মধ্যনগর প্রতিনিধি
প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠমাস মাসের প্রথম সপ্তাহে থেকে বসে মধ্যনগর উপজেলা সদরে শতবর্ষ পুরনো নৌকার হাট। চালু থাকে আশ্বিন মাসের শেষ পর্যন্ত। প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এ নৌকার হাটকে স্থানীয়দের মাঝে ‘নাওমহাল’ নামে পরিচিত।
বর্ষাকালে হাওরাঞ্চলে নৌকা ছাড়া চলাচলের বিকল্প বাহন নেই। বছরের ৬ থেকে ৮ মাস চলাচলের একমাত্র বাহন নৌকা। নৌকা মাছ ধরা, গরুর খাবার সংগ্রহ করাসহ নানা কাজে ব্যবহার করতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে সবাই নৌকা কেনেন। অন্যান্য বছর এসময় জমজমাট থাকতো ‘নাওমহাল’। তবে এবছর দেরিতে পানি আসায় মৌসুমের পাঁচ সপ্তাহ চলে যাওয়ার পরও নৌকা বেচাকেনা শুরু হয়নি। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বিক্রেতারা। প্রভাব পড়ছে উপজেলার অর্থনীতিতে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর ‘নাওমহালে’ মধ্যনগর উপজেলা ছাড়াও পাশের উপজেলা তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা, বারহাট্টা উপজেলার ঠাকরোকোনা, দশধার সহ দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসেন নৌকা কিনতে।
শনিবার সাপ্তাহিক হাটের দিন মধ্যনগর বাজারের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে কাচারী ঘাটকে ঘিরে ঘোরাডোবা হাওরে ভাসমান এই ‘নাওমহাল’ বসে। ওইদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিক্রেতারা নৌকা নিয়ে আসেন। এসব নৌকার মধ্যে রয়েছে খিলুয়া, কুশি, সরঙ্গা, চাচতলী, চডানাউ, বারকি সহ নানা ধরনের ছোট বড় নৌকা।
জানা যায়, উপজেলার চামরদানী, মাকরদি ও তাহিরপুর উপজেলার উত্তিয়ারগাঁও গ্রামের কারিগররা এসব নৌকা বিক্রির জন্য নাওমহালে নিয়ে আসেন। সবচেয়ে বেশি নৌকা সরবরাহ করেন চামরদানী গ্রামের কারিগররা। ‘কুশি’ নৌকা আসে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা গ্রাম থেকে। তাহিরপুরের উত্তিয়ারগাঁও থেকে আসে ‘বারকী’ নৌকা। এছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে নতুন ও পুরনো নৌকাও বিক্রির জন্য নিয়ে আসা হয়। প্রতি শনিবার সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নাওমহাল চালু থাকে। হাটবারে ১শ’ থেকে দেড়শ’ ছোটবড় নৌকা কেনাবেচা হয়। প্রতিটি নৌকা প্রকারভেদে ৮ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তবে এই হাটে বড় নৌকার দাম ১ লাখ থেকে দেড়লাখ টাকাও হয়ে থাকে। বছর ভেদে নাওমহালে প্রায় তিন থেকে পাঁচ কোটি টাকার নৌকা বেচাকেনা হয় বলে জানালেন মধ্যমগর বাজারের সাবেক ইজারাদার আবুল বাশার।
কথা হয় চামরদানী গ্রামের কারিগর কাঞ্চন সরকারের সাথে। তিনি জানান, অন্যান্য বছরের এসময় পর্যন্ত তার ১৫-২০টি ছোট বড় নৌকা বিক্রি করা যেত। এবার মহাল চালু না হওয়ায় কোনো নৌকা বিক্রি হয়নি। এতে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা বিপদে আছি। হাওরে এখনো পুরোপুরি পানি আসেনি। এজন্য নৌকার চাহিদাও কম। তাই নাওমহালে বেচাকেনা শুরু হয়নি। এদিকে দেড়মাস ধরে কাজ না থাকলেও কারিগর হিসেবে আমার মিস্ত্রী ও জোগালীদের কমবেশি মজুরী দিয়ে চালাতে হয়। ধারদেনা করে নৌকা বানাই, দুই টাকা লাভের আাশায়। বছরের বেচাবিক্রি ভাব না বুঝে চাহিদার চেয়ে বেশি নৌকা তৈরির ঝুঁকি নিতে পারছি না। এ পর্যন্ত যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে উঠা অসম্ভব। তবু পেশা তো ছাড়া যাবে না।
জানা যায়, চামরদানী গ্রামের নৌকা তৈরির কাজে প্রায় একশো থেকে দেড়শো কারিগর, মিস্ত্রি ও জোগালী কাজ করেন। সবারই এক অবস্থা। অন্যান্য বছর এ সময় দিনে রাতে নৌকা তৈরির কাজ চলতো। এবার চলছে ঢিমেতালে।
নাওমহাল এর ইজারাদার রিপন সরকার জানান, অন্যান্য বছর এসময়ে জমজমাট থাকে। এ বছর সময়মতো বর্ষার পানি না আসায় মৌসুমের পাঁচ সপ্তাহ চলে গেলেও ‘নাওমহাল’ নৌকা বেচাকেনা শুরু করা যায়নি। এতে তিনিও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
মধ্যনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সঞ্জীব চন্দ্র তালুকদার টিটু বলেন, মধ্যনগর বাজারটি ‘নাওমহাল’ এর জন্য বিখ্যাত। জেলার কোথাও এতবড় নৌকার হাট বসে না। নাওমহালে বেচাকেনা এখনো শুরু হয়নি। এজন্য এই হাটের কারিগররা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদেরকে সরকারি সহযোগিতার আওতায় আনার চেষ্টা করবো। এছাড়া বেচা-কেনা শুরু হলে হাওরের পানিতে ভাসমান ঐতিহ্যবাহী এই ‘নাওমহাল’এ ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মধ্যনগর উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ধর্মপাশার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শীতেষ চন্দ্র সরকার সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন, মধ্যনগরের নৌকার হাট জেলার মধ্যে সুপরিচিত ও বিখ্যাত। এবছর প্রাকৃতিক কারণে দেরিতে বর্ষার পানি এসেছে। এজন্য হাট চালু করতে দেরি হচ্ছে। এতে হাটের উপর নির্ভরশীল অনেক কারিগর ও তাদের লোকজন অনেকটা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এটা দুঃখজনক। তবে এখন পর্যাপ্ত পানি হয়েছে। এখন থেকে হাট চালু হলে আশা করি তারা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। উপজেলায় যেসব নৌকা তৈরির কারিগর আছেন, তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তবে তাদের জন্য প্রণোদনা বিষয়ে এখনি কিছু বলা যাচ্ছে না।’


