বিশেষ প্রতিনিধি ও বিশ্বজিত রায়
সুনামগঞ্জের হাওরের পাড়ে পাড়ে কথিত বাঁধ ব্যবসায়ীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেছে। যেকোন ভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে ( পিআইসিতে) ঢুকা এবং অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীর যোগসাজসে বাঁধের টাকা লুটপাট এবং নতুন নতুন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। বর্ষা মৌসুমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খেয়ালিপনায় এরাই বাঁধের স্থায়ী অংশ (বস্তি অংশ) কেটে ভাঙন সৃষ্টি করে। পরে ভাঙন অংশে পিআইসি বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় মরিয়া হয় তারা।
জামালগঞ্জ উপজেলার বৃহৎ হালির হাওরপাড়ের একাধিক গ্রামবাসী জানালেন, হাওররক্ষা বাঁধের বেশ’কটি অংশ কেটে বড় বড় ভাঙন তৈরি করেছে এই বাঁধ ব্যবসায়ী চক্র। এখন ওই ভাঙন স্থানে ক্লোজারের পিআইসি হতে জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের কাছে তদবির করছে তারা।
হালির হাওরপাড়ের বেহেলী ইউনিয়নের মামুদপুর গ্রামের পাশের অংশে বৃহৎ ভাঙনটি হাওরপারের মানুষের দুঃখ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানালেন অনেকে। মামুদপুর গ্রামবাসীর বাঁধা উপেক্ষা করে গ্রামের ইউপি সদস্য মো. মসিউর রহমান গেল বর্ষায় বাঁধটি কেটে দেন বলে জানান তারা।
অপরদিকে, অবৈধ মাছ শিকারীরা বদরপুর ও হাওড়িয়া আলীপুরের মাঝখানে ঘনিয়ার বিল সংলগ্ন বাঁধ এবং শনির হাওরের ঝালোখালি ক্লোজার থেকে একটু দূরের বস্তি বাঁধ কেটে বৃহৎ ভাঙন তৈরি করেছেন। এছাড়া হাওড়িয়া আলীপুরের পার্শ্ববর্তী ভাঙাসহ মহালিয়া হাওরের দুই স্থানে বড় গর্ত করে বৃহৎ বরাদ্দ হাতিয়ে সরকারি অর্থ অপচয়ের চেষ্টা করছেন কথিত বাঁধ ব্যবসায়ীরা। হাওরপাড়ের বাঁধ ব্যবসায়ীদের এমন অরাজকতায় স্থানীয় পাউবো প্রশাসনের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাওরপারের কৃষকরা।
বেহেলী ইউনিয়নের মামুদপুর ভাঙনকে পরিকল্পিতভাবে বিশাল খালে পরিণত করা হয়েছে। বর্তমানে
ভাঙনকৃত দু’পারের দূরত্ব হবে প্রায় শতেক গজ। ধান রোপণের শুকনো মৌসুমেও ওই ভাঙাটিতে থই থই করছে পানি। স্থানীয়রা কৃষি কাজের সুবিধার্থে মামুদপুরের ভাঙনে লম্বা বাঁশের সাঁকো দিয়েছেন। ভাঙন তীরবর্তী ৪-৫টি কৃষক পরিবারের বাড়ি-ঘর ভাঙনের কবলে পড়ে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অপরপ্রান্তের ভাঙন ছুয়েছে কবরস্থান পর্যন্ত। ভাঙনের কারণে টিলার মতো বড় বড় চর জেগে চাষাবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে বেশকিছু জমি। এতে ক্ষতি হয়েছে অনেক কৃষকের।
জেলার অন্যান্য হাওরেও বাঁধ ব্যবসায়ী চক্র বড় বড় ক্লোজারের সৃষ্টি করে অনেক হাওরকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
জামালগঞ্জের হালির হাওরপাড়ের কৃষকরা জানিয়েছেন, অনেক বাঁধা প্রদান করেও মামুদপুরের বাঁধ কাটা ঠেকাতে পারেননি তারা। গ্রামবাসীর পক্ষে বাঁধা দিলেও ইউপি সদস্য মসিউর রহমান জোর করেই কেটে দিয়েছেন বাঁধ। পরবর্তী বছরে বড় বরাদ্দ প্রাপ্তির আশায় বাঁধটি কেটে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি ক্ষুব্ধ কৃষকদের।
মামুদপুরের ভাঙন ছাড়া এই হাওরের চারপাশে আরও বড় বড় ভাঙন পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
মামুদপুর গ্রামের প্রবীণ কৃষক মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বড় পিআইসি পাওয়ার লাগি এই কামডা করা অইছে। এতে কয়েক হাল জমিনের ক্ষতি হইছে। বাঁধের কাছের কয়েকটা বাড়িও ভাঙছে। আর বাঁধের ব্যাপারে ঝুঁকিটা তো সারাজীবনই থাকব।’
