হাওর অঞ্চলের কৃষক-জনগণের দুঃখ-কষ্টের অপর নাম পাহাড়ি ঢল

শাহজাহান কবির
এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢলে বৃহত্তর সিলেট জেলাসহ ভাটি অঞ্চলের হাওরগুলো অকাল বন্যায় প্লাবিত করে জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। এতে করে অপ্রস্তুত কৃষকের অপরিপক্ক ধান তলিয়ে যাওয়ায় ফসল রক্ষা করতে পারে না। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ব্যাপক অঞ্চল প্লাবিত হয়ে এই ক্ষতির পরিমাণকে বাড়িয়ে দেয়। অকাল বন্যার হাত থেকে কাঁচা ধান রক্ষার জন্য হাওর রক্ষাকারি বাঁধ রক্ষায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েও তা রক্ষা করতে পারে না। স্বল্প মাত্রায় তলিয়ে যাওয়া আধাপাকা ধান বুকপানি কোমর পানি নিচ থেকে কাটার প্রাণান্ত চেষ্টা করেও তা ঘরে তুলতে পারে না। অথচ বন্যার পূর্বে কৃষকসমাজ ব্যাপক ফসলের সম্ভাবনার আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু আশা আকাঙ্খার মাঝে পাহাড়ি ঢল এসে কৃষকের সকল আনন্দকে ধূলিস্যাৎ করে দেয়। বছরে এক ফসলের উপর নির্ভরশীল হাওরবাসি প্রায় প্রতি বছর উৎপাদন বিধ্বস্ত হওয়ায় হতাশায় নিমজ্জিত। ফসল ক্ষেতে অথৈ পানি দেখে কৃষকের আর্তনাদ কান্না আহাজারি সর্বোপরি দিশেহারা অবস্থায় যে কোন বিবেকবান মানুষের প্রতিক্রিয়া না হয়ে পারে না।
হাওর এলাকার মানুষ তাদের বছরের ফসল উৎপাদন করে ঘরে উঠানোর আগ পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলে অকাল বন্যার জন্য শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে। পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার কারণে পাহাড়ে আগাম বৃষ্টির প্রাদুর্ভাব ঘটে ফলে এক বছর পরে পরেই পাহাড়ি ঢলে ফসল বিনষ্ট হওয়ার মুখোমুখি হয় কৃষক। পাহাড়ি ঢলে প্লাবনের ব্যাপকতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চল ভারতের মেঘালয় ও আসাম পার্বত্য অঞ্চলের পাদদেশে অবস্থিত নি¤œ সমভূমি অঞ্চল হাওর অধ্যূষিত এই জেলাগুলো। পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয় মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে। আসামের পার্বত্য এলাকার জলরাশি ব্রাহ্মপুত্র নদ এবং সুরমা-কুশিয়ারা তথা মেঘনা নদীর ¯্রােতধারা হিসেবে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। এছাড়া মেঘালয় আসামের পর্বত থেকে উৎপত্তি হওয়া বিভিন্ন উপনদী এই মূল ¯্রােতধারার সাথে সংযুক্ত হয়ে এতদঞ্চলের হাওর এলাকার বিচিত্র বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করেছে। ১৮৯৭ সালে ভারতের বৃহৎ ভূমিকম্পের কারণে ব্রাহ্মপুত্র গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় বর্তমানে সুরমা-কুশিয়ারা তথা মেঘনা নদীর ¯্রােতধারা এই অঞ্চলের পানি প্রবাহের বর্তমান অবস্থাকে ধারণ করছে।
উপনদী নদীর সাথে সমন্বয়ের রূপ সুরমা নদীর ¯্রােতের সাথে পাহাড়ি উপনদী চেলানদী, ভোলা নদী, চলতি, যাদুকাটা, কংশ, সোমেশ্বরী প্রভৃতির মাধ্যমে পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি বহন করে সুরমা এবং কুশিয়ারার অবস্থানে এ রকম ছোট বড় পাহাড়ি নদী যুক্ত রয়েছে। উভয় নদীর ¯্রােতধারা অসংখ্য ছোট বড় শাখা-প্রশাখা বা খাল-বিল হয়ে মেঘনায় পতিত হয়।
বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার প্রায় সর্বত্র হাওর এলাকা। আবার সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার জেলার বিস্তৃত অঞ্চল হাওর এলাকা বা ভাটি অঞ্চল। এছাড়া নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিরাট অংশ হাওর অঞ্চল। আগে এতদঞ্চলে বছরে একটি মাত্র ফসল বোরো পৌষ মাসে ধান রোপণ করে চৈত্র মাসে ফসল কাটা হতো। ধান উৎপাদনে আধুনিক গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রয়োগ করে প্রথমে ইরি এবং ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ধান ব্যাপকভাবে হওয়ায় সমগ্র ভাটি এলাকায় আজ তা সর্বাত্মকভাবে চাষ হচ্ছে। এতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ইরি/ব্রি ধান চাষের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ফসল ঘরে তুলতে বৈশাখ মাস লেগে যায়। ফসল তোলার মৌসুমে ভাটি এলাকার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কর্মচাঞ্চল্য সমগ্র এলাকায় অভূতপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি করে, জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত সময়কালে সমগ্র ভাটি এলাকা ও হাওর অঞ্চলে অথৈ পানিতে তলিয়ে থাকে। