হাওরে পাকা ধানের গন্ধ/ হারভেস্টার যত আগে আসবে কৃষকরা তত উপকৃত হবে

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান পাকতে শুরু করেছে। ধান কেটে আনতে এবার শ্রমিকের চেয়ে কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্রকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন কৃষকরা। জেলায় হারভেস্টার মেশিন আছে ৬৬৫টি। নতুন বরাদ্দ হয়েছে আরও ১৬১টি। প্রান্তিক কৃষকরা মনে করছেন, নতুন বরাদ্দ হওয়া হারভেস্টার মেশিন যত আগে হাওরে আসবে, কৃষকরা তত উপকৃত হবে।
সুনামগঞ্জে এবার দুই লাখ ২২ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে নানা জাতের বোর ধানের চাষাবাদ হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ব্রি-২৮, ব্রি-৮৪, ব্রি-৮৮, হাইব্রিড, স্থানীয় জাতের বোর, জাগলী, রাতা ও লালডিঙ্গা জাতের ধান। এবার উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ১৩ লাখ ৫৩ হাজার টন। রবিবার পর্যন্ত সারা জেলায় ১৫শ’ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।
ধান কাটতে ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ভৈরবসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিকরা ইতিমধ্যে আসতে শুরু করেছে। তবে শ্রমিকের চাইতেও কৃষকদের ভরসা এখন হারভেস্টার মেশিনের উপর বেশি। জেলায় হারভেস্টার মেশিন সচল আছে ৬৬৫টি। অন্যান্য জেলা থেকেও ধানকাটার কম্বাইন হারভেস্টার আসা শুরু হয়েছে।
অকাল বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে থেকে ফসল রক্ষায় দ্রুত ধান কাটার চেষ্টা আছে সকল কৃষকেরই। এজন্য নতুন বরাদ্দ হওয়া ১৬১ টি ধান কাটা যন্ত্রের সব কয়টি তিন-চার দিনের মধ্যে এসে পৌঁছালেই ভালো হবে মনে করছেন কৃষকরা।
জেলার বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার কৃষক ও গণমাধ্যমকর্মী স্বপন কুমার বর্মণ বললেন, বিশ^ম্ভরপুরে ১২ টি নতুন হারভেস্টার বরাদ্দ হয়েছে। এরমধ্যে একজন কৃষক তার বরাদ্দ পাওয়া হারভেস্টার মেশিন মঙ্গলবার বিশ^ম্ভরপুরে এনেছেন। ১২ টি নতুন হারভেস্টার যন্ত্র তিন-চার দিনের মধ্যে বিশ^ম্ভরপুরে পৌঁছালে কৃষকদের সাহস বেড়ে যেত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকিকরণ প্রকল্পের জাতীয় কারিগরি কমিটি হারভেস্টার যন্ত্র বরাদ্দ দিয়ে থাকে।
এবার এই জেলার সদর উপজেলায় ১৫, শান্তিগঞ্জে ২০, দোয়ারাবাজারে ৮, বিশ^ম্ভরপুরে ১২, জগন্নাথপুরে ১০, জামালগঞ্জে ২০, তাহিরপুরে ১১, ছাতকে ১২, ধর্মপাশায় ২০, দিরাই ১৮ এবং শাল্লায় ১৫ টি কম্বাইন হারভেস্টার বরাদ্দ হয়।
বরাদ্দ পাওয়া কৃষকরা যার যার পছন্দসই হারভেস্টার যন্ত্র কিনতে ৩০ ভাগ টাকা দেবেন এবং সরকার ভর্তুকি দেবে ৭০ ভাগ টাকা।
জামালগঞ্জের লক্ষীপুর গ্রামের কৃষক আর্শাদ আলী বললেন, ৮০ কেয়ার জমি চাষাবাদ করেছেন তিনি। তিনি একটি হারভেস্টার যন্ত্র বরাদ্দ পেয়েছেন। সরকারের ৭০ ভাগ টাকা দেবার পরেও তাকে ডাউন পেমেন্ট দিতে হচ্ছে ছয় লাখ টাকা। চার লাখ টাকার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। দুই তিন দিনের মধ্যে বাকী টাকার ব্যবস্থা করে যন্ত্র কিনে আনবেন তিনি।
লক্ষীপুরের অপর কৃষক মো. সোনামনিও পেয়েছেন হারভেস্টার যন্ত্র। বললেন, ৩৩ লাখ টাকার হারভেস্টার যন্ত্র সরকার ভর্তুকি দেবে ২১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ১১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিতে হবে আমাকে। এরমধ্যে ডাউন পেমেন্ট দিতে হবে চার লাখ টাকা। আমি টাকার ব্যবস্থা করেছি বৃহস্পতিবার যন্ত্রটি ডেলিভারী নেব।
এই উপজেলার উত্তর কামলাবাজ গ্রামের কৃষক সাত্তার বাদশা বললেন, তিনি যে হারভেস্টার (মেটাল কোম্পানী) কিনতে চান, সেটি এখন দিতে পারবে না কোম্পানী। বলছে ১৫ দিন পরে ডেলিভারী নিতে, ততদিনে ধান কাটাই শেষ হয়ে যাবে। এখন তিনি বিকল্প চিন্তা করছেন। আজ কালের মধ্যে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন তিনি।
কেবল এই তিন কৃষক নয় জেলাজুড়েই হারভেস্টার যন্ত্র বরাদ্দ প্রাপ্তরা কেউ কেউ কোম্পানীকে টাকা পরিশোধ করছেন। কেউবা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বললেন, দুই তিন দিনের মধ্যেই হাওরজুড়ে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ ছড়াবে। সকলেই একসঙ্গে ধান কাটতে চাইবেন। এজন্য যারা হারভেস্টার যন্ত্র বরাদ্দ পেয়েছেন। তাদেরকে দ্রুত টাকা পরিশোধ করে হারভেস্টার ডেলিভারী নেবার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, দিরাই, শাল্লা ও বিশ^ম্ভরপুরে গত দুই দিনে নয়টি নতুন হারভেস্টার এসেছে। আমরা চেষ্টা করছি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন বরাদ্দ হওয়া সব কয়টি হারভেস্টার যন্ত্র এলাকায় পৌঁছানোর।