ডুবে গেছে। এসব হাওরে থৈ-থৈ করছে পানি। কৃষকরা হাওর পাড়ে বসে কেবল দুশ্চিন্তা করছেন। হাওর এলাকায় এখন কোন কাজও নেই। অন্যান্য বছর ২৫ চৈত্রের পর নতুন ধান বাড়ীতে এনে কেউ শিরনি বিতরণ, পিঠা-পায়েশের উৎসব। কেউবা পূজা-পার্বন করলেও এবার সুনামগঞ্জের হাওর পাড়ের গ্রামগুলোতে এমন উৎসব নেই।
মধ্যনগরের হরিপুর- নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা প্রণতি রানী সরকার বলেন,‘চৈত্র মাসের শেষ শনি-মঙ্গলবারে আমরা বন্ধ কুমারী’র পূজা করে থাকি। এই পূজায় ধান খেত থেকে পাকা ধানের ৫ টি আগ (শীষ) কেটে বাড়ির কিশোর বয়সের ছেলে নতুন রুমাল দিয়ে আগ বাড়িতে নিয়ে যায়। এসময় আগ যার হাতে থাকবে পথে কারও সঙ্গে তার কথা বলা বারণ। ধানের মুঠা এনে ঘরের মধ্যম পালায় বেঁধে রেখে পূজা দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় ধান কাটা-মাড়াই। এবার হাওর পাড়ের কোন গ্রামে এই পূজা হচ্ছে না। ধানই নেই, তো আগ পাবে কোথায়। এছাড়া ধান কাটা শুরু      
হলে চাঁদ দেখে লক্ষী পূজা দেওয়া হয়। এই পূজাও এইবার  কেউ করবে না।’
বিশ্বম্ভরপুরের লখনা’র বিশাখা রানী বিশ্বাস বলেন,‘ কেবল পূজা নয়, নতুন ধানের চাল দিয়ে পিঠা করে সকলকে খাইয়ে, এরপর ধান কাটা শুরু হতো। এবার এগুলো নেই।’
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওর পাড়ের গ্রাম সর্দাবাজের কৃষাণি মর্জিনা বেগম বলেন,‘চৈত্র মাসে খেতে ধান পাকলে প্রথমেই সামান্য ধান কেটে এনে পাশের মসজিদে দেওয়া, পিঠা-পায়েশ তৈরি করে বাড়ি’র সকলকে খাওয়ানো, আশপাশের খাওয়ানোর পরই নিজেরা কিংবা ধান কাটা শ্রমিকদের দিয়ে কাটা মাড়াই শুরু হয়।’ এমন রেওয়াজ কেবল দেখার হাওর পাড়ে কিংবা মধ্যনগর বা বিশ্বম্ভরপুরে নয়। জেলাজুড়েই এমন রেওয়াজ বহুকালের।’
দেখার হাওর পাড়ের সর্দাবাজ গ্রামের বয়স্ক কৃষক রঞ্জিত দাস বলেন,‘৫০ বছর বয়স হয়েছে, নবান্ন উৎসব কখনো হয়নি, এটি আমার জানা নেই। এবারই তা হচ্ছে না।’
এদিকে, রোববার জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির বিশেষ সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে সুনামগঞ্জে রেওয়াজ অনুযায়ী সরকারিভাবে প্রতি বছর বর্ণাঢ্য আয়োজনে যে বর্ষবরণ হয়, এটিও এবার হবে না। এই সভায় অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানসহ জেলার সকল সংসদ সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, গত শনিবার জেলা উদীচীর জরুরী সাধারণ সভায় পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ উৎসব না করে প্রতিবাদী অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত  নেওয়া হয়েছে। এই দিন মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিবর্তে কৃষকদের দাবি-দাওয়া সংবলিত ব্যানার- ফেস্টুন নিয়ে প্রতিবাদী র‌্যালি ও প্রতিবাদী গণসংগীত হবে। পহেলা বৈশাখে জেলা উদীচীর সদস্যরা বর্ষবরণের নতুন পোশাক ক্রয় না করে এই অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করবেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠান স্থল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহযোগিতার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হবে এবং অনুষ্ঠানে কৃষকদের মুখ থেকে দুঃখ-দুর্দশার কথা শোনা হবে।’
সুনামগঞ্জের প্রায় ২৫ লাখ মানুষের মনের এই অবস্থা প্রসঙ্গে কথা বলার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো কামাল উদ্দিন এ প্রতিবেদককে বলেন,‘মানুষের কষ্ট যদি বড় রকমের হয়, তাহলে মানুষ উৎসব করবে না। যে উসিলায় উৎসব হবে, সেটি যদি না থাকে, তাহলে সেই উৎসব জমবে না। এ ক্ষেত্রে মানুষ সৃষ্ট দুর্ভোগ হলে, সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নিলে মানুষের মনোকষ্ট কিছু কমবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও সরকার বা অন্যদেরকে সহযোগিতায় এগিয়ে যেতে হবে। সুনামগঞ্জের ২৫-৩০ লাখ মানুষের এমন কষ্টের মধ্যে দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষেরও উৎসব করতে মনে বাধবে। আমার বাড়ি দক্ষিণাঞ্চলে ওখানেও নবান্ন উৎসব আগে বাড়ি বাড়ি হতো, এখন কিছুটা ভাটা পড়েছে, এরপরও হয়। দেশের একজন মানুষও যদি মনমড়া হয়ে নিস্ক্রিয় থাকে, নিষ্কর্মা থাকে, তাহলে পুরো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঐ মানুষটির মনটাকে সতেজ করার দায়িত্বও স্থানীয় প্রশাসন বা কেন্দ্রীয় সরকারের।’