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অবাধ বিচরণ, প্রজনন ও উৎপাদনের পরিবেশ বিরাজ করে। ভাটি এলাকার মানুষ এই দ্বিবিধ প্রাকৃতিক বৈচিত্রের সাথে খাপ খাইয়ে জীবন-জীবিকা অতিবাহিত করে। বর্ষা মৌসুমে বসবাসের উপযোগী করে মাটির ঢিবি তৈরি করে ঘনবসতি আকারে দ্বীপ সদৃশ গ্রাম তৈরি করে বসবাস করে। বর্ষাকালে প্রতিনিয়ত ঢেউয়ের আঘাত থেকে বাড়িঘর ও গ্রামকে রক্ষা করার সংগ্রামও তেমন প্রতিদিনের ব্যাপার।
বাংলাদেশ ও তার নিকট প্রতিবেশি ভারতের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের যে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ যথেচ্ছাচার ব্যবহারের কারণে প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদ আসামের বনাঞ্চলে মূল্যবান কাঠ লুটপাটের যে ধারা সৃষ্টি করেছিল তা অব্যাহত থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে বনাঞ্চলে উজাড় হয়ে গেছে। ফলে বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলে ব্যাপকভাবে ভূ-ত্বকের মাটি বালি নেমে এসে নদ-নদী, উপনদী ও খালের তলদেশ ভরাট করে ফেলছে। বর্তমানে অধিকাংশ নদ-নদীর নাব্যতা নেই। আবার নগরায়নের ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত রাজপথ, রেলপথ এবং নদী-খালে ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণের কারণে নদী ও পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত বিপুল জলরাশি হাওর এলাকার পানির মাত্রা ও উচ্চতা বৃদ্ধি করছে। কোন কোন সময় পাহাড়ি নদী তার গতিপথ পাল্টে লোকালয়ে ও ফসলি জমি ধ্বংস করে নিজের চলার পথ সৃষ্টি করে। গত শতকের ৮০’র দশকে সৃষ্ট মারাম নদীর সমস্যা তার মধ্যে অন্যতম।
৬০-এর দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও অধিক ফসল ফলানোর বক্তব্যকে সামনে রেখে তৎকালিন সময়ে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের পরিকল্পনায় ওয়াপদা গঠিত হয়। হাওর অঞ্চলে অকাল বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষার নামে সুদূর পাকিস্তান আমল থেকে অপরিকল্পিত বেড়ীবাঁধ দিয়ে আসছে। ফলে নদীর তলদেশ ভরাট, বিলের উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদি সমস্যা আরো বৃদ্ধি পেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর বৈজ্ঞানিক নিয়ম ও সমাধান না খুঁজে লুটপাটের জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছে।
সা¤্রাজ্যবাদ ও দালাল সরকার হাওর এলাকার প্রাকৃতিক নিয়মকে অগ্রাহ্য করে তাদের শোষণ-লুটপাট অব্যাহত রাখার প্রেক্ষিতে সমস্যা থেকে যায়। এবং প্রায়শই পাহাড়ি ঢলে ফসলহানি ও জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সমস্যার মূল কারণ নদী ভরাট সমস্যার সমাধানে পর্যাপ্ত      
ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ওয়াপদার পক্ষ থেকে প্রতি বছর হাওর রক্ষা বাঁধ দেওয়া হয়। এতে শোষক শ্রেণির লুটপাটের ব্যবস্থা হলেও পাহাড়ি ঢলের কবল থেকে ফসল রক্ষা পায়নি। ওয়াপদার এই লুটপাটমূলক তৎপরতাকে বন্ধ করে অত্র অঞ্চলের নদীসমূহের গভীরতা ও নাব্যতা সৃষ্টির জন্য নদী খনন-ড্রেজিং এর বিকল্প নেই। এভাবে নদী গভীর ও নাব্য হলে বর্ষার শেষে হাওরের পানি দ্রুত সরে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। যাতে বীজ বপনে উৎপাদন এগিয়ে আসবে। নদীর খননকৃত মাটি দিয়ে নদীর পাড়/তীর বেঁধে দিয়ে পানির প্লাবন রোধ করার ব্যবস্থা করা। হাওর এলাকার জনগণের জীবন-জীবিকার একমাত্র ফসল নির্বিঘেœ ঘরে ওঠানোর নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এর জন্য বোরো ধানকে গবেষণার মাধ্যমে উন্নত রূপ দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে ধান পরিপক্ক হওয়ার উপযোগি বীজ উদ্ভাবন করে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
প্রায় মওসুমেই অকাল বন্যায় হাওর অঞ্চলে ফসলের এই ভয়াবহ ক্ষতি হয়। তা এতদঞ্চলের ভূমিহীন-গরীব কৃষকসহ সকল শ্রেণির কৃষককে সর্বস্বান্ত করছে। এর ফলে সমগ্র এলাকায় জনগণকে বছরব্যাপি খাদ্যাভাব, পশুখাদ্যের অভাবে পড়ে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। আবার আগাম বন্যার কারণে ঢেউয়ের কবল থেকে বাড়ি রক্ষা করার প্রস্তুতি নিতে না পারার কারণে বর্ষায় বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়ার মুখোমুখি হতে হয়। তা ছাড়া ফসল সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হওয়ায় কৃষকের হাতে বীজ না থাকার কারণে ফসল উৎপাদনে সংকট দেখা দেয়। এ অবস্থা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক-জনগণকে রক্ষার জন্য সমগ্র এলাকাকে দুর্যোগপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে ভূমিহীন ও গরীব কৃষক-জনগণকে রিলিফ বিতরণ, সমগ্র জনগণের ভিতরে পর্যাপ্ত রেশনের ব্যবস্থা করা এলাকার পশু সম্পদ রক্ষার জন্য পশুখাদ্য সরবরাহ করা, বর্ষা মৌসুমে কৃষককে বাঁচানোর জন্য ভাসান পানিতে অবাধ মাছ ধরার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বাঁচার উপায় নাই। সেই সাথে ফসলহানির কারণে কৃষিঋণ মওকুফ করা। এবং প্রতি মওসুমে বিনা সুদে কৃষিঋণ বিতরণের নিশ্চয়তা বিধান করার দরকার। এভাবে বিপর্যয় থেকে হাওরবাসিকে বাঁচানো সম্ভব। হাওর এলাকার বিপর্যস্ত জনগণের রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। বিগত সময়ে এই দুর্যোগপূর্ণ হাওর এলাকায় সরকারের সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা লক্ষ্য করা যায়নি। এই সুযোগে অসংখ্য এনজিও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি, হাওরে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির নামে সমিতি গঠন করে কৃষক-জেলেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। আজ প্রয়োজন হাওরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে সংগঠিত আন্দোলনকে অগ্রসর করা। কৃষক সংগ্রাম সমিতি ১৯৯৩ সাল থেকে ৫দফা দাবিতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে আসছে। যা ২০১১ সালে ৮ দফা দাবি যুক্ত করে আন্দোলন-প্রচার তৎপরতা চলছে। বিগত বছরগুলোতে কৃষক সংগ্রাম সমিতি নদী খনন ইস্যু নিয়ে প্রচারপত্র, মিটিং-মিছিল ধরনের কিছু কর্মসূচি পালন করেছে। ধর্মপাশা শাখার উদ্যোগে ইতিপূর্বে গোমাই নদী স্বেচ্ছাশ্রমে খনন করে সোমেশ্বরী নদীর সাথে যুক্ত করে ধর্মপাশার বিস্তীর্ণ হাওড়াঞ্চলে অকাল বন্যা, ফসলহানি, ক্ষয়ক্ষতি অনেক হ্রাস পেয়েছে। এটা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ঘটনা। চলতি বছর তাহেরপুর শাখার উদ্যোগে নদী খনন ও বেড়ী বাঁধ নির্মাণ করার দাবিতে মিটিং-মিছিল এবং স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এতে করে বেড়ী বাঁধে দুর্নীতি রোধে প্রশাসন কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে। পাহাড়ী ঢলের কবল থেকে ফসল রক্ষার জন্য প্রয়োজন সোমেশ্বরী, যাদুকাটা, রক্তি ,বৌলাই, চলতি, কংশ উপ-নদী সমুহ খনন করে সুরমা নদী পর্যন্ত গভীর করা। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর শাখাসমুহ খনন করে গভীর ও প্রশস্ত করতে হবে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর ভরাটকৃত অংশ সমুহ খনন করে মেঘনা নদী পর্যন্ত পানি প্রবাহের গতি বৃদ্ধি করতে হবে। আশু ব্যবস্থার জন্য সুষ্ঠুভাবে সময় মতো পরিকল্পিত বেড়ীবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। বেড়ীবাঁধ নির্মাণে সকল প্রকার দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।  
লেখক: কৃষক সংগঠক।