একই গ্রামের আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, এই ভাঙনে জমি নষ্ট হইছে। খালডাও অনেক গভীর হইছে। এখন ভরাট করতে অনেক মাটি লাগবো। আমার মনে হয় প্রজেক্ট পাইবার লাগি হেরা এইডা করছে, না হইলে তো এইডা ভাঙার দরকার নাই।’
স্থানীয় কৃষক নেতা আমিনুল হক মনি বলেন, মামুদপুরের ভাঙনটি বর্তমানে বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। স্থানীয় কৃষকের বাঁধা ডিঙিয়ে যারা এই জঘন্যতম কাজটি করেছে তারা পুরো হাওরবাসীর শত্রু। এটা করার আগে অন্তত কৃষকের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। আমি এর প্রতিবাদ জানাই।
গ্রামবাসীর অভিযোগ অস্বীকার করে বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. মসিউর রহমান বলেন, মামুদপুরের ভাঙার ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। গ্রামবাসীই চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ করে সেটি ভেঙেছে। আমি তখন বাড়িতে ছিলাম না। তবে চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে বাঁধ ভাঙতে বলেছিলেন, আমি না করে দিয়েছি।
বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অসীম তালুকদার বলেন, যখন ধান কাটা শেষ তখন হাওরে পানি প্রবেশের জন্য বাঁধ কেটে দেওয়া হয়। এটা উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশ মোতাবেক মেম্বারকে বলা হয়েছে ভাঙার জন্য। বাঁধ কাটার এখতিয়ার তো আমাদের নেই। আমরা এটা করতে যাব কেন?
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জামালগঞ্জ উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. রেজাউল কবীর জানিয়েছেন, পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রতি বছরই মামুদপুর গ্রামের পাশের হালি হাওরের বাঁধ কাটা হয়, এবার একই কারণে এটা করা হয়েছে। অন্যান্য ভাঙন যেগুলো সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো রাতের আঁধারে কে বা কারা করেছে সেই তথ্য আমাদের জানা নেই।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক চিত্ত রঞ্জন তালুদার বলেন, প্রত্যেকটা হাওরপাড়েই কিছু বাঁধ কাটইয়া (কাটরা) আছে, এরাই বাঁধের কামও করোয়া (পিআইসি হয়)। ফসল কাটার পর পর পানি আওয়ার আগে আগে হেরা বাঁধ কাটে যাতে ভাঙন বড় হয়। এই অসৎ কাজ টেখানো যেত যদি হাওর রক্ষা বাঁধে নৌচলাচলের বা পানি বের হওয়ার অংশে রাবারড্যাম করা যেত। বাঁধের এই ব্যবসায়ীদের পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ আছে বলে দাবি করেন তিনি।
শনিবার বিকালে সুনামগঞ্জের গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে বাঁধ নির্মাণ কাজ নিয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদের মিট দ্যা প্রেস অনুষ্টানে এই প্রসঙ্গ আলোচনা হয়। গণমাধ্যম কর্মীরা হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির জেলা সভাপতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদের কাছে জানতে চান, প্রতিবছর বাঁধের পিআইসি বাড়ছে কেন? গেল বছর ৭৪৫ টি বাঁধের পিআইসি ছিল এবার শুনা যাচ্ছে ৮৫৬ টি। বাঁধের ভাঙনে গেল বছর ১৩৫ ক্লোজার হয়েছে, এবার আরো বাড়বে বলা হচ্ছে, সেটি কেন হচ্ছে এবং এজন্য বাঁধের টাকা লুটপাটের অসৎ উদ্দেশ্য আছে বলেও জেলা প্রশাসকের কাছে গণমাধ্যমকর্মীরা দাবি করেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, উপজেলা পর্যায়ে বাঁধের কাজ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি আছে। ওই কমিটিতে সুশীল সমাজের এবং গণমাধ্যমকর্মীও প্রতিনিধি আছেন। এবার কমিটির অনুমোদন ছাড়া কোন প্রকল্প হবে না। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠনে সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